একরামুল হক শেখ, টিডিএন বাংলা:

মা আমার,
তুমি হয়তো এখন ফজরের নামাজে বসে তোমার অচ্ছুর মঙ্গল কামনায় চোখের জল ফেলছ। তোমার চোখের জল যেন বলছে, আমার অচ্ছুকে কেড়ে নিও না তোমরা। তোমাকে যে কত দুঃখ দিয়ে গেলাম।
কিন্তু উপায় কী বলতো? তোমাদের দুঃখ না দিয়ে যে আমাদের পথ চলার উপায় নেই। কারবালার কথা যখন ভাবি, তখন মনে হয়, এই-ই বুঝি ইতিহাসের নিয়ম। মহান নবীর বংশধরেরা যেন জীবন দিয়ে বলে গেলেন, সত্যের জন্য এইভাবে জান কুরবানী দিও তোমরা।
তুমি জানতে চেয়েছ, কেমন আছি আমি। ফৈজাবাদের পাঁচিল ঘেরা এই বিশাল জেলখানায় দিন আমার ভালই কাটছে। যেদিকে তাকাই সৃষ্টির বিচিত্র রূপ যেন প্রাণমন ভরিয়ে দেয়। অনন্ত আকাশে পাখিরা যখন ডানা মেলে উড়ে যায়, বর্ষাস্নাত বিকালে রামধনুর রঙ বেরঙের খেলা যখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, হাওয়ায় ভর করে যখন দুর দেশের কোন অজানা ফুলের সৌরভ প্রবেশ করে আলো বাতাসহীন এই অন্ধ কুঠুরিতে– তখন মনে হয়, প্রকৃতিদেবী আমার এই নিরানন্দময় একঘেয়ে নিঃসঙ্গ জীবনে আনন্দের অফুরন্ত আয়োজন করেছেন। চোখ দুটো জলে ভরে আসতে চায়।
নিজেকে নিয়ে এখন আমার গর্বের অন্ত নেই। শেষের দিন যত এগিয়ে আসছে, হৃদয় ততই আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠছে। দেশের মুক্তিযজ্ঞে এই প্রথম একজন মুসলিম তরুণ আত্মাহুতি দেবে। আমি এখন ক্ষুদিরাম, কানাইলালের সহযাত্রী। তাঁদের স্বপ্ন-সাধনার অংশীদার। মনে হয়, ওঁরা আমার দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন, আশীর্বাদ করছেন আমাকে।
ভেবে পাইনা, মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় কেন। মৃত্যু আর জীবন তো হাত ধরাধরি করেই চলে। কবির ভাষায়, ‘জন্মিলে মরিতে হবে অমর কে কোথা কবে?’ তাহলে নিশ্চিত এই পরিণামকে তো আমাদের হাসিমুখেই বরণ করতে হবে– প্রস্তুত করতে হবে নিজেদের। দুঃখে বিহ্বল হয়ে, শোকে অশ্রু বিসর্জন করে জীবনের পথ চলাকে দুর্গম করে তুলব আমরা কেন?
ফাঁসির আদেশ শোনার পর রামপ্রসাদ বলেছিলেন, আবার যেন ফিরে আসতে পারি এই দেশে, আবার যেন সগৌরবে মুক্তিযজ্ঞে প্রাণ দিতে পারি। সেদিন মনে হয়েছিল, আমি মুসলমান; এই স্বপ্ন দেখার অধিকার তো আমার নেই। আজ মনে হয়, যদি কখনও আল্লার দেখা পাই, তাহলে বলব, একবার, শুধু একবার সুযোগ দাও দেশজননীর পায়ে জীবন উৎসর্গ করতে। এই কামনা নিয়েই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাব আমি। আমাকে তুমি আশীর্বাদ কর মা…………।
=================================================
# এই চিঠিটি জেল থেকে তাঁর প্রানাধিক প্রিয় মাকে লিখছেন অচ্ছু অর্থাৎ আসফাকউল্লা খান যিনি তখন ফৈজাবাদের জেলে ফাঁসির আসামী। আসফাকউল্লা ১৯০০ সালের ২২ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুরে। তাঁর পিতা শফিকউল্লা খান পাঠান পরিবারের মানুষ ছিলেন এবং তাঁর পরিবার সামরিক দিক দিয়ে ছিল বিখ্যাত । বৃটিশের বিরুদ্ধে তাঁদের কার্যক্রম চালানো এবং অস্ত্রশস্ত্র কেনার উদ্দেশ্যে, আসফাকউল্লা ও তাঁর সঙ্গীগণ ১৯২৫-এর ৮ আগস্ট শাহজাহানপুরে একটি সভায় বসেন। অনেক কথাবার্তার পর এটি সিদ্ধান্ত হয় যে তারা সরণপুর লক্ষ্ণৌ চলাচলকারী ৮-ডাউন প্যাসেঞ্জার ট্রেন বহনকারী সরকারি কোষাগার লুট করবেন। ১৯২৫ সালের ৯ আগস্ট আসফাকউল্লা খান এবং অন্য আটজন বিসমিলের নেতৃত্বে ট্রেন লুট করেন।কিন্তু তাঁরা বৃটিশের হাতে ধরা পড়লে সবারই জেল হয়।
১৯২৭- এর ১৯ ডিসেম্বর সোমবার, আসফাকউল্লা খানকে দুই স্তর উপরে বেদিতে নেয়া হয়। যখন তাঁকে শিকল থেকে মুক্ত করা হয়, তিনি ফাঁসির দড়ির কাছে যান এবং সেটিকে চুমু খেয়ে বলেন : “আমার হাত কোনো মানুষ হত্যা করেনি। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ বানোয়াট। আল্লাহ্ আমাকে ন্যায়বিচার দেবেন।” এবং অবশেষে তিনি কলমা আবৃত্তি করতে করতে হাসিমুখে ফাঁসিতে শহীদ হন।

# বাংলা ভাষায় আসফাকউল্লা নিয়ে এটি সম্ভবত প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। শাহজাহানপুরে গিয়ে আসফাকউল্লার পরিবার পরিজন এবং বিভিন্ন স্মৃতি বিজড়িত নানা জায়গার সরজমিন থেকে নানা তথ্য, স্মৃতি, চিঠিপত্র সংগ্রহের মাধ্যমে এই গ্রন্থ রচিত।

ছবিতে পুত্র ও জননী পাশাপাশি
—————————————————————
[ শহিদ আসফাকউল্লা, শংকর ঘোষ, প্রমিথিউস পাবলিশিং হাউস, ১৮ সূর্য সেন স্ট্রীট( ত্রিতল), কলকাতা-৭০০০১২, প্রথম প্রকাশ ২৪ শে মার্চ, ২০১৩। মোবাইল- ৯৩৩২০২৭৭২৬। মূল্য: ১২৫ টাকা ]