সাইয়েদ আজহারউদ্দিন, টিডিএন বাংলা: ভারতের মুসলমানরা ১৯৪৭ সালের পূর্বে ভারতকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করতে সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ১৮১৫ সালের বিদ্রোহে প্রায় ৫,০০,০০০ মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরা সেখানে থেমে থাকেননি এরপর ১৯০৫-এর রেশমি রুমাল তেহরিক ও স্বদেশী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, ১৯০২-এর অসহযোগ আন্দোলনে,

১৯২১ সালের মোপলা আন্দোলন এবং ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’, যে সমস্ত আন্দোলনের মাধ্যমে ভারত ব্রিটিশ পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় মুসলমানদের এই মহান ত্যাগকে প্রথম থেকেই অন্ধকারে ফেলা রাখা হয়েছে, যাতে করে তাঁদের ত্যাগ পরিলক্ষিত এবং প্রশংসিত না হয়।

কয়েকটি অঞ্চলে ইসলামফোবিয়া সাধরণত বর্ণবাদ বা এক শ্রেণির মানুষের আধিপত্যের কারণে হয়ে থাকে কিন্তু ভারতে এটি “ঘৃণা”-র কারণে হয় যা দীর্ঘকাল থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে সংঘটিত হয়ে চলেছে। মিঃ সুহেল কে কে,তাঁর গবেষণার মাধ্যমে একটি তালিকা প্রকাশ করেন, যেখানে বিশেষ কয়েকটি বিষয়কে তিনি তুলে ধরেন, যা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করে।- (ক) মুসলমান এবং ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি হিন্দু বিরোধী (তাদের সংখ্যালঘু তোষণ, সংরক্ষণের রাজনীতি, খাদ্যাভাস, কাশ্মীরে পণ্ডিতদের নির্বাসন)। (খ) ইসলাম সহজাতভাবে হিংসাত্মক, অমানবিক এবং এর অনুসারীরা নিতান্তই খারাপ চরিত্রের অধিকারী (তারা ইসলামকে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের সাথে সংযুক্ত করে, মাদ্রাসা ও মসজিদকে ঘৃণার স্থান হিসাবে উপস্থাপন করে আক্রমণ করে, প্রাণী হত্যা করে, আমিষ ভক্ষণ করে, তারা অপরিষ্কার এবং অস্বাস্থ্যকর ইত্যাদি)। (গ) মুসলমানরা বিশ্বাসঘাতক, বহিরাগত এবং ভারত হিন্দুদের। মুসলমানরা পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য। (ঘ) জনসংখ্যার উদ্বেগ (প্রেমের জিহাদ, ধর্মান্তর, একাধিক বিবাহ ইত্যাদি) (ঙ) মুঘল ইতিহাস – প্রতিশোধ নিতেই হবে।

ইতিহাস সাক্ষী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে দাঙ্গা বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে দাঙ্গা ভারতের ইতিহাসে কোন নতুন বিষয় না। বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে দাঙ্গা সংঘটিত হয়, ১৯৬৪ সালে কলকাতার দাঙ্গার মাধ্যমে এই দাঙ্গা ঘটিত ঘটনার সূত্রপাত হয়, ১৯৬৯ সালে গুজরাটের দাঙ্গা, ১৯৭০ সালে মুরাদাবাদের দাঙ্গা, ১৯৮৩ সালে নেলি গণহত্যার ঘটনা, ১৯৮৭ সালে হাশিমপুরের গণহত্যার। ১৯৯২ সালে বোম্বাই দাঙ্গা (বাবরি মসজিদ ইস্যু), ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গা, ২০১৩ সালে মুজফফরনগর দাঙ্গা, ভুয়া অভিযোগে মুসলিম যুবকদের মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার যা একটি ধারাবাহিক ঘটনাতে পরিণত হয়েছিল, রাস্তায় নিরীহ ১০ জন মুসলমান যুবককে হত্যা করা হয়েছিল, সিএএ-বিরোধী (নাগরিকত্ব বিরোধী সংশোধনী আইন) আন্দোলন কেন্দ্র করে দেশ জুড়ে মুসলিমদের গণহত্যা এবং সাম্প্রতিক ২০২০ সালে দিল্লীর গণহত্যা ২০০২ এর গুজরাটের দাঙ্গার অবিকল রুপ, ২০০২ সালে গুজরাট গণহত্যার সময় তৎকালীন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আর বর্তমান দেশের প্রধানমন্ত্রী যেমন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে ছিলেন এই গণহত্যার ব্যাপারেও তিন দিন যাবত নীরব ছিলেন । এমনকী কোভিড নাইটিন এই প্রকোপ কালেও এই হিংসা তথা বিদ্বেষ থেমে নেই। করোণা সংকট মোকাবেলায় প্রশাসনের ব্যর্থতাগুলি আড়াল করতে তাবলিগ জামাতকে বলির পাঁঠা বানানো হয়। মুসলিম ছাত্র, ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, সমাজ কর্মীদের যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং গ্রেফতার করা হচ্ছে তা কোভিড নাইনটিনের থেকে বেশি আতঙ্কের না।

ভুয়া সতর্কতা: ভারতে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ চলাকালীন বহুল প্রচলিত ইসলামফোবিক সংবাদগুলির একটি তালিকা মিডিয়া স্ক্যানার দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে যা একটি ফ্যাক্ট-চেক ওয়েব পোর্টাল। একজন প্রবীণ মুসলিম বিক্রেতার ফলের উপর মূত্র ছিটিয়ে দেওয়ার মিথ্যা দাবি সহ একটি মিথ্যা ভিডিও, ইসলামোফোবিক মনোভাবের জন্য বিশ্বে পরিচিত সম্বিত পাত্র (বিজেপি প্রবক্তা), সুধারশনের সংবাদ চ্যানেল এবং তারেক ফাতাহার টুইটের পরে বহুল প্রচলিত হয়। এই ঘটনাটি উত্তর প্রদেশের বিজনরের ঘটে, অধিকাংশ স্থানীয় লোকেদের মতে বৃদ্ধ প্রস্রাবের পরে ‘ইস্তিনজা’র পরিষ্কারের কাজের জন্য ব্যবহারিত বোতল ব্যবহার করেছিলেন এবং পুলিশও এব্যাপারে কোন কিছুই নিশ্চিত করতে পারেনি এবং বৃদ্ধ বিক্রেতা এখনো তদন্তাধীন। এই ভুয়ো সংবাদ কিছু হিন্দুত্ববাদী সদস্য হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাতে মুসলিমদের ব্যাবসা না করতে দেওয়ার হুমকির জেরে তৈরি করেছিল।

ভারতীয় কিছু মিডিয়া যখন কোভিড -১৯ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মুসলমানদের বিশেষত তাবলীগ জামাত লোকদের লক্ষ্যবস্তু করা শুরু করেছিল, তখন ইসলামিক সহযোগিতা-সম্পর্কিত স্বাধীন স্থায়ী মানবাধিকার কমিশন অর্গানাইজেশন ১/২ OIC-IPHRC ভারতবর্ষে মুসলিমদের কোভিড -১৯ ছড়িয়ে দেওয়ার অপবাদ এবং ভারতবর্ষে নিরলস জঘন্য ইসলমোফোবিয়া অভিযানের নিন্দা জানায়। পাশাপাশি ভারতীয় গণমাধ্যমগুলির বৈষম্যমূলক, হিংসাত্মক প্ররচনা এবং দায়মুক্তিতার বিরুদ্ধেও নিন্দা জানাই। ২/২ OIC-IPHRC ভারতবর্ষের ইসলমোফোবিয়ার ক্রমবর্ধমান জোয়ার বন্ধে এবং নিপীড়িত মুসলিম সংখ্যালঘুদের International Human Resource Law অনুযায়ী অধিকার রক্ষার জন্য ভারত সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিক্রিয়া হিসাবে, ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী (সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী) মুখতার আব্বাস নকভি প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া তে উক্তি দেন, ভারত মুসলমানদের জন্য স্বর্গসম এবং তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকার সুরক্ষিত। ভারতের মুসলমানরা সমৃদ্ধ, যারা পরিবেশকে বিকৃত করার চেষ্টা করছে তারা তাদের বন্ধু হতে পারে না।
আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর এই মন্তব্যের পরে, মুসলমানরা মুক্তার আব্বাস নকভির তথাকথিত স্বর্গসম দেশে সামাজিক মুসলমানরা বয়কটের মুখোমুখি হতে হয় । বেঙ্গালুরুতে মুসলমানরা ভাইরাস ছড়াচ্ছে এই দাবি পেশ করে ক্লিনিকে মুসলমানদের প্রবেশে অসম্মতি জানানো হয়, মুম্বাইয়ে এক প্রবীণ ব্যক্তি অনলাইনে অর্ডার করা মুদির জিনিসপত্র দিতে আসা মুসলিম ছেলের কাছে থেকে নিতে অস্বীকার করেন , পরে তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। দিল্লিতে তামিলনাড়ুর একজন ডায়াবেটিস রোগী খাদ্য ও চিকিৎসার সহায়তার অভাবে কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে মারা যান এবং একইভাবে, রাঁচি শহরের স্থানীয় মুসলমানরা জানায় ,তারা যেহেতু ভাইরাস ছড়াচ্ছে তাই তারা যাতে জল পান করতে না পারে সেই কারণেই ব্যবহারকৃত হ্যান্ড পাম্পটি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।

“সুতরাং, যে কোনও দেশে, নিরপেক্ষভাবে রাষ্ট্রের কার্য পরিচালনায় সংখ্যালঘুদের বিশ্বাস এবং আস্থা অর্জন করা একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আর এটিই একটি রাষ্ট্রের ন্যায় বিচারের পরিচায়ক।” (বিচারপতি রাজিন্দর সাচার কমিটি ২০০৬)। সিএইচআরআই এবং কুইল ফাউন্ডেশন একটি নথি প্রকাশ করেছে, যাতে তারা সংখ্যালঘুদের সাথে পুলিশের আচরণের প্রকৃতি বা ধরণ খুঁজে পায়। এতে বলা হয়েছে, ভারতে পুলিশের পেশাটা যেন উত্তরাধিকার সূত্রে ঔপনিবেশিক একটি প্রথা এবং এটি আজ একপ্রকার স্থায়ী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকমুখী পুলিশদের আদর্শগতভাবে দূরে থাকা একপ্রকার আর্দশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তারা কেবল ক্ষমতায় থাকা শাসনকর্তাদের হয়ে কাজ করা সরঞ্জামে পরিণত হয়েছে। পুলিশদের অবিচ্ছিন্ন প্রবণতাগুলির সংক্ষিপ্ত বিবরণ – সংঘর্ষ হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় পদ্ধতিগত লঙ্ঘন – উক্ত বিষয় গুলির ব্যাপারে আধুনিক গণতান্ত্রিক ভারতে সংবিধানের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের অধিকারের অধিকারী হিসাবে যে ভূমিকা রয়েছে তার সাথে পুলিশের ভূমিকার কোন সাদৃশ্য নেই । এমনটি বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী সম্পন্ন স্বাধীন ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে একজন পুলিশের থেকে প্রত্যাশা করা হয়নি। কেন্দ্রে, ১৯৬৪ সাল থেকে পুলিশ আইন কার্যকর সূচনা হয়। ১৮৬১ সাল থেকেই ভিন্নতার মাঝে একজন পুলিশের জন্য কী বিধান বা সে কেমনভাবে উপস্থাপিত হবে সে ব্যাপারটা আইন থেকে সম্পূর্ণ অবলুপ্ত। একই সাথে, ভারতীয় সংবিধান নাগরিকদের সমতা এবং জীবন, স্বাধীনতা, ভাষা, ধর্ম এবং সংস্কৃতি সম্পর্কিত ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণ, সুরক্ষা এবং আশ্বাস প্রদানের রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংবিধানের ১৫নং অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মের জায়গার ভিত্তিতে বৈষম্যকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাষ্ট্রের অন্যান্য সংস্থা গুলির মত পুলিশ অর্থাৎ দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ অন্যান্য বিষয়গুলির সাথে সাথে সমতা এবং সমান আচরণের প্রদর্শন এবং সমর্থন করার আদেশ মান্য করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। যদি পুলিশ ব্যাবস্থা নিরপেক্ষ ও বৈধ করতে হয় তবে পুলিশের মধ্যে এবং বিভিন্ন বিষয়ে পুলিশের প্রতিক্রিয়া উভয় কে পক্ষপাতদুষ্ট থেকে মুক্ত করা অত্যাবশ্যক।

(মুসলিম ভয়েসেস: ভারতে পুলিশিংয়ের উপলব্ধি, ২০১৮)
এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন ভারতে মুসলমানদের বয়কটের নিন্দা জানিয়েছে এবং নিউজ লিঙ্কটি শেয়ার করে টুইট করেছে যে, ইউএসসিআইআরএফ হিন্দু ও মুসলিম রোগীদের #গুজরাটে পৃথক হাসপাতালের ওয়ার্ডে বিচ্ছিন্ন হওয়ার রিপোর্ট নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই জাতীয় পদক্ষেপগুলি কেবল # ইন্ডিয়ায় মুসলমানদের চলমান কলঙ্ককে আরও বাড়িয়ে তুলতে এবং # COVID19 ছড়িয়ে দেওয়ার মুসলমানদের মিথ্যা গুজব আরও বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করে।
বিশ্ব যখন ভারতে ইসলামফোবিয়ার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছিল, তখন ভারতবর্ষে লকডাউন চলাকালীন এই সমস্ত অমীমাংসিত প্রশ্ন কোন প্রতিক্রিয়াশীল উপায়ে ঘৃণার জবাব না দিয়ে, মুসলিমরা ধর্ম নির্বিশেষে দরিদ্র ও অভিবাসী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে তাদের ত্রাণ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। মহামারীর কবল থেকে দেশকে রক্ষা করতে তারা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে সমাজে তাদের ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে।
(লেখক বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক)
অনুবাদ: আফরিদা খাতুন আঁখি