মোকতার হোসেন মন্ডল, টিডিএন বাংলা: বামেদের একাধিক সংগঠন বিজেপি নেতাদের ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দিয়েছে। অমিত শাহের মিছিলের দিন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের ছেলেরা বিজেপি বিরোধী স্লোগান দিলে সেটা প্ররোচনা হবে কেন? কেজরিওয়ালকে থাপ্পড় মারা হয়েছে, কংগ্রেসের কোনও কোনও নেতাকে জুতো ছোড়া হয়েছে, কিছুদিন আগে বিজেপি শাসিত আসামে মোদি, অমিত শাহের বিরুদ্ধে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেয় বিরোধীরা। মমতার সামনে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে উস্কানি দিয়েছে বিজেপি কর্মীরা। এমনকি মমতার বাড়ির ঠিকানায় ‘জয় শ্রীরাম’ লিখে ডাক যোগে হাজার হাজার পোষ্ট কার্ড পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিছুদিন আগে এপিডিআর-র মিছিলে হিন্দুত্ববাদী একটি সংগঠনের কর্মীরা হামলা চালায়। এখন তৃণমূলের উপর সব রাগ কেন? অমিত শাহের মিছিলের দিন শুধু তৃণমূল কেন, বামেদের কি উচিত ছিলোনা একই সাথে কথা বলার? একটি দলের উপর রাগ করতে গিয়ে ফ্যাসিবাদকে সমর্থন করবেন? যদি তৃণমূল সেদিন উস্কানি দেয় তাহলে আগের বিভিন্ন সময় বামেদের কর্মসূচিগুলি কী ছিল? উস্কানি নয়? আপনারা কি এখনও ভাবেন বিজেপি ফ্যাসিবাদী দল নয়? আপনারা কি তৃণমূলের মতো একটা কিছুদিনের আঞ্চলিক শক্তিকে বৃহত্তর রাষ্ট্রব্যাপী শক্তি বিজেপির সাথে তুলনা করেন? আপনারা কি মনে করেন ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের সব দিক ঠিক ছিল, মানুষ অন্যায় করে আপনাদের তাড়িয়ে দিয়েছে? আপনারা কি মনে করেন কংগ্রেস-ই রাজ্যে আপনার বন্ধু? তাহলে তৃণমূল যখন ছিলোনা তখন কংগ্রেস সিপিআইএম সন্ত্রাস করে হাজার হাজার মানুষকে খুন করা হলো কেন? ভবিষ্যতেতেও যে বিজেপিকে ঠেকাতে তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিআইএম জোট হবেনা কে নিশ্চয়তা দেবে? কংগ্রেসের সাথে বাংলায় আপনাদের জোট হবে, এটা আশির দিকে ধারণা করতে পেরেছিলেন?আমি নিজেও তৃণমূলের সব কাজের পক্ষে নই। আমি এটাও বিশ্বাস করি, তৃণমূলের ভুল পদক্ষেপের কারণেই রাজ্যে বিজেপি আরএসএসের উত্থান হয়েছে বেশি। কিন্তু দেশব্যাপী সর্বগ্রাসী শক্তিকে সত্যিই কি আপনারা ঠেকাতে পারতেন? ত্রিপুরাতে ঠেকাতে পেরেছেন? তাহলে সহজ বাস্তবটা মেনে নিয়ে দেশ ও বাংলা রক্ষায় গঠনমূলক সমালোচনা কেন করছেন না? কেন আপনাদের নেতা কর্মীরা তৃণমূলের মতোই সব বিজেপি করছে? ভেবেছেন? ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের উপর আঘাত এসেছে, এটা যে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় তা ভুলে যাচ্ছেন কেন? কবি সুকান্ত, লেলিন, আম্বেদকরের মূর্তি ভাঙার কালচার কে তৈরি করেছে? তৃণমূল? বামপন্থীদের শ্মশানে পাঠানোর জন্য আদর্শিক লড়াই কে করছে? তৃণমূল? ভুল বকছেন।তৃণমূল কংগ্রেস হচ্ছে একটা আঞ্চলিক শক্তি এবং এই দলের বেশিরভাগ নেতা বাঙালি ও বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতির সাথে যুক্ত। তৃণমূল কংগ্রেস যতই ফ্যাসিবাদী কাজ করুক তা কখনও বিজেপির মতো ভয়াবহ হয়নি। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়, গণতন্ত্র মানে শুধু ক্ষমতায় থাকা নয়। তৃণমূল একক নেতৃত্বে পরিচালিত দল, আগামী দিনে এই দল বিরাট কিছু করতে পারবে না। পারা সম্ভব নয়। কেননা, ক্যাডার ভিত্তিক নির্দিষ্ট আদর্শকে সামনে রেখে তৃণমূল তৈরি হয়নি। আম আদমি পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস এই ধরণের দল কখনও দীর্ঘস্থায়ী রাজনীতির জন্য নয়। বছরের পর বছর ধরে, দশকের পর দশক ধরে একটি সংগঠিত ও পরিকল্পিত সংগঠন যারা গড়ে তুলেছে তারা কারা? এর বাইরে  বিশেষ কোনও ব্যাক্তি, বিশেষ কোনও ইতিহাসকে সামনে রেখে বহু রাজনৈতিক দল আছে, থাকবে। শুধু ভারত নয়,পৃথিবীর ইতিহাসে একক বা ইস্যু ভিত্তিক গড়ে ওঠা দলগুলো দ্রুত ক্ষমতা পেয়েছে। কয়েকশো বছর পর আবার তা হারিয়ে গেছে। কিন্তু যুগের পর যুগ যে শক্তি আদর্শগত লড়াই করে তাদের নিয়ে একশোবার ভাবতে হবে। সিপিআইএম মনে করে মার্ক্সবাদ মানব মুক্তির পথ এবং সেই মতো তারা কাজ করে। আরএসএস মনে করে হিন্দুত্ব হিন্দুদের মুক্তির পথ এবং সেই আদর্শ নিয়ে তারা কাজ করে। জামায়াতে ইসলামী হিন্দ মনে করে ইসলাম মানব মুক্তির পথ এবং এই আদর্শকে তত্ত্বগত ভাবে তুলে ধরতে বিভিন্ন সাহিত্য, ইতিহাস তারা রচনা করেছে ইসলামের আলোকে। এখন প্রশ্ন, আজকের দিনে দেশের কাছে বিপদ কোন শক্তি? আরএসএস? বামফ্রন্ট? জামায়াতে ইসলামী? নাকি বিহারে আরজেডি,জেডিইউ? নাকি বাংলায় তৃণমূল? নাকি কেরলে কংগ্রেস?আবার উলটো দিক দিয়ে দেখলে বিজেপির তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিআইএম, বিএসপি সবাই শত্রু। এই ভিন্নতা নিয়েই ভারতের রাজনীতি। কিন্তু একটি দল প্রকাশ্যে হিংসায় উস্কানি দেবে, ধর্মীয় মেরুকরণ করবে তার পরেও তার সাথে কংগ্রেস, তৃণমূলকে এক করে গুলিয়ে ফেললে হবে কি? কোন দল দলিত,আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে মারছে সেই বোধ থাকা উচিত।একই কথা তৃণমূলের জন্য। সিপিআইএম বা বামেরা কখনও বিজেপির সমতুল্য ভয়ঙ্কর শক্তি এখনও হয়ে ওঠেনি। সুতরাং সংখ্যালঘু দলের হয়ে কথা বলাকে সাম্প্রদায়িক মনে করে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া চরম অন্যায়। সংখ্যালঘু তৃণমূল, সিপিআইএম কখনও সংখ্যাগুরু বিজেপির মতো হতে পারেনা। আর বিদ্যাসাগর শুধু বাঙালির নয়, তিনি ভারতের, সারা পৃথিবীর। সুতরাং সব কিছু ছেড়ে বিদ্যাসাগরকে টার্গেট করে আঘাত করার উদ্দেশ্য বড় ভয়ংকর। এই আগ্রাসী মানসিকতা থেকেই গান্ধীজিকে খুন করেছে। গান্ধীজি একটি প্রতীক মাত্র, আসলে তারা কংগ্রেসকে খুন করতে চেয়েছে, জাতির জনককে মুছে দিতে চেয়েছে। গৌরী লংকেশ একটি নাম মাত্র, আসলে ওরা খুন করতে চেয়েছে বামপন্থী সাংবাদিকদের, প্রতিবাদী লেখকদের। রোহিত ভেমূলা একটা উদাহরণ। আসলে ওরা সমগ্র দলিতদের শেষ করতে চেয়েছে। জুনাইদ একটি ঘটনা।  ওরা খুন করতে চেয়ে এদেশের সংখ্যালঘুদের। নোট বাতিল উদাহরণ মাত্র। আসলে ওরা এদেশের অর্থনীতিকে খতম করতে চেয়েছে। নীরব মোদি প্রতীকী মাত্র, আসলে ওরা এদেশের সম্পদ লুন্ঠন করতে চেয়েছে। ওদের মূল টার্গেট ভারতবর্ষকে শেষ করে দেওয়া, বিভক্ত করে দেওয়া। এখন সময় দেশের সকলে মিলে মানুষকে বাঁচানো। রাজনীতির মাঠের ঝগড়া যেন ফ্যাসিবাদী শক্তিকে জায়গা করে না দেয়। আগে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পরাস্ত করুন তারপর তৃণমূল, সিপিআইএম, কংগ্রেস রাজনীতির তরজা করুন, মানুষ নিজের পছন্দের দল বেছে নেবে। দরকারে সব দল ছেড়ে বিকল্প কিছু ভাববে। ততদিন একটাই কাজ, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম।

(লেখক একজন কবি ও সাংবাদিক। ফেসবুক থেকে নেওয়া)