ছবি: গুগল
শরদিন্দু উদ্দীপন- নিজস্ব ছবি

শরদিন্দু উদ্দীপন,টিডিএন বাংলা: সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মহিষাসুরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ভারতের ভূমিসন্তানেরা দাবী করছেন যে বিদেশী আর্যরা পরাজিত মূলভারতীয় রাজাদের যে ভাবে অশুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করছেন তা দেশের ৮৫% ভূমিসন্তানদের কাছে চরম অপমান। ধর্মের নামে একদল মানুষকে শুভ এবং আর একদল মানুষকে অশুভ বলে দাগিয়ে দিয়ে যে ভেদাভেদের বীজ বপন করা হচ্ছে তা প্রগতিশীল ভারত গঠনের পথে দুর্লঙ্ঘ বাঁধা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে এই ভাবে ঘৃণিত করে দূরে সরিয়ে রাখলে কোন দেশেরই মঙ্গল হতে পারে না। বরং এতে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। ক্রমে এই অসন্তোষ দানা বেঁধে বিদ্রোহের আকার ধারণ করে। মানুষ প্রবল বেগে তার আত্তপরিচয়, আত্তগৌরব এবং নিজস্ব সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটানোর জন্য আন্দোলন শুরু করে। মহিষাসুর স্মরণ সভা এরকমই এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন যা মূলভারতীয় বঞ্চিত বহুজনের মৌলিক অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত।

মূলত দুর্গা-মহিষাসুরের কাহিনীকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া হয়েছে এই অসুর এবং দেবতাদের মধ্যে লড়াইয়ের এক চিরন্তন কাহিনী। বাংলায় অসুরদের পরাজয় কাহিনীর মধ্যে ছড়িয়ে আছে ৯০% অসুরভাষী বাঙালীর পরাজয় এবং ৬% ব্রাহ্মন্যবাদীদের বিজয় বার্তা। এই ৬% ব্রাহ্মন্যবাদী মানুষের মধ্যে মাত্র ২% ব্রাহ্মণ। এদের স্বার্থেই বঙ্গবাসীকে অশুভ অসুর নামে অবিহিত করা হয়েছে। আর অসুরের এই অবমূল্যায়নই গড়ে দিয়েছে প্রবল আন্দোলনের ভিত।

একালের গবেষকেরা নানা তথ্য তুলে ধরে ঐতিহাসিক নিদর্শনের ভিত্তিতে দাবী করেছেন যে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালে বৈদিক যুগের আগে, ক্যাটালহক, ইজিপ্ট, সুমের, মেসোপটেমিয়া, আসিরিয়া, ব্যাবিলন, মেহেরগড়, হরপ্পা, মহেঞ্জোদড়ো, লোথাল, ধলাভিরা, কালিবঙ্গান এবং গঙ্গারিডি পর্যন্ত যে সুমহান সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা অসুর সভ্যতা নামে পরিচিত। অসুর শব্দের অর্থ প্রজ্ঞাবান। অসুর শব্দের অর্থ শক্তিশালী, বিত্তশাল এবং ন্যায়পরায়ণ। জেন্দাবেস্তা অনুসারে এই অসুরের বিপরীত শব্দ হল “দেবাস”। জেন্দাবেস্তার বিভিন্ন জায়গায় বর্ণিত আছে এই দেবাসরা হল বর্বর, চরিত্রহীন, লম্পট, ধর্ষণকারী এবং লুন্ঠনকারী।

অন্যদিকে আহুর মাজদা অনুসরণকারী অসুরেরা ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, প্রজাপালক এবং প্রজ্ঞাবান। ধর্মনীতি অনুসারে অসুরেরা যে সমস্ত নীতি পালন করতেন তা হলঃ
১) অসুরেরা নারীর সঙ্গে যুদ্ধ করতেন না।
২) প্রধান মহিষী থাকা কালীন দ্বিতীয় বিবাহ করতেন না।
৩) বেশ্যাগমন ছিল অসুর নীতির পরিপন্থী।
৪) অসুর রাজারা সুরাপান করা থেকে বিরত থাকতেন।
৫) অসুর রাজারা মক্তহস্তে দান করতেন এবং কপর্দক শূন্য হয়ে আবার রাজকার্যে ফিরে আসতেন।
৬) স্মরণাগত যা চাইতেন অসুরেরা তাই দান করতেন।
৭ ) বালকের সাথে যুদ্ধ করতেন না অসুরেরা।
৮) অসুরেরা সন্ধ্যার পরে শস্ত্র ধারণ করতেন না।
বলা বাহুল্য যে অসুরদের এই ন্যায় নীতির মধ্যেই তাদের দুর্বলতার হদিস পেয়ে যায় দেবতারা। অসুরদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ না করে তারা কপট আশ্রয় নিয়ে নারী, বালক এবং স্মরণাগতের ছদ্মবেশে অসুর রাজাদের হত্যা করে এবং অসুরদের রাজ্য দখল করে নেয়।

দেবীদুর্গাকে দিয়ে মহিষাসুরকে হত্যা করা এমনি ষড়যন্ত্রের কাহিনী। সাঁওতালী ভাষায় “বঙ্গা” শব্দের অর্থ পবিত্র সত্তা। যে দেশে মাটি উর্বর, জল, বাতাস, আলো এবং সুনীল আকাশ বিরাজমান সে দেশ “বঙ্গা দিশম”। বঙ্গা দিশমের ভাষা অসুর ভাষা। বর্তমানে সাঁওতাল, কোল-মুন্ডা, শবর, অসুর প্রভৃতি ৪০টি জনজাতি, চন্ডাল, পৌণ্ড্র, বাগদী, ডোম, ভূমিজ, রাজবংশী প্রভৃতি ৬০টি জাতি এবং ১৪২টি ওবিসি জাতি সকলেই এই অসুরভাষী মানুষ। এদেরই আদিপুরুষ এই বঙ্গাসুর। যিনি সাঁওতাল সমাজে হুদুড় দুর্গা বা মহিষাসুর নামে পরিচিত। যে রাজাকে দেবী নামে এক ছলনাময়ী নারী অন্যায় ভাবে হত্যা করেছিলেন। যিনি এখন দেবীদুর্গা নামে পূজিত হন। সাঁওতালেরা এই সময় দাসায় বা অশৌচ পালন করেন। ভুয়াং নাচের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে তাদের হারিয়ে যাওয়া রাজাকে খুঁজে বেড়ান।

পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার চাবাগান অঞ্চলে বসবাস করেন প্রায় ৪হাজার অসুর জাতির মানুষ। এই মানুষেরা বঙ্গাসুর বা মহিষাসুরকে তাদের পূর্বপুরুষ মনে করেন। তারাও মনে করেন যে বর্তমানে যে দুর্গা ব্রাহ্মণ দ্বারা পূজিত হন তিনি অন্যায় ভাবে তাদের রাজাকে হত্যা করেছিলেন। তারা দেবী দুর্গার মুখ দর্শন করেন না।

২০১১ সালের ২৪শে অক্টোবর জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অল ইন্ডিয়া ব্যাকওয়ার্ড স্টুডেন্ট ফোরাম এবং র্যা ডিক্যাল ছাত্রছাত্রীরা পালন করেন “মহিষাসুর স্মরণ সভা”। এই স্মরণ সভায় স্থাপন করা হয় বোঙ্গা দিশমের রাজা মহিষাসুরকে। মাথার পাগড়িতে ময়ূরের পালক, হাতে ছড়ি এবং বরাভয়মুক্ত মূদ্রায় মহিষাসুরের এই প্রতিকৃতিটি অংকন করেন চিত্রকর লাল রত্নাকর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের গবেষকেরা ৪০টি হোর্ডিং সাজিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। মহিষাসুর স্মরণ সভাকে কেন্দ্র করে এই প্রদর্শনীই ভারতের ভূমিসন্তানদের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভীত গড়ে দেয়। আম্বেদকরবাদী ছাত্র সংগঠনগুলির সাথে সাথে বহু বামসেফ কর্মী এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হতে শুরু করেন। বামসেফ প্রশিক্ষণ শিবিরগুলিতে “মহিষাসুর ” হয়ে ওঠে একটি আলোচ্য বিষয়। বহু বামসেফ কর্মী “মহিষাসুর স্মরণ সভা” আয়োজনের মাধ্যমে বহুজন সমাজকে সংঘবদ্ধ করে তোলেন। বহুজনের লোক সংস্কৃতি, নাচ, গান, আলচনা, সেমিনারের মধ্য দিয়ে “হুদুড় দুর্গা বা মহিষাসুর স্মরণ সভা” একটি উৎসবের আকার ধারণ করে।

এই বছর ৭ই অক্টোবর থেকে সারা দেশে “অসুর স্মরণ সভা” পালন করা শুরু হয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত আদিবাসী গ্রামে পালিত হচ্ছে দাসাই। সংবিধান বাঁচাও সমিতি এবং মহিষাসুর স্মরণ সভা সমিতির যৌথ উদ্যোগে স্থাপন করা হয়েছে “অসুর খুন্টা”। একটি লম্বা বাঁশের আগায় উত্তোলন করা হয়েছে বহুজনের নীল ছাতা। এই উৎসব কোন ধর্ম বা উৎসবের প্রতিক্রান্তি আন্দোলন নয় বরং ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের প্রয়াস। সমস্ত জীব জগতের সহাবস্থান এবং মঙ্গল কামনাই “অসুর স্মরণ সভার” মূল অভিধা।

(লেখক,মহিষাসুর স্মরণ সভা সমিতির আহ্বায়ক ও এসসি এসটি ওবিসি সংগ্রামী মঞ্চের সম্পাদক)