জানে আলম, টিডিএন বাংলা: কখনো জলপাইগুড়ি, কলকাতা, কখনো ২৪ পরগনা, বাঁকুড়া আবার কখনোবা অন্য কোথাও। সরকারি স্কুলে প্ৰতি বছর শিক্ষার্থী সংকট ক্রমশ দৃশ্যমান। পড়ুয়া সংখ্যা কোথাও ২, কোথাও ৩ কোথাও ৫ আবার কোথাও মেরেকেটে বিশ জন। কোথায় এত নগন্য না হলেও তুলনামূলক হারে কমছে।

রাজ্যের কোন কোন স্কুলে আবার ৩ জন শিশু পড়ুয়ার জন্য আছেন দু’জন শিক্ষক আবার কোন স্কুলে ৫ জন পড়ুয়ার জন্য আছেন ৪ জন শিক্ষক- শিক্ষিকা। কোথায় আবার পড়ুয়ার তুলনায় শিক্ষক নগন্য। রাজ্যব্যাপি এমন উদাহরণ অহরহ। কোথায় পাশাপাশি স্কুল গুলো একত্রিত করে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে আবার কোথাও কোথাও অধিকাংশ দিন শিক্ষার্থীদের গড় হাজির। বা কোন কোন স্কুলে পড়ুয়াদের ভর্তির খাতায় নাম থাকলেও তারা আদতে বেসরকারি স্কুলে পড়ছে। এই সব সরকারী স্কুলে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সময় কাটে শিক্ষকদের। এটা এক ধরনের অপচয়। শিক্ষক দেড় অন্যত্র সরিয়ে স্কুল গুলিতে তালা ঝুলানো ছাড়া কি আর উপায়। ফলে বহু সরকারী স্কুল আজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে।

সরকার পোষিত ও সরকারি স্কুলে মিড ডে মিল, পোশাক, বই খাতা, সাইকেল, বৃত্তি, কন্যাশ্রী নানান অনুদানের সত্ত্বেও ফি বছর কমছে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। সম্প্রতি সর্ব শিক্ষা মিশনের রিপোর্ট অনুসারে গত এক বছরে প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক পড়ুয়াদের সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩০ লক্ষ। সংখ্যাটি নেহাত কম নয়। পরিসংখ্যান বলছে ২০১৭-১৮ শিক্ষা বর্ষে শিক্ষার্থী প্রায় ৪৩,৯৮,৮০৫ যা ২০১৬-১৭ শিক্ষা বর্ষে ছিল ৭০,০৩,৫৪৯। মাধ্যমিকে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমলেও তা নগন্য। এই ভাবে ছাত্রছাত্রী কমতে থাকায় শিক্ষিত মহল উদ্বিগ্ন।

তবে হঠাৎ করে এরমক শিক্ষার্থী কমে যাওয়াকে অনেকে বলছেন গগনায় ভুল হতে পারে। গণনায় যতই ভুল হোক না কেন প্রাথমিকে শিক্ষার্থী দ্রুত গতিতে কমে যাচ্ছে তা অস্বীকার করার কিছু নেই। সরকার নানামুখি উদ্যোগ নেয়ার পরও প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তির হার বাড়ছে না। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশপাশি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। তাতে কোন সন্দেহ নেই। যায় হোক না কেন এই বিপুল সংখ্যক প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকটের এই পরিস্থিতি অনভিপ্রেত। পড়ুয়া বিহীন স্কুল মৃত স্কুল। সরকার না চাইলেও তা নিজে নিজেই অস্তিত্ব হারিয়ে উঠে যাচ্ছে।

সরকারি স্কুল উঠে যাচ্ছে কেন? সরকারি স্কুলে পড়ে কিছু হয় না- এই বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে সমাজে। অভিভাবকদের দোষ নেই, সবাই নিজের ছেলেমেয়ের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে চায়। ছেলেমেয়েদের কাজের মাধ্যমে পড়াতে চায়। একজন হতদরিদ্র গরিব ডে-লেবার হোক সে অশিক্ষিত বা হকার কিংবা রিক্সাচালক। তাদের স্বপ্ন সন্তানকে পড়ানো পাড়ার বা শহরের ভালো বেসরকারী স্কুলে। সামান্য আর্থিক সঙ্গতি থাকলেও পড়াশোনার জন্য তারা বেছে নেন বেসরকারি স্কুল গুলিকে।

এমন হালের কারনে অভিভাবকদের একাংশ মনে করেন, বেসরকারি স্কুলের পরিকাঠামো ভাল। আরও অনেক সুবিধা আছে। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ও হিন্দি ব্যবস্থা আছে। শিক্ষকরাও পড়ুয়াদের প্রতি যত্নশীল। বিপরীতে, সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলির অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

সচেনত শিক্ষিত জনগণ ও সরকার এই বিষয়ে আশু কোন চিন্তা ভাবনা না করলে সরকারি স্কুল গুলো ফি বছর পড়ুয়া কমতেই থাকবে। অচিরেই অধিকাংশ সরকারি বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাবে। তাতে করে বেসরকারি স্কুল গুলো আরও লাগাম ছাড়া হয়ে পড়বে। যা ভবিষ্যত সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে।

এবিষয়ে আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা ও মতামত:

১. পরিকাঠামোগত উন্নয়ন:
বেসরকারি বিদ্যালয় পরিকাঠামো তুলনা মূলক ভালো এবং অনেক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। সেই অনুযায়ী সরকারী স্কুল গুলোর পরিকাঠামো উন্নত করতে হবে। যদিও সর্বশিক্ষার দৌলতে এখন অধিকাংশ স্কুল ঘর যথেষ্ট। তবে অনেক স্কুলে পরিকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল আবার কিছু স্কুলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি যা সম্পদের অপচয়। এই বিষয়ে সুনজর থাকা উচিত। অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান শোচনীয়। কোথাও ঘরবাড়ি কম কোথাও জমি সংকট কোথাও রাস্তা নেই, আলো বাতাস নেই খেলার মাঠ নেই ইত্যাদি। স্কুলগুলির পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ করা জরুরি। স্কুলঘর, শৌচাগার, পানীয় জল, বিদ্যুৎ-সহ জরুরি পরি কাঠামোর উন্নতি না করতে পারলে বেসরকারি স্কুলে ভর্তির প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব নয়।’’

২. ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার প্রতি নজর:
বেসকারী স্কুল গুলি হোক বাংলা মাধ্যম বা ইংরেজি, বাংলা বোর্ড বা সিবিএসসি কিংবা বা আইসিএসসি এদের ইংরেজি শিক্ষা ভালো পাশাপাশি হিন্দি শিক্ষাও। বাম আমলে প্রাইমারিতে ইংরেজি তুলে দেওয়ার কুফল বেসরকারী স্কুলে ভর্তির একটা অন্যতম কারণ। তাছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের বেশিরভাগ পরীক্ষা বাংলায় হয় না। হিন্দিভাষীরা তাদের মাতৃভাষায় সুযোগ পায়, ফলে তারা অনেকটাই এগিয়ে। বাঙালিদের ইংরেজিতে পরীক্ষা দিতে হয়, সেক্ষেত্রে বাংলা মাধ্যমের ছেলেমেয়েরা খানিকটা অসুবিধায় পড়ে, তাই বাধ্য হয়ে ভালো ইংরেজি পড়ায় এমন স্কুলে বা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি হচ্ছে। ইংরেজি কাজের ভাষা। খুব দরকারি। তাই ইংরেজি শিক্ষায় জোর দিতে হবে, নাহলে অনেক জায়গায় পিছিয়ে পড়তে হবে। কিন্তু গ্রাম-বাংলা ও গরীব ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতে সুরক্ষিত করতে কটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুল খোলাই সমাধান নয়। বাংলা ভাষার প্রতি রাজ্য সরকারকে যত্নশীল হতে হবে। এবং ভারতে বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ও হিন্দি শিক্ষায় জোর দিতে হবে। তা না হলে বেসরকারি স্কুলে ভর্তির প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব নয়।

৩. শিক্ষকের অধিকার ও দায়িত্ব:
শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড হলে শিক্ষকরা জাতির মস্তিষ্ক। কিন্তু শিক্ষকরা বড় অসহায় প্রাণী। বর্তমানে শিক্ষকরা যেন শ্রেণী শত্রু। তবে শিক্ষককের কোন দোষ ত্রুটি না থাকলেও তাঁর বড় দোষ হল সে মাস্টারি চাকরি পেয়েছেন। এই অপরাধে সমাজে সে ঈর্ষার পাত্র । মাছওয়ালা, ফলওয়ালা, রিক্সাওয়ালা যেই দেখে সেই একটু ঠকানোর চেষ্টা করে। এঁরা অর্থসচেতন বলে আত্মীয় ও প্রতিবেশীর নজরে কৃপণ। আর টিউশনি ও মিশনের মাস্টারা ভাবেন সরকারী স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষকরা টাকার বিনিময়ে চাকরী পেয়েছেন, তাই তারা বেশি কিছু জানেন না। এই মনোভাব ছাত্রদের সব সময় মিসগাইড করতে থাকে। ফলে সরকারি স্কুল শিক্ষক দের প্রতি পড়ুয়াদের বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়। শিক্ষক দিবসে উপহারে তা টের পাওয়া যায়।

হয়তো অনেক বেশি বলা হয়ে গেল। যাকগে তবে শিক্ষকদের মর্যাদা বাড়াতে হবে। সাধ্যমতো তাদের বাড়ির কাছে নিয়োগ দিতে হবে। আর নিয়মিত সাধারণ ও মিউচুয়াল বদলির স্বচ্ছ ব্যবস্থা রাখতে হবে অথবা ব্লক ভিত্তিক শিক্ষক দের আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে শহর থেকে ডেইলি যাতায়াত করতে না হয়। ফলে তাঁর স্কুলে পড়ুয়াদের সময় দিলে স্কুল ছুট ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি কমবে।

শিক্ষক নিয়োগের ত্রুটির ফলে বিদ্যালয়ের দুই ধরনের শিক্ষক পরিলক্ষিত হয়। কমবেশি হলেও অধিকাংশ স্কুলে শিক্ষকদের ফাঁকিবাজির একটা দল লক্ষ্য করা যায় । যাদের কাজ হল বিদ্যালয়ে সব সময় অস্থির পরিস্হিতি তৈরি করা। যার ফলে হাটে বাজারে শিক্ষকরা বিভিন্ন সময় সমালোচনা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আমি ছাত্রাবস্থায় শিক্ষকদের যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতাম কিন্তু শিক্ষকতায় এসে এই ধরনের শিক্ষকদের আচরণ দেখে তা তলানিতে ঠেকেছে। তাই শিক্ষক নিয়োগের সময় কমিশন যোগ্যতা ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের দিকে নজর না দিলে অযোগ্য শিক্ষকের কারনে সরকারী বিদ্যালয়ে পড়ুয়ার ভর্তি কমবে।

৪. পাসফেল প্রথা চালু:
সরকারি স্কুলে ইংরেজি তুলে দিয়ে বামেরা যেমন পায়ে কুড়াল মেরেছিল । একই ভাবে অষ্ঠম শ্রেণী পর্যন্ত পাসফেল তুলে দেওয়ার ফলে সরকারী স্কুলের শিক্ষার মান তলানিতে উঠেছে। পাসফেল না থাকায় পড়াশোনার চাপ কম। ফলে মনযোগ হারিয়ে পড়ুয়াদের স্কুল বিমুখ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পাশফেল না থাকায় সরকারি স্কুলের শিক্ষার মান খারাপ ভেবে সচেতন অভিভাবকরা তাদের সন্তান কে সরকারি স্কুলে রাখতে আগ্রহী নয়। পাশ ফেল নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুন না তা রাখাই শ্রেয়। পাশাপাশি ইংরেজি ভাষার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। এবং সংস্কৃত ও আরবির মত ষষ্ঠ-অষ্ঠম ক্লাস পর্যন্ত হিন্দিকে চতুর্থ ভাষা হিসাবে শেখালে মনে হয় সরকারী স্কুলের প্রতি সকলের আগ্রহ বাড়বে।

৫. স্কুল ও সরকারি সচেতনতা বৃদ্ধি:
সরকারি স্কুলে ছাত্র ধরে রাখতে গেলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করা দরকার। মি-ডে-মিল, বই খাতা , জুতো সাইকেল, কন্যাশ্রী ও অন্যান্য বৃত্তি পরিষেবা দানে যত্নশীল হতে হবে। বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দিতে হবে। খেলাধুলো, শিক্ষা মূলক ভ্রমণ, ও অন্যান্য বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি স্কুল গুলোর আধুনিকীকরণ ডিজিটাল যুগে বিদ্যালয় গুলিতে স্মার্ট ক্লাস, অনলাইন ল্যাব পরিষেবা তৈরী করা। আউট ডোর ফিটনেস এর জন্য স্কুলে দোলনা, স্লিপার, সি-সো, সাইকেলিং, রক ক্লাইমিং ইত্যাদি বসাতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত পর্যাপ্ত শৌচালয়, বাতাস ও আলোযুক্ত শ্রেণীকক্ষ এবং শ্রেণীকক্ষে বিজ্ঞান কীটের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি, সরকারি স্কুল গুলোয় পরিকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে সাথে দরকার পর্যাপ্ত শিক্ষক।

লেখক:
প্রধান শিক্ষক
নূর-জাহানারা স্মৃতি হাই মাদ্রাসা
ফারাক্কা, মুর্শিদাবাদ