টিডিএন বাংলা: দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জবরদস্তিমূলক আইনের সাহায্যে পাঞ্জাবের কমবয়সী যুবক ও পুরুষদের ইউরােপ ও মধ্য এশিয়ায় যুদ্ধ করতে নিয়ে যাওয়া,যুদ্ধে তাদের মৃত্যু ও জখম হওয়া এবং শত্রুপক্ষের হাতে বন্দী হওয়া,সিঙ্গাপুরের সিপাহীদের বিদ্রোহ করা এবং ভারতের বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবের অধিবাসীদের মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন মনােভাব বৃটিশ শাসকদের জানা ছিল। যুদ্ধ ফেরৎ সৈনিকেরা দেশে ফিরে গভীর সংকটের সম্মুখীন হন। ১৯১৯ সালের কালা কানুনের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ সভার তরফে গান্ধীজীর শান্তিপূর্ণ হরতাল পালনের আহবানে পাঞ্জাব অভূতপূর্ব সাড়া দেয়। পাঞ্জাব সরকার গান্ধীজীকে পাঞ্জাবে ঢুকতে না দিয়ে তাকে বােম্বাই পৌছে দেয়। এই ঘটনা পাঞ্জাবে প্রচার হয় যে,গান্ধীজী গ্রেপ্তার হয়েছেন। ৬ এপ্রিলের হরতাল শান্তিপূর্ণ থাকে। ৯ এপ্রিল হিন্দুদের একটি উৎসব ছিল। শােভাযাত্রায় হিন্দু ,মুসলমান ও শিখেরা অংশ গ্রহণ করে। গান্ধীজীর গ্রেপ্তারের ভুল খবরে ১০ এপ্রিল লাহােরে বিক্ষোভ শোভাযাত্রা হয়। শােভাযাত্রার উপর পুলিশ গুলি চালায়। সত্যপাল ও সৈফুদ্দিন কিচলুকে অমৃতসর থেকে বহিস্কার করা হয়। এই সংবাদে ক্ষিপ্ত হয়ে কিছু লােক ডেপুটি কমিশনারের অফিসে গিয়ে ঐ আদেশ প্রত্যাহারের আবেদন জানায়। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে ঘােড়াসােয়াররা জনতার উপর গুলি চালায়। গুলি চালানাের খবরে যাঁরা প্রতিবাদ করতে আসেন, তাদের উপরেও গুলি চলে। এটা হয় ১১ এপ্রিল। সরকার শহরের দায়িত্ব রক্ষার ভার সামরিক বাহিনীর উপর অর্পণ করেন। সরকার থেকে ১২ এবং ১৩ এপ্রিল ঘােষণা করা হয় যে, আইন অমান্য করলে শাস্তি পেতে হবে।

১৩ এপ্রিল জালিওয়ানাবাগে এক প্রতিবাদ সভা ডাকা হয়। জালিওয়ানাবাগ একটি ছােট পার্ক। পার্ক থেকে বের হওয়ার মাত্র একটি পথ খুবই সঙ্কীর্ণ। বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে, ১৫ থেকে ২০ হাজার লােক বক্তৃতা শুনতে হাজির হয়েছিল। বক্তৃতা চলাকালীন মাইকেল ডায়ারের আদেশে সেনাবাহিনী কোনাে রকম সতর্ক না করে গুলি চালাতে শুরু করে। বের হওয়ার কোনাে পথ নেই। শত শত লোক গুলিতে মারা যান। অনেকে মৃতদেহের স্কুপের চাপে, অনেকে আহত হয়ে তৃষ্ণা মেটাতে জল না পেয়ে মারা যায়। কত লােক সৈন্যদের গুলিতে প্রাণ হারান, তা কেউই জানে না। গণহত্যার পরে অমৃতসর-এ দুই মাস কার্ফু থাকে। শহরের জল সরবরাহ বন্ধ করে, বিদ্যুৎ সংযােগ কেটে দেওয়া হয়। সামরিক আইনে অনেকের বিচার হয়। অনেকেরই বিচারে মৃত্যুদণ্ড এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৬ এপ্রিল পাঞ্জাবের তিন নেতা রামভাজ দত্তচৌধুরী, হরকিষেণ লাল এবং দুনি চাঁদকে গ্রেপ্তার করে পাঞ্জাবের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রথম মিন্টো প্রােফেসার মনােহর লালকে গ্রেপ্তার করে। ১৫ এপ্রিল থেকে ২৯ মে পর্যন্ত অমৃতসরে সামরিক বাহিনীর তাণ্ডব চলে। ১৩ এপ্রিল গণহত্যার খবর পেয়ে নিকটবর্তী শহর কাসুরে একদল লােক লুটপাট করে ও যত্রতত্র আগুন দেয়। সারা পাঞ্জাবে সামরিক আইন জারি হয়।

