আলি আকবর, টিডিএন বাংলা : আজীবন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের রক্ষক ছিলেন সিংহ সাহসী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। পুরো নাম আবুল কালাম মহিউদ্দিন আহমেদ, যিনি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ নামেই অধিক পরিচিত। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, সুবক্তা, বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী, অতলদর্শী তাফসীরবিদ, অমর মর্যাদায় মহীয়ান নেতা এবং ভারতের সিংহ-সাহসী স্বাধীনতা সংগ্রামী। ১৮৮৮ সালের ১১ নভেম্বর সৌদি আরবের মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ও স্বাধীন ভারতের শিক্ষাবিস্তারে তাঁর উজ্জ্বল ভূমিকার কথা স্মরণে রেখে তাঁর জন্মদিনটি সারা দেশে “জাতীয় শিক্ষা দিবস” হিসেবে পালন করা হয়।

পিতা মৌলানা খয়রুদ্দিন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা আফগানিস্থানের হেরাত থেকে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। মৌলানা খয়রুদ্দিন ১৮৯০ সালে বসবাসের জন্য কোলকাতায় ফিরে আসেন। রক্ষণশীল পরিবারের সদস্য হওয়ায় মৌলানা আজাদকে বাড়িতে বসেই সাবেকি পদ্ধিতে শিক্ষাগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। মাত্র পনের বছর বয়সেই তিনি আরবী ও ফারসী ভাষায় বিশেষ দখল অর্জন করেন। তিনি আরবীতে, দর্শন, জ্যামিতি, গনিত ও বীজগনিতের উপর শিক্ষালাভ করে শিক্ষা-অর্জনের সমস্ত ধাপ সমাপ্ত করেন এবং শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের লেখা তাঁর নজরে আসে। তিনি আধুনিক দর্শন, বিজ্ঞান ও সাহিত্য সম্পর্কে উৎসাহী হয়ে উঠেন। এজন্য তিনি তৎকালীন প্রাচ্যশিক্ষা পাঠক্রমের প্রধান পরীক্ষক মৌলভী মোহাম্মদ ইউসুফ জাফরীর কাছে ইংরেজী শেখেন। আস্তে আস্তে সাহিত্যের প্রতি তাঁর ঝোঁক বাড়তে থাকে। তাঁর সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম দিক ছিল গদ্যশৈলীর অনন্যতা, নিজস্বতা, মধুরতা ও জাদুময়তা। এছাড়াও তিনি ছিলেন জীবনীকার, অনুবাদক, ধর্মীয় চিন্তাবিদ ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। মৌলানা আজাদ ছিলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকার ও কলমকারের একজন। আবুল কালাম আজাদ ১৯১২ সালের জুন মাসে ‘আল-হিলাল’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। উর্দু সাংবাদিকতার ইতিহাসে ‘আল-হিলাল’ প্রকাশ এক যুগান্তকারী ঘটনা। তিনি সাংবাদিকতার পেশা গ্রহণ করে ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা করেন এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে সমর্থন জানান। বলিষ্ঠ জাতীয়তাবাদের অভিনব সুরের জন্য পাঠক ‘আল-হিলাল’ পত্রিকার প্রতি আকৃষ্ট হল। তাঁর প্রকাশিত গ্রস্থের মধ্যে আছে ‘আল-বায়ান’ (১৯১৫)এবং ‘তারজমা-উল-কোরান’ (১৯৩৩-১৯৬৯)। এছাড়া ‘তাজকিবাহ’ (১৯১৬)হল আত্মজীবনীমূলক রচনা এবং ‘গাবর-ই-থাতির’(১৯৪৩) চিঠিপত্রের সংকলন অন্যতম। “ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম” বইটি মৌলানা আবুল কালাম আজাদের আত্ম জীবনীমূলক রচনা। যেটি ভারতীয় ইতিহাসের পাতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ব্রিটিশদের হাত থেকে ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে মৌলানা আজাদের অন্যতম প্রধাণ ভূমিকা ছিল। এই গ্রন্থে তিনি ভারত-ভাগের পটভূমিসহ ১৯৩৫-৪৮ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাবলীর অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা দিয়েছেন। অনেক ইতিহাসবিদের কাছেই বইটি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে অনন্য স্থান করে নিয়েছে।

মৌলানা আজাদ খিলাফৎ আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেন। সেই সময় তিনি মহাত্মা গান্ধীর সংস্পর্শে আসেন। আজাদ ১৯১৯ সালের রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে গান্ধীজির অহিংস অসহযোগের ধারণায় অণুপ্রেরিত হয়ে অসহযোগ আন্দোলন সংগঠনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯২৩ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনিই ছিলেন কংগ্রেসের সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি। ১৯৩১ সালে মৌলানা আজাদ  সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। এই সময় তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠেন। তিনি ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণা এবং হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির কথা প্রচার করেন।ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় পাঁচ বছর (১৯৪০-৪৫) তিনি কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিন বছর তিনি কারারুদ্ধ ছিলেন। যে সকল ভারতীয় মুসলমান মুসলমানদের জন্য পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবির বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিলেন মৌলানা আজাদ। তিনি ভারতের অন্তর্বর্তী সরকারেও মন্ত্রীত্ব করেন। দেশভাগের অব্যবহিত আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির প্রচেষ্টা চালান। স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে তিনি বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার জন্য আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করেন। তিনি ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন স্থাপন করেন। ১৯৫৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ৬৯ বছর বয়সে ভারতের দিল্লীতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরোলোকগমন করেন এই মনিষী। ১৯৯২ সালে তাকে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ভারতরত্নে (মরণোত্তর) ভূষিত করা হয়।

মৌলানা আজাদ বলতেন, ‘এটা ভারতের ঐতিহাসিক ভাগ্য যে অনেক মানবজাতি এবং সংস্কৃতি এখানে আছে, তার নিজের মাটিতে এমন একটি দেশ যেখানে অনেক কারাভান আশ্রয় পাবে… মুসলমান ও হিন্দুর এগারশো বছরের মিলিত ইতিহাস নানা সংস্কৃতি অর্জনের মাধ্যম ভারতকে সমৃদ্ধ করেছে। আমাদের ভাষাসমূহ, কবিতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প, পোশাক, আমাদের আচরণ এবং রীতি সবকিছুই আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার সাক্ষ্য বহন করে আমাদের এই হাজার বছরের যৌথ জীবন আমাদের একটি সাধারণ জাতীয়তায় একীভূত করেছে পক্ষান্তরে, আমরা এটা পছন্দ করি বা না করি, আমরা এখন অখণ্ড এবং অবিভাজ্য ভারতীয় জাতিতে পরিণত হয়েছি- কোন সুদূর কল্পনা কিংবা নীলনকশা ঐ ঐক্য ভেঙে পৃথক ও খণ্ডিত করতে পারবে না।’মৌলানা আজাদ ছিলেন সেই সময়ের এক প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রপরিচালক, যার কাছে ভারত হলো ঐক্য এবং এর ভারতীয় জনগণের মাঝে যত বৈচিত্র্যই থাকুক সেখানে হয়তো আজাদের জীবন, বিশ্বাস, আচরণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কীভাবে সংকীর্ণ বিষয়াদির ঊর্ধ্বে সমাজে আলোকিত নাগরিক হওয়া যায়। কীভাবে আঞ্চলিক ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সংস্কারের অস্বাস্থ্যকর দেয়াল পেরিয়ে জাতীয়তাবাদের উচ্চচেতনা লালন করা যায়। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক অর্জনের মধ্য দিয়েই ভারত তার বিশালতাকে সম্পূর্ণ করতে পারে। ভারত তখনই পূর্ণতা বোধ করতে পারবে, যখন গোষ্ঠীচেতনার ঊর্ধ্বে উঠে ভারতাত্মার জন্য সম্প্রদায়গুলো প্রগতির লক্ষ্যে একীভূত হবে।

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আজাদ মহাত্মা গান্ধীর চিন্তা ও আদর্শ থেকে যে সততার দৃষ্টিলাভ করেন, কয়েক দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই চিন্তা ও আদর্শ দেশকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করেছে। তার দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার ও প্রসারের বিভিন্ন পন্থার কথা ভেবে এবং ভারতকে শক্তিশালী করেই এই মানুষটির প্রতি সর্বোত্তম শ্রদ্ধা নিবেদন সম্ভব।