গোলাম রশিদ

জার্নাল ‘ইজম’ : নবি সালেহ। ইসরাইল অধিকৃত ওয়েস্ট ব্যাংকের একটি ছোট্ট গ্রাম। অধিবাসী ৭০০। তারই মাঝে একটি বছর এগারোর মেয়ে, অকুতোভয়, সাহসী। জান্না জিহাদ আইয়াদ। নবি সালেহ আ. ও  গোত্র সামুদের কথা মনে করিয়ে দেয় এই গ্রাম। আর জান্না জিহাদ তার নতুন যোদ্ধা।সে ঢাল,তলোয়ার কিংবা কালাশনিকভ নিয়ে যুদ্ধ করে না। তার অস্ত্রের নাম ক্যামেরা।

জান্নার জন্মের সময়টা ছিল প্রচণ্ড অগ্নিগর্ভ। উত্তাল ফিলিস্তিন। আর হানাদার ইসরাইলি বাহিনী। আগুনের গোলার মধ্যে বড় হয়েছে সে। দেখেছে কাকা ও কাকাতো ভাইয়ের মৃত্যু।প্রশ্ন জেগেছে ছোট্ট মনে,এ ভাবেই কি আমরা বিতাড়িত হতে থাকব নিজেদের বাড়িঘর থেকে,নিজেদের প্রিয় খেলার জায়গা থেকে,বিকেলবেলায় বেড়ানোর জায়গা থেকে? ইসরাইলি সেনার বন্দুকের নলের সামনে আমরা কি এ ভাবেই পিছু হটতে থাকব?  অতএব হোক প্রতিবাদ।  মায়ের মোবাইল ফোনের ক্যামেরা থেকে শুরু অত্যাচারের ভিডিয়ো আর সঙ্গে তার বর্ণনা। সি এন এন, ফক্স যা দেখায় না,তা জান্নার ক্যামেরায় জানল বিশ্ব। ইসরাইলি অত্যাচারের লাইভ বিবরণ।

জান্না একটি উদাহরণ মাত্র। এমন বহু সাংবাদিক বিