সামাউল্লাহ মল্লিক

সামাউল্লাহ মল্লিক, টিডিএন বাংলা : একটি মেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। সম্পূর্ণ উলঙ্গ অথবা ছিন্নভিন্ন সামান্য কাপড়ে তাঁর শরীর ঢাকা। তাঁর শরীরের চারিদিক ক্ষতবিক্ষত, চেহারা মলীন। তাঁর ফুলে থাকা চোখ রক্তের মতো লাল হয়ে আছে। কপালে কাটার দাগ এবং তাঁর স্তনে দাঁতের চিহ্ন। তাঁর ঠোঁটও কাটা, যেখানে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়েছে। তাঁর চুলের কিছু ছেঁড়া অংশ পাশেই পড়ে রয়েছে। তাঁর চুল এতটাই জোরে হেঁচকা টান মারা হয়েছিল যে, মাথার চামড়া সহ তা উঠে এসেছে। তাঁর যোনী থেকে রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছিল। ব্যাথা এতটাই ভয়ানক যে, শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে তাঁর। তাঁর হাঁটু, কোমর, কাঁধ এবং শরীরের প্রায় সবখানের চামড়া ছিঁড়ে গিয়েছে। শরীরের চারিদিকে শুধু দাঁতের দাগ। গলা থেকে আওয়াজের বদলে গোঙানি বের হচ্ছে।

এটাতো ছিল বাইরের কথা, এইবার একটু ভিতরের কথা নিয়ে আলোচনা করা যাক। ভিতর থেকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছে সে। নিজের নজরেও সে আজ অসম্মানিত। এটা বড় কথা নয় যে, সে নির্দোষ। বরং বড় কথা হল যে, বর্তমান সমাজ তাঁকে শিখিয়েছে দোষ তাঁরই। এখন সে পরিবারের লোকের পাশাপাশি সমাজের কাছেও নিজের মুখ দেখাতে পারবেনা। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে যাবে মৃত্যুর দিকে। এখন থেকে সে ভয়ের জীবন অতিবাহিত করবে। ঘুমের মাঝে হঠাত করেই তাঁর ঘুম ভেঙ্গে যাবে, সেই ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখে। মানুষ কিছু করার, কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সে নিজের স্বপ্নে এই ভয়াবহতার স্বপ্ন দেখবে। কখনও রান্না করতে করতে, কখনও অন্যান্য কাজ করতে সে ককিয়ে কেঁদে উঠবে। সম্পর্কে বিশ্বাস করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে যাবে।
আরও পড়ুন- আসিফা বানু: আরও এক পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের বলি, নৃশংসতা কি চলতেই থাকবে?
যদিও এখন তাঁকে জীবিত দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সে ধীরে ধীরে ভেঙ্গে পড়ছে। গলছে তাঁর মন, সে ডুবছে ধীরে ধীরে। হাওয়া তাঁর জন্য বিষের মতো হয়ে যাচ্ছে, যে হাওয়ায় নিঃশ্বাস নেওয়া তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সে শুধুই ভাবছে তাঁর কি দোষ ছিল? সে এমন কি করেছিল যে, তাঁর সঙ্গে এই দুর্ঘটনা ঘটে গেল? এতক্ষন একজন ধর্ষিতা নারীর বিবরণ দেওয়া হল, যে কিছুক্ষণ আগেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এইবার নিজের চোখ বন্ধ করুন এবং মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকা মেয়েটির চেহারা ভালো করে লক্ষ্য করুন। কি চিনতে পারলেন? সে আপনার মা, বোন অথবা মেয়ে! খারাপ লাগল তো? খুবই খারাপ তাই না? এইবার আপনি সেই চেহারাটি মাথা থেকে বের করার চেষ্টা করছেন কিন্তু বার হচ্ছেনা। আমি আপনাকে এমন জিনিষ দেখিয়ে দিয়েছি যার পর হয়তো আপনি আমাকে সবথেকে বেশি ঘৃণা করবেন। করুন আপনি ঘৃণা, আপনাকে অনুমতি দেওয়া হল।
কিন্তু সেই ধর্ষকের কি হবে, যে এই কুকীর্তি করল? আপনি কি তাঁকে ঘৃণা করবেন? আসুন আপনার জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে দিচ্ছি। ভাবুন, আপনার মা, বোন অথবা মেয়েকে যদি ৮ বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার হতে হয়? আচ্ছা অনেক কম বয়স বলে ফেললাম? আচ্ছা যদি ১৬ বছর বয়স ধরি তাহলে ঠিক হবে? সেক্ষেত্রে কি করবেন আপনি? আপনার হয়তো ইচ্ছা করছে আমাকে প্রাণে মেরে ফেলবেন? আপনার মনের কথায় ঠিক। কিন্তু আমি তো কিছুই করিনি। আমি শুধু আপনাকে ভাবনার খোরাক দিয়েছি। কিন্তু গল্প আরও আছে। এখন আপনি আট বছর বয়সি ওই মেয়েকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। মেয়েটি মারা গেল। পুলিশ এলো। এইবার ধর্ষণের মামলা তো হওয়া উচিৎ? কিন্তু না তখনই একদল লোক আসবে।
সেই লোকেরা এসে জয় শ্রী রাম শ্লোগান দেবে। ভারত মাতা কি জয় শ্লোগানও দেবে। দেশের জাতীয় পতাকা থাকবে তাঁদের হাতে। সেই লোকেরা আপনাকেই দেশদ্রোহী বলবে, পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করবে, তারপর পুলিশকে সেখান থেকে ভাগিয়ে দেবে। এখন আপনি একা, নিজের ধর্ষিতা মেয়ের মৃতদেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়ে ধর্ষণের পর মারা গিয়েছে। আপনি ভয়ে কাঁপছেন। এখন কেমন লাগছে আপনার? এটা একটা নতুন অধ্যায় এই গল্পের। এই গল্প দেশের নানা প্রান্তে রোজ ঘটছে। কতশত নির্ভয়া, আসিফারা রোজ এই ন্যাক্কারজনক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
মশাই! গোল্লায় যাক হিন্দু, আর গোল্লায় যাক মুসলিম। গোল্লায় যাক সরকার আর গোল্লায় যাক বিপক্ষ। আমিও গেলাম গোল্লায় আর আপনিও যান গোল্লায়। দূরে থাক তর্কবিতর্ক। যদি এই নির্ভয়া, আসিফারা ন্যায়বিচার না পায় তাহলে গোল্লায় যাক দেশও। আসিফারা ইনসাফ না পেলে লজ্জা থেকে এই দেশ কখনও মাথা তুলতে পারবেনা। হিন্দু-মুসলিম, উঁচু জাতি-নিঁচু জাতি, নর্থ ইন্ডিয়ান-সাউথ ইন্ডিয়ান, কালো-সাদা, সবুজ, নীল, লাল, গোলাপি, গেরুয়া সবই হলেন। এইবার একটু ভারতীয় হয়ে দেশটাকে বাঁচান।