মিতা রায়, টিডিএন বাংলা : সাল ২০১৩। মোটরবাইক আরোহী আততায়ীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন দাভোলকর। এরপর ২০১৫ সালে দুষ্কৃতীদের টার্গেট হলেন পানসারে ও কালবুর্গি। ২ বছরের ব্যবধানে একই পদ্ধতিতে হত্যা। এবার দুষ্কৃতীদের নিশানা হলেন গৌরী লঙ্কেশ। আর যার জোরে তোলপাড় হয় গোটা দেশ। গৌরী লঙ্কেশকে কে খুন করল? এর পেছনে কি কারণ থাকতে পারে? কেনই বা তিনি দুষ্কৃতীদের শিকার হলেন? বিষয়টি অবশ্য তদন্ত সাপেক্ষ। কিন্তু যে সব সাংবাদিকরা দুষ্কৃতীদের টার্গেট হয়েছে, তাদের মধ্যে কিন্তু ছিল এক অদ্ভুত মিল। এঁরা প্রত্যেকেই সংকীর্ণ ধর্মবোধ, বর্ণহিন্দুত্বের আস্ফালন ও উন্মত্ত জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান করতেন। ‘কলম’-কেই তাঁরা করেছিলেন প্রতিবাদের হাতিয়ার। হিন্দু- মুসলিম সম্প্রীতির যেমন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন গৌরী, তেমনি সমর্থন করতেন দলিত আন্দোলনকে। এমনকি বিজেপি নেতাদের দুর্নীতির বিষয়েও খবর প্রকাশ করতেন তাঁর সম্পাদিত কাগজে।

এথেকে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠছে, তাঁর নির্ভীকতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের জন্যই কি তাঁকে এইভাবে অকালে চলে যেতে হল? এক্ষেত্রে একজন সাংবাদিক হিসাবে আমার প্রশ্ন, তাহলে একজন ক্ষুরধার সাংবাদিকের নিরাপত্তা কি আমাদের দেশে এতোই ঠুনকো? ভারত সরকার কি আমাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ? যখনই হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলবেন, হিন্দুত্ববাদীদের কথিত জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একমত না হতে পারলেই কি পেতে হবে দেশবিরোধীর তকমা? গত দেড় বছরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অন্ততপক্ষে ৫৪ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন। বিভিন্ন ব্যাক্তি ও সংস্থার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা হয়েছে ৪৫ টি।সোস্যাল মিডিয়ায় কেউ যদি হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে কোনো মন্তব্য করে বসেন তাহলে শুরু হয়ে যাবে ট্রোলিং এর বন্যা।কোথায় তবে সাংবাদিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা? ‌

একজন সাংবাদিকের নিরপেক্ষ থাকাটাই কি চরম অপরাধ? একজন সাংবাদিক যখন কোনো খবর প্রকাশ করেন, তখন তাঁকে বিস্তার পরিশ্রম করতে হয়। মতের অমিল কিংবা সরকারের গৃহীত নীতির সমালোচনা মানেই কি বঙলেটে শরীর বিদ্ধ হওয়া? কিন্তু একটা কথা মনে রাখা দরকার। এইভাবে সত্যের মুখ বন্ধ করা সহজ কাজ নয়। একজন সাংবাদিক সরে গেলে তৈরি হবে আরও একজন। কারন সংবাদ কখনও শেষ হয়না।

নাগরিক সমাজ ইতিমধ্যেই একটি প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। এতো খুনের কিনারা হয়, কিন্তু কোনো যুক্তিবাদীরা খুন হলে আততায়ীদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কেন? পুলিশ কেন অসহায়? যে ভাবে নরেন্দ্র দাভোলকর, গোবিন্দ পানসারে, এম এম কালবুর্গির খুনিদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, সে ভাবেই কি গৌরী লঙ্কেশের খুনিরাও মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াবে সমাজের বুকে? কি উদ্দেশ্যে তিনি খুন হলেন, কারণ কি চিরকালই থেকে যাবে পর্দার আড়ালে? অনেকে তো এও প্রশ্ন করছেন, সত্যের প্রতি যারাই কলম ধরবেন তাদেরই কি এইভাবে কলমের নিপ ভেঙ্গে দেওয়া হবে? দেশের বুকে এরকম তো অনেক সাংবাদিকই আছেন যারা সত্যের পক্ষে কথা বলতে পিছপা হন না। এবার তবে কার দুয়ারে যমরাজ অপেক্ষা করছেন? প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। (সৌজন্যে : দৈনিক কলম)