সংবাদপত্রের উপর কঠোর নির্দেশের জন্য সংবাদপত্রে জালিওয়ানাবাগের গণহত্যার খবর ছাপা হয় নি। লাহােরের দৈনিক ট্রিবিউন পত্রিকার অফিসে তালা লাগিয়ে সম্পাদক কালীনাথ রায়কে জেলে পাঠানাে হয়। ১৯১৯ সালের মে মাসে বিচারে কালীনাথ রায়ের দুবছর জেল এবং এক হাজার টাকা জরিমানা হয়। কালীনাথ রায় জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে আবার ট্রিবিউন এর সম্পাদক হন। এই সময়ে বােম্বের ইংরেজি দৈনিক ‘ বােম্বে ক্রণিকল ’- এর সম্পাদক ছিলেন ইংরেজ সাংবাদিক বেঞ্জামিন গাই হ্যার্ণিমান। তিনি ছিলেন বােম্বাইতে গান্ধীজীর ‘সত্যাগ্রহ সভার’ সদস্য। হ্যার্ণিম্যান পাঞ্জাবে সামরিক শাসনের নগ্ন প্রজা চিত্র কনিশ করা লালা গােবর্ধন দাশের লেখা বােন্থে ক্রনিকল – এ ছাপান। সেই জন্য পাঞ্জাবের সামরিক আদালতে লেখকের তিন বছর জেল হয়। সম্পাদক হার্ণিমান ১৯১৯ সালের ২৬ এপ্রিল অমৃতসরে গণহত্যার উপর নিজের লেখা ছাপান। এই অপরাধে ভারত সরকার ভীষণ অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও হ্যর্ণিম্যানকে ইংলণ্ডে ফেরৎ পাঠান। সংবাদ নিয়ন্ত্রনের জন্য পাঞ্জাব সারা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভাইসরয় গান্ধীজীকে পাঞ্জাবে যাওয়ার অনুমতি দেন নি। জালিওয়ানাবাগে গণহত্যার যে বিবরণ বাইরে আসে, সেই খবরে সারা ভারতে বিষাদের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞীর দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করেন। ভারতীয়রা লণ্ডনে গিয়ে বৃটিশ সরকারকে তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানান। বৃটিশ সরকার তদন্ত কমিশন গঠন করেন। পাঞ্জাবের নেতাদের জেলে বন্দী রেখে গণহত্যার তদন্ত শুরু করায় কংগ্রেস ঐ তদন্ত কমিশন বয়কট করে। কংগ্রেস নিজেই তদন্তের জন্য মতিলাল নেহেরু, চিত্তরঞ্জন দাশ, ফজলুল হক, আব্বাস তায়েবজী এবং মােহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে সদস্য এবং কে শান্তনমকে সম্পাদক করে এক তদন্ত কমিশন গঠন করে। ফজলুল হক কমিটি থেকে পদত্যাগ করায় জয়াকর ঐ কমিটির সদস্য হন। তদন্তের পর কমিটি গান্ধীজীকে তদন্ত রিপাের্ট লেখার ভার দেয়। ১৯২০ সালে কংগ্রেস অধিবেশনে ঐ রিপাের্ট পেশ করেন গান্ধীজি।

(সৌজন্য: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিম শহিদ, প্রশান্ত হালদার)