দাঙ্গার বীভৎস রূপ দেখেছি  গুজরাটে,আসামে,মুজাফফর নগরে। ক্ষুধা, একটি তুলসী গাছের কাহিনী, ফ্যান, নবান্ন, ছেঁড়াতার পড়তে পড়তে একুশ শতকে এসেছি। ২০০২ সালে দাঙ্গা নিয়ে মহাশ্বেতা, জয়দের লেখা পড়েছি। সত্যি বলতে নতুন প্রজন্ম এতদিন বাংলায় খুব বড়ো দাঙ্গা দেখেনি। ৪৬ সালের আগুনের উত্তাপ আজও আছে বলেই বাঙালি দাঙ্গার রাজনৈতিক বারুদে বরাবর জল ঢেলে দিয়েছে। কিন্তু বেশ কিছুদিন থেকে বাংলার রাজনীতি যেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে ভয়ঙ্কর হায়েনারা খুব খুশি। সাম্প্রদায়িক শক্তি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের বাংলায়। আমরা সব দেখেও নীরব! কিছু সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা বলছে, “বাংলাটা পাকিস্তান হয়ে গেল।” আর কিছু সাম্প্রদায়িক মুসলিমরা বলছে, “ভারতটা হিন্দুদের হয়ে গেল।”
দুটি জাতির মধ্যে সামান্য দ্বন্দ্ব হলেই একে ওপরে দাঙ্গার পরিসংখ্যান দেয়। এতে আরও উত্তেজনা বাড়ে। বাড়ি গুলি শ্মশান হয়ে যায়। একটার পর একটা স্বপ্ন দাঙ্গার আগুনে পুড়ে ছাই হয় যায়। কবিদের বাংলা, ইতিহাসের বাংলা কেন নৈহাটি দেখবে ? আজও কেন ধুলাগড় হবে ? গোটা রাজ্যের এই করুন অবস্থা দেখার জন্যই কি আমরা জন্ম নিয়েছি ? কেন বুদ্ধিজীবীরা নীরব ? একটা গুজরাট, একটা মুজাফফর নগর হলে তবেই পথে নামবেন ? আপনাদের নীরবতা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উৎসাহ যোগাচ্ছে। কেন আজ আওয়াজ উঠছেনা, ‘দাঙ্গা করতে এলে মাথা ভেঙ্গে দেব।’
কেন বাংলার নবীন প্রজন্মের হিন্দু মুসলিম বন্ধুরা কাঁধে কাঁধ মিলে সাম্প্রদায়িক ইতিহাস, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে ব্যারিকেড গড়ছেনা ? আজ মসজিদের ইমাম আর মন্দিরের পুরোহিতদের এক সাথে পায়ে পা মিলিয়ে পথে নামতে হবে। সব কিছুকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে চালালে ঠিক হবেনা। এই ছোট ছোট ঘটনা এক সময় বড়ো হয়ে দেখা দেবে। আগুন ছোট জায়গায় লেগেছে বলে অবহেলা করা উচিত নয়। পৃথিবীর নিকৃষ্ট এই জাতি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করতেই হবে। এই কাজের জন্য সৎ পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের বলিষ্ট ভূমিকা নিতে হবে। সাম্প্রদায়িক আলোচনা,কথাবার্তা ও কার্যকলাপ হলেই ব্যবস্থা নিন। কটা হিন্দু বাড়ি ভাঙলো,কটা মুসলিম ঘর পুড়লো এই সব তথ্য দিয়ে লাভ নেই। আগামীতে আর একটিও ধুলাগড়, নৈহাটি, হাজিনগর হওয়া দূরের কথা,দাঙ্গার শেকড় সহ উপড়ে ফেলুন। মনে রাখবেন,এক শ্রেণীর রাজনৈতিক লোক হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্বকে জিইয়ে রেখে নিজেদের গদিটাকে শক্ত করতে চায়। সাম্প্রদায়িক হিংসা হলে সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় গরিব অসহায় খেটে খাওয়া মানুষ। রাজনৈতিক শকুনেরা তখন বলে,”আমরা বলেছিলাম না এটা হবে? তাই আমাদের ভোট দাও-সব ঠিক হয়ে যাবে।”  এই জড়তা, এই অসহাতা আমরা কেন মানবো? পৃথিবীর ইতিহাসে এটা লজ্জার যে আজও আমরা মানুষের রক্তের ওপর ক্ষমতার স্বপ্ন দেখি।
তবে হ্যাঁ, আজও ভালো মানুষ আছেন। তাঁদের নীরবতা ভেঙে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতেই হবে। না হলে সম্প্রীতির এই পাহাড় সম কবিতা কী হবে? কাগজে কাগজে একদিন কবিতারা এই মিথ্যাচার আর অরাজকতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাবে। তাই আগামী সকালের সূর্য ওঠার আগে শফত নিতে হবে-হিন্দু মুসলিম শিখ খ্রিস্টান সকলে মিলে নতুন গান কবিতা নিয়ে ওই নৈহাটি-ধুলাগড়-হাজিনগরে এক হাঁড়িতে শীতের এই সকালে পিকনিক খাবো। সেই পিকনিক স্পটে ভঙ্গুর সমাজের ঐক্যের জন্য আকাশের তারারা সাক্ষী হয়ে থাকবে।

Advertisement
mamunschool