তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা:  “সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি ; কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে, এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে।”

রূপসী বাংলার কবির এই বহুশ্রুত উক্তি বিভিন্ন সময় শোনা যায়। একজন কবি কীভাবে কবিতার কাঠামো নির্মাণ করেন, তা নিজেই তো জীবনানন্দ দাশ বলে গেছেন। তাই তাঁর স্বগত ঘোষণার মধ্য দিয়েই তাঁর কবিতার স্বরূপ খোঁজা দরকার। বুদ্ধদেব বসু কবিতা পত্রিকার একটি প্রবন্ধ সংখ্যার (১৩৪৫, বৈশাখ) পরিকল্পনা করেছিলেন মূলত কবিদের গদ্য প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে। এরই সূত্রে জীবনানন্দ তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন যার নাম ‘কবিতার কথা’। সেখানেই লিখেছিলেন, সকলেই কবি নয়….

১৮৯৯ সালে বরিশালে আজকের দিনে তাঁর জন্ম হয়। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যময় নিসর্গ ও রূপকথা-পুরাণের জগৎ জীবনানন্দের কাব্যে হয়ে উঠেছে চিত্ররূপময়, তাই তো তিনি  `রূপসী বাংলার কবি’।

জীবনানন্দ এক `মহাপৃথিবী’। তাঁর বিভিন্ন লেখায় তাঁরা বারবার রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধানত হতে দেখলেও তিনি রবীন্দ্রনাথের বিপরীত মেরুবর্তী। চূড়ান্ত বিশ্বাসের স্থিরভূমি তাঁর ছিল না। তাঁর কাব্য়ের সত্য আপেক্ষিক। এই দ্বন্দ্বপীড়িত ও মানবতাবাদী কবির সত্যি কোনো জীবনদেবতা ছিল না। সে অর্থে তিনিই প্রথম আধুনিক। ধূসর পাণ্ডুলিপির `বোধ’, বনলতা সেনের `অন্ধকার’, মহাপৃথিবীর `আট বছর আগের একদিন’- বাংলা কবিতার জগতে শিকড় ওপড়ানোর মতে রাবীন্দ্রিকতার অবসান ঘটিয়ে নতুন বীজ বুনে দেয়।

জীবনানন্দ ছিলেন একজন কালসচেতন ও ইতিহাসচেতন কবি। তিনি ইতিহাসচেতনা দিয়ে অতীত ও বর্তমানকে অচ্ছেদ্য সম্পর্কসূত্রে বেঁধেছেন। তাঁর কবিস্বভাব ছিল অন্তর্মুখী, দৃষ্টিতে ছিল চেতনা থেকে নিশ্চেতনা ও পরাচেতনার শব্দরূপ আবিষ্কারের লক্ষ্য। এ সূত্রে তিনি ব্যবহার করেছেন ইম্প্রেশনিস্টিক রীতি, পরাবাস্তবতা, ইন্দ্রিয়বিপর্যাস (synaesthesia) ও রঙের অত্যাশ্চর্য টেকনিক। আধুনিক কাব্যকলার বিচিত্র ইজম প্রয়োগ ও শব্দনিরীক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর অনন্যতা বিস্ময়কর। বিশেষত, কবিতায় উপমা প্রয়োগে জীবনানন্দের নৈপুণ্য তুলনাহীন। কবিতাকে তিনি মুক্ত আঙ্গিকে উত্তীর্ণ করে গদ্যের স্পন্দনযু্ক্ত করেন, যা পরবর্তী কবিদের প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে।

উপমা প্রয়োগের নৈপুণ্য দেখা যায় তাঁর `বনতলা সেন’ কবিতায় –

“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতি দূর

সমুদ্রের ‘পর

হাল ভেঙে যে নাবিক-হারায়েছে দিশা….”

কিংবা `বুনো হাঁস’ কবিতায় –

“পেঁচার ধূসর পাখা উড়ে যায় নক্ষত্রের পানে-

জলা মাঠ ছেড়ে দিয়ে চাঁদের আহ্বানে…”

জীবনানন্দ ছিলেন বাংলা কাব্যান্দোলনে রবীন্দ্রবিরোধী তিরিশের কবিতা নামে খ্যাত কাব্যধারার অন্যতম কবি। পাশ্চাত্যের মডার্নিজম ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বঙ্গীয় সমাজের বিদগ্ধ মধ্যবিত্তের মনন ও চৈতন্যের সমন্বয় ঘটে ওই কাব্যান্দোলনে।

এখনো বাংলার রোম্যান্টিক মন বনলতা সেনের সন্ধান করে। এখনও বলতে ইচ্ছে করে, বাংলা মানে জীবনানন্দ, একবার দেখি, বারবার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।