আবু যুবাইর, টিডিএন বাংলা: নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি একের পর এক বিল পাস করেই চলেছে।এই সরকার নাকি ৪৬ দিনে ৩০টি বিল পাশ করিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এই সকল বিলের মধ্যে যেমন আছে তাৎক্ষণিক তিন তালাকের মত বিতর্কিত বিল তেমনি আছে আনলফুল এক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যমেনডমেন্ট বিলের মত চরম অগণতান্ত্রিক বিল।

তাৎক্ষণিক তিন তালাক বিল নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদী সরকার এই বিল পাশ করতে উদ্যোগ নিয়েছিল।কিন্তু তখন রাজ্য সভায় যথেষ্ট সংখ্যা না থাকায় বিলটা পাশ হতে পারে নি। সেই সময়ও মুসলিম সংগঠনগুলি এই বিলের বিরোধিতায় সোচ্চারভাবে পথে নেমেছিল। দেশের সবকটি বড় শহরে হাজার হাজার মহিলা পথে নেমে এ বিলের বিরোধিতা করে ছিল।

মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড মুসলিম সমাজের তালাক সংক্রান্ত সমস্যার কথা স্বীকার করেও আইন করে সমাধানের পথে না গিয়ে সমাজ সংস্কার ও গণচেতনা সৃষ্টির মাধ্যমে সমাধানের পথে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করে ছিল।তারা দেশ জুড়ে সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণাও করেছিল।মহল্লায় মহল্লায় কাউন্সিলিং সেন্টার খোলা, শরয়ী পঞ্চায়েত খোলা,বিবাহের পূর্বে পাত্র পাত্রীর বিশেষ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি কর্মসূচির কথা ঘোষণাও করা হয়েছিল ঢাক ঢোল পিটিয়ে। কিন্তু কাজ কতটুকু হয়েছে তার কী কোন হিসাব আছে?

আমি সার্বিকভাবে তাৎক্ষণিক তিন তালাক বিলের বিরোধিতা করি, আমি কোন মতেই মনে করিনা মুসলিম নারীদের কল্যাণের স্বার্থে এই বিল নিয়ে আসা হয়েছে। অনেকের মত আমিও মনে করি এই বিলে অনেক অসংগতি আছে।রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করার পর এটি এখন আইনে পরিণত হয়েছে। তাই বিল না বলে তাৎক্ষণিক তিন তালাক আইন বলাই ভালো।এই আইন কার্যকরী হলে সংশ্লিষ্ট পরিবার উপকৃত হওয়া তো দূরের কথা তাদের মধ্যে বিপর্যয় নেমে আসবে।আর এই বিপর্যয়ের সিংহভাগ ভোগ করতে হবে নারী সমাজকে।তার পরেও আমি মুসলিম সমাজের উদ্যেশে কিছু কথা বলতে চাই।

আজকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার মুসলিম পারিবারিক আইন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, ইসলামী শরীয়াতের বিরুদ্ধে গিয়ে পৃথক আইন এনে মুসলিম নারীদের সুরক্ষার কথা বলছে।একি সরকারের নিছক গা-জোয়ারী না এর পিছনে কোন বাস্তবতাও আছে? মুসলিম সামজ কি সত্যিই ইসলামী শরীয়াত মেনে চলে? না কী শরীয়াতের নামে সেখানে চলে আমপারা পড়া হাম্বড়া মৌলভীদের মনগড়া ফেকাহ।মুসলিম সমাজে কী তালাক ও নিকাহ হালালার মত জঘণ্য মানবতা বিরোধী, শরীয়াত বিরোধী, নারী বিরোধী প্রথা যুগ যুগ ধরে চালু নেই? আজকের যারা তাৎক্ষণিক তিন তালাক আইনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে তারা যুগ যুগ ধরে তালাক উচ্চারণ হলেই তালাক হয়ে গেছে বলে ফতোয়া দিতনা?এখনও কী সেই মৌলভিরা তালাকের কোরআন হাদীস প্রদত্ত বিধান মানতে রাজি আছেন? নাকি তাদের কাছে কোরআন হাদিসের থেকে ফিকাহ অনেক বড়। যারা আল্লার কালাম ও নবীর হাদিসের থেকে ফিকাহ শাস্ত্রকে বেশি গুরুত্ব দেয় তারা যে কত ভয়ংকর হতে পারে তা মুসলিম সমাজ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। এখানেও আমি বলে রাখতে চাই আমি কোন ভাবে ফেকাহ শাস্ত্রকে অবজ্ঞা করছিনা। আমি তা করতেও পারিনা। ইসলামে ফেকাহ শাস্ত্রের মর্যাদা যথাস্থানে রাখতে হবে। ইসলামী জুরিসপুডেন্ট বা বিচার শাস্ত্রে অবশ্যই যুগ যুগ সঞ্চিত মুজতাহিদ, ইমাম, ফকীহদের অভিমতের গুরুত্ব আছে। কিন্তু ফেকার নামে নিজেদের মনগড়া তথ্য চাপিয়ে দেওয়া হলে তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিশেষ করে কুরআন হাদীসের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকার পর কেউ যদি ফেকাহর দোহাই দিয়ে তাকে পাস কাটাতে চায় তাকে কোন মতে মেনে নেওয়া যায়না। সাধারণ মানুষের পক্ষে ধর্মীয় বিধানের গভীরতায় ঢোকা সম্ভব নয়।সে ক্ষেত্রে সমস্ত বিষয়ে উলামায়ে কেরামদের একমত হয়ে একটি সিদ্ধান্তে আসা জরুরি। দুর্ভাগ্য বসত সে কাজ হতে পারে নি। বরং হয়েছে তার উল্টোটা। ওয়াজ নাসিহাতের মাধ্যমে ইলমী বাহাসকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে মুসলিম মিল্লাতকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।এতে আলেম উলামাদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ভক্তির প্রভাব যেমন কমেছে তেমনি সমাজের প্রতি তাদের নিয়ন্ত্রণ ও শিথিল হয়ে গেছে। যার ফলে মুসলিম সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে অনাচার আর কুসংস্কার।

আজ আমরা তাৎক্ষণিক তিন তালাক নিয়ে এতো কথা বলছি।কিন্তু আমরা কী কখনো নিজেদের প্রশ্ন করেছি যে মুসলিম সমাজে পন প্রথা থাকবে কেনো? মুসলিম সমাজে পিতা আবার কন্যাদায়গ্রস্ত হবে কেন? মুসলিম পিতার কাছে কন্যা তো রহমত স্বরূপ। নারী জাতির প্রতি বঞ্চনার সব বিধান তো তেরো শত বছর আগে দুনিয়া থেকে মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে।তাহলে এক্ষেত্রে মুসলিমদের সঙ্গে অন্যদের পার্থক্য কোথায়। মুসলিম সমাজ কি পিতার সম্পদে কন্যার অংশ ঠিক ঠাক বুঝে দেয়? বাস্তবতা বলছে এক্ষেত্রেও মুসলিমদের সঙ্গে অন্যদের বিশেষ ফারাক নেই। আমাদের সার্বিক চিন্তা শুধু বিবি তালাকের ফতোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? আর এসব নিয়ে ভাববে কে? নাকি সরকার আবার এগুলো নিয়ে টানাটানি করলে তখন আমরা রাস্তায় নামবো?

আমরা তালাক নিয়ে এতো কথা বলছি, কিন্তু অবৈধ তালাকের দগ দগে ঘা নিয়ে এখনও মুসলিম সমাজে জ্বলছে হাজার হাজার মহিলা। সত্যিকারের সমাজ সংস্কার করতে হলে এই অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে হবে। হম্বি তন্বী করে রাজপথ গরম না করে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে আমরা যদি শরিয়তি আইনের শীতলতা সর্বত্র পৌঁছে দিতে পারি তাহলে তিন তালাক আইনের মুকাবিলায় সেইটাই হবে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।