টিডিএন বাংলা ডেস্ক: দেশের মুসলিমদেরকে বারংবার টার্গেট করা হচ্ছে। দক্ষিণপন্থী উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা দেশের প্রতি মুসলিমরা কতটা আনুগত্যশীল তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে চলেছে, তাদেরকে দেশবিরোধী দেখানোর চেষ্টা করে চলেছে। একটা সন্দেহের বাতাবরণ তৈরী করা হচ্ছে।

অথচ আসল সত্য হলো এই যে, দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সময়কে মুসলিমদের  অবদানকে উপেক্ষা করে ভাবাই যায় না।
সে সময় স্বাধীনতার প্রতীক্ষায় উন্মুখ
দেশবাসীর ভাবনাকে তুলে ধরতে মুসলিমরা  উর্দু ভাষাকে ব্যবহার করে।

প্রতিবাদ, মিটিং-মিছিলগুলিকে আরো প্রানবন্ত করতে, মানুষকে বিপ্লবী প্রেরণায় উজ্জীবিত করার জন্য বিভিন্ন গান ও স্লোগান রচনা করেন তাঁরা।

সেই সব গান,কবিতা, স্লোগানের কিছু কিছু তো কালজয়ী, আজো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে রচিত হলেও আশ্চর্যভাবে আজকের দিনেও সেগুলো আমাদের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

ব্রিটিশ আধিপত্যবাদকে সমূলে উৎপাটন করার ডাক দিয়েছিলেন রাম প্রাসাদ বিসমিল। তাঁরই লেখা ‘সারফারশি কি তামান্না’। তাঁর নামের সঙ্গে জীবনেরও এক অদ্ভুত মিল ছিল। বিসমিল কথার অর্থ হল  আঘাতপ্রাপ্ত, আহত।

‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ অর্থাৎ ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’। ভারতীয় মাত্রই এই স্লোগানের সঙ্গে পরিচিত।  ভগত সিং প্রথম এই স্লোগানকে বিপ্লবের ময়দানে ব্যবহার করেন। এই স্লোগানটি কবি ও স্বাধীনতা যোদ্ধা হসরত মোহানির কলমের ফসল।

‘জয় হিন্দ’ যা কিনা ‘ জয় হিন্দুস্থান’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এই স্লোগানের স্রষ্টা হলেন আবিদ হাসান সফরানি। তিনি ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মী’র একজন প্রথম সারির যোদ্ধা ছিলেন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন।

‘লিজেন্ডডোটস অফ হায়দ্রাবাদ’ নামক বইটি তে নরেন্দ্র লুথার বলেন যে ‘জয় হিন্দ’ ভারতীয় সৈন্য দেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আর সেজন্যই অনেকে মনে করেন যে এই স্লোগানের উদ্ভাবক হলেন সুভাষ চন্দ্র বসু।

২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও নাগরিক অধিকার কর্মী প্রশান্ত ভূষণ এক টুইট মারফত তথাকথিত দেহপ্রেমীদেরকে তুলোধনা করেন। তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিমদের ভূমিকা নিয়ে বলেন,

” স্বাধীনতা সংগ্রামের বেশিরভাগই বিপ্লবী স্লোগান এবং গানের আবির্ভাব মুসলিমদের হাত ধরেই। হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা স্বাধীনতার জন্য লড়াইও করেনি!”

হিন্দুত্ববাদীরা যদিও তাঁকে ট্রোল করে এই বলে যে, তিনি নাকি ধর্ম এবং দেশপ্রেমকে গুলিয়ে ফেলেছেন।

এবছর আমাদের প্রাণ প্ৰিয় মাতৃভূমির ৭২ তম প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন হবে। সেই বাহানায় চলুন একবার দেখে নেওয়া যাক দেশাত্মবোধক গানের আঙিনায় এযাবত কাল  মুসলিমরা কতটুকু অবদান রাখতে পেরেছে।

যদিও সে তালিকা সহজে ফুরাবার নয়। তবে এখানে সব থেকে জনপ্রিয় গান গুলির কথাই চর্চা করা হবে।

১) ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’। গানটি লিখেছিলেন আল্লামা ইকবাল। উর্দূ লফজে লেখা এই কবিতাটি অনেক ভাবে গাওয়া হয়েছে। নানা সময়ে, নানা শিল্পী, নানাভাবে এই কবিতাটিতে কন্ঠ ও সুর দিয়েছেন। আশা ভোঁসলে ও মহম্মদ রফি জুটি যৌথভাবে ১৯৬১ সালে ধর্মপুত্র চলচ্চিত্রের জন্য এটি গেয়েছিলেন।

২) ‘বাতান কি রাহ ম্যে বাতান কি নওজওয়ান শহীদ হো’ গানটি ১৯৪৮ সালে দিলীপ কুমার অভিনীত ‘শহীদ’ সিনেমায় গাওয়া হয়। কামার জালালাবাদী গানটি রচনা করেন। মহম্মদ রফির কণ্ঠ ও গোলাম হায়দারের সুর  দেওয়া গানটি আত্মপ্রকাশের ৬৪ বছর পরও বহুল জনপ্রিয়।

৩) ‘নয়া দৌর ফিল্মের “এ দেশ হে বীর জওয়ানো কা” । গীতিকার সাহির লুধিয়ানভিস এর লেখা এবং গানটি গেয়ে ছিলেন মহম্মদ রফি ।

৪) ‘দেশ ক্যা পেয়ারা’। গানটি মাসুম (১৯৬০) ফিল্মের একটি গান। ফিল্মটি যদিও তেমন প্রচার পায়নি। মেহেদী আলী খানের লেখা গানটি শিশু-কিশোরদের কাছে খুবি প্ৰিয়।

৫) ‘ইনসান কি ডগার পে’ ।
গঙ্গা যমুনা (১৯৬১) ফিল্মের একটি গান। ষাটের দশকের এই অনন্য গানটির রচয়িতা শাকিল বাদায়ুন। কন্ঠ ও সুর দিয়েছিলেন নওশাদ।

৬) ‘নান্না মুন্না রাহী হুঁ’ । মেহবুবের সান অফ ইন্ডিয়া’ ফিল্মের একটি গান। এ গানটিও নওশাদ ও শাকিলের মিলিত প্রচেষ্টায় অনন্য মাত্রা পায়।

৭) ‘আব তুমহারে হাওয়ালে বাতান সাথীও’। জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী মুভি হাকিকত (১৯৬৪) এ গানটির আত্মপ্রকাশ  হয়। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে সিনেমার পর্দায় সুন্দর ভাবে চিত্রিত করা হয় গানটিতে। কৈফি আজমীর লেখা গানটিতে কণ্ঠ দেন মহম্মদ রফি।

৮) লিডার মুভির অংশ ‘আপনি আজাদী কো হাম’। হৃদয়কাড়া এই গানটি শাকিল, রফি ও নওশাদ তিনজনের মিলিত উদ্যোগে আত্মপ্রকাশ ঘটে। গানটি রচনা করেন শাকিল বাদায়ুন। ছন্দ ও সুরে নওশাদ এবং কন্ঠ দেন মহম্মদ রফি।

সাম্প্রতিকালের কিছু ছবির গানের কোথাও উল্লেখ করা যেতে পারে।

যেমন,

৯) ‘সন্দেশে আতে হ্যায়’। বর্ডার (১৯৯৭) ছবির গান। জাভেদ আখতারের লেখা গানটিতে সুর দেন অনু মালিক।

১০) ‘মা তুঝে সালাম’ (১৯৯৭) ।মেহবুবের লেখা ‘বন্দে মাতরম’ স্টুডিও এলবামের এই গানটিতে সুর ও কন্ঠ দেন এ আর রহমান। আধুনিক সময়ে এটি খুবি আলোড়ন সৃষ্টিকারি একটি দেশাত্মবোধক গান ।

বিশ্বের সব থেকে অধিক  ভাষায় গাওয়া হয় গানটি। সে কারনে দুইবার গিনিস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড স্পর্শ করার গৌরব অর্জন করে গানটি। শ্রোতাদের কাছে দারুণ সাড়া পায় গানটি। এলবামটি প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই ৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়।
১৯৯৭ সালেই কেবল ভারতের মাটিতেই গানের এলবামটির ১৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়।
আজও অব্দি বিশ্বের বাজারে ফিল্মের বাইরে এটিই সব থেকে বড়ো ভারতীয় এলবাম।

১১) ‘জিন্দেগী মউত না বান যায়ে’। গানটির আবির্ভাব সারফরোশ (১৯৯৯)  ছবিতে। আমির খান অভিনিত ছবির এই গানটি লিখেছিলেন ইসরার আনসারী। গানটি সমালোচক মহলে ভূয়সী প্রশংসা পায়।

১২) ‘ইয়ে জো দেশ হে তেরা’। শাহরুখ খান অভিনীত স্বদেশ ছবির একটি গান। জাভেদ আখতারের লেখা গানটিতে সুর দেন এ আর রহমান।

১৩) ‘সারফারসী কি তামান্না’। এই
বিপ্লবী গানটি শহীদ (১৯৬৫) ছবিতে নব-আঙ্গিকে প্রকাশ করেন রফি, দে এবং রাজেন্দ্র মেহতা।

এ আর রহমান লিজেন্ড অফ ভগত সিং এ গানটিতে সুর দেন। এরপর আমির খানের ‘ রং দে বসন্তি’ সিনেমাতে কাল্ট ক্লাসিকটি আবার গাওয়া হয়। গানে কথা দেন আঞ্জুম রাজবাবলি।

১৪) ‘চাক দে ইন্ডিয়া’ ছবির টাইটেল সং টি
ক্রিড়া জগতের জাতীয় সংগীত বলা চলে। এটি লেখেন জয়দীপ সাহানী। সুর দেন সালিম সুলায়মান। গানটিতে কণ্ঠ দেন সুখবিন্দর সিং।

১৫) রং দে বাসন্তি ছবির ‘রং দে বাসন্তি’ গানটি আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে খুবই প্রাসঙ্গিক একটি গান। এটিতে সুর দেন এ আর রহমান।

টিডিএন বাংলায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি ইংরেজী পত্রিকা ‘দ্যা  সিয়াসত ডেইলি’ থেকে অনূদিত।