আসানসোলের ইমামের ছেলে সিবগাতুল্লাহ বেঁচে থাকলে আজ হয়তো জীবনের প্রথম ভোট দিত

অর্কভাদুড়ি, টিডিএন বাংলা : আসানসোলে ভোট। আজ থেকে ঠিক এক বছর এক মাস আগে আসানসোলের নুরানি মসজিদের ইমাম ইমদাদুল রশিদির ছেলে, ১৭ বছরের সিবঘাতুল্লা খুন হয়েছিল। রামনবমীর মিছিল থেকে সশস্ত্র হামলাবাজেরা বেরিয়ে এসে সিবঘাতুল্লাকে ঘিরে ধরে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরেছিল। তারপর সদ্য মাধ্যমিক দেওয়া ছেলেটার লাশ কুড়িয়ে এনে ওই এলাকার হাজার হাজার মুসলিম জনতা নুরানি মসজিদের সামনের চত্বরটায় জড়ো হয়েছিলেন। প্রতিশোধ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তাঁরা। এই সময় মসজিদের দেড়তলার ঘর থেকে ইমাম রশিদি বেরিয়ে আসেন। উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে সদ্য পুত্রহারা বাবা বলেন, তিনি কোনও প্রতিশোধ চান না। চোখের বদলে চোখ কোনও সমাধান নয়। যদি ভিনধর্মের একটি মানুষও আক্রান্ত হন, তিনি আসানসোল ছেড়ে চলে যাবেন। ইমামের সেই কথার পরেই একটু একটু করে শান্ত হতে শুরু করে পরিস্থিতি। দাঙ্গার উত্তাপ কমে আসে।

সেই সময় আমি আসানসোলে গিয়েছিলাম। ইমামের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। গল্প করেছিলাম আমরা, খেয়েছিলাম একসঙ্গে। উনি ছেলের বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখছিলেন আর বলছিলেন, “আমি জানি ছেলে খুন হলে কেমন লাগে। তাই চাই না কারও ছেলে মারা যাক।” আমি জানতে চেয়েছিলাম, পুলিশে অভিযোগ করবেন কিনা। উত্তর দিয়েছিলেন, “কী হবে অভিযোগ করে! ছেলে তো আর ফিরবে না। তাছাড়া ঘটনার সময় আমি সামনে ছিলাম না। লোকমুখে শোনা কথার উপর ভিত্তি করে অভিযোগ করলে কোনও নির্দোষ মানুষও শাস্তি পেতে পারেন। প্রাণ থাকতে আমি তা করব না।”

সেই সময় আমাকে যাঁরা আসানসোলে পাঠিয়েছিলেন, আমি চিরদিন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। এই ইমামের সঙ্গে পরিচয় না হলে আমি আমার ব্যক্তিগত ঈশ্বরকে পেতাম না। তারপর থেকে বহুবার আমাদের কথা হয়েছে। সিবঘাতুল্লার মাধ্যমিকের ফল নেট থেকে দেখে দিতে বলেছেন ইমাম। আমিও ফোন করেছি, দেখা করেছি। কখনও পেশার প্রয়োজনে, কখনও একদম অকারণ, এমনিই। আমাদের দু’জনের কোনও মিল নেই। বয়স, বেড়ে ওঠা, মতাদর্শ, ভাললাগা- সবই আলাদা। কিন্তু তবুও বারবার মনে হয় ওই মানুষটি আমার শিক্ষক নন শুধু, বন্ধুও।

আজ আসানসোলে ভোট। ইমামের সঙ্গে গতকাল ফোনে কথা হচ্ছিল। ভোট নিয়ে কিচ্ছু বলতে চাইলেন না। শুধু বললেন, “যারা ধর্মের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি করে, হিন্দুর বিরুদ্ধে মুসলমান আর মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুকে লড়িয়ে দেয়, তারা যেন না জেতে।” আমার মনে পড়ছিল, সিবঘাতুল্লা খুন হওয়ার পর একদল লোক দাবি করেছিল ইমাম নাকি ভারতের নাগরিক নন, সিবঘাতুল্লাও নয়। নুরানি মসজিদের ওই ছোট্ট, স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে বসে সদ্য পুত্রহারা ইমাম রশিদি নিজের আর মরা ছেলের আধার কার্ড তুলে ধরে আমাকে বলছিলেন, “এই দেখুন প্রমাণ। আমরা ভারতীয়। এই আমাদের দেশ। আমাদের দূরে সরিয়ে দেবেন না।”

আজ আসানসোলে ভোট। ভারতের সংসদ নির্বাচনের চতুর্থ দফা। ইমাম রশিদি ভোট দেবেন। সিবঘাতুল্লা বেঁচে থাকলে তার বয়স হত ১৮। হয়তো ভোট দিতে যেত।