তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা: কালের যাত্রার ধ্বনি শুনে সময় গড়িয়েছে। এখনও রবীন্দ্র কাব্যে-সাহিত্যে নারী মুক্তির ঠিকানা। নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী- আজকের নারীর দৃপ্ত ঘোষণা। তাই ২৫ বৈশাখের শুভক্ষণে বারেবারে নারীরা তাঁর মুক্তির ঠিকানা খোঁজে রবীন্দ্র-সাহিত্যের গভীরে।

উনিশ শতকে নারীর অধিকার যখন অনেকটাই অকল্পনীয়, তখন রবীন্দ্রনাথ নারীকে তুলে এনেছেন তাঁর লেখনীর কেন্দ্রীয় চরিত্রে। নারীকে উপস্থাপন করেছেন, স্বাধীনচেতা, সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ও সাহসী হিসেবে। বারেবারে তাঁরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন `সিস্টেমে’র বিরুদ্ধে।

রবীন্দ্রচেতনায় নারীকে গৃহলক্ষ্মীর সম্মানে অধিষ্ঠিত দেখার চেয়ে পুরুষের হৃদয়েশ্বরীরূপে দেখার প্রবণতা বেশি। যেমন `মুক্তি’ কবিতায় বিদ্রোহিনীরকণ্ঠে সংসারের একঘেয়েপিনার বিরুদ্ধে শোনা যায়-

“এক টানা এক ক্লান্ত সুরে,

বাইশ বছর রয়েছি,

সেই এক চাকাতেই বাঁধা

পাকের ঘোরে আধা।‘’

রবীন্দ্রনাথ নারীকে এঁকেছেন শব্দ তুলির হরেক আঁচড়ে। কখনও সেই নারী সুখে বহুবর্ণা উজ্জ্বল, কখনও দুঃখে সাদাকালো-মলিন, কখনওবা ধূসর জীর্ণ। তবে যাই হোক না কেন, সবটুকুই তারই আবিষ্কার। সেই আবিষ্কার রবীন্দ্রমনের, রবির কিরণের ঝলকানিতে। তিনি তো বলেছেনই-

‘’আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে

তোমারে করেছি রচনা

তুমি আমারই,

তুমি আমারই

মম জীবন-মরণ বিহারী।‘’

নারীকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। তাঁর লেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারীর প্রতিবাদী রূপ তুলে এনেছেন। যেমন –

`নিষ্কৃতি’ কবিতায় “খবর পেলেন চিঠি পড়ে, পুলিন তাঁকে বিয়ে করে

গেছে দোঁহে ফরাক্কাবাদ চলে,

সেইখানেতে ঘর পাতবে বলে।

আগুন হয়ে বাপ

বারে বারে দিলেন অভিশাপ।‘’

অর্থাৎ এখানে মঞ্জুলিকা বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন পরিবারের মধ্যে থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

রবীন্দ্র সাহিত্যে আমরা বেশ ক’জন নারীকে পাই যাঁরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে আধুনিকতার প্রতীক হয়ে আলো জ্বালিয়েছেন। `স্ত্রীর পত্রে’ মৃণাল চরিত্রে এঁকেছেন নারীর সামাজিক স্বাধীনতার কথা। যেমনটা এনেছেন, ছোটগল্প `সমাপ্তি’র মৃন্ময়ী, `ল্যাবরেটরি’র সোহিনী অথবা `শাস্তি’ উপন্যাসের চন্দরা চরিত্রের মাধ্যমে।

আর শেষের কবিতায় লাবণ্য এসেছে তৎকালীন প্রেক্ষাপটে সমাজে নারী বন্দীর গতানুগতিক প্রথা ভাঙা আধুনিক ভূমিকায়, যাকে আমরা দেখেছি মুক্ত, স্বাধীন এবং আত্মনির্ভরশীল নারী হিসেবে। প্রেমের পাশাপাশি লাবণ্যের এই পরিচয়টাই ছিল উপন্যাসের সম্পদ। অমিতের কথায়, বন্যা- তুমি অনন্যা। এভাবেই রবীন্দ্র সাহিত্যের সব নারীই মুক্তির মশাল জ্বেলে উদ্ভাসিত হয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের এই নারী ভাবনা আরও দৃপ্ত হয়ে ওঠে ‘রক্ত করবী’র নন্দিনীর ধানী রঙের আঁচলের ছায়ায় আচ্ছন্ন সমগ্র নাটক তথা তাঁর সমস্ত চরিত্র। নন্দিনীর মায়া ভরা চোখর দিকে তাকিয়েই বিশু গেয়ে উঠতে পারে, ‘‘ভালোবাসি, ভালোবাসি/ এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি।‘’ নারী এখানে প্রাণ এবং ভালোবাসার প্রতীক, যে যন্ত্রের বিরুদ্ধে মানবতাকে বিজেতা ঘোষণা করে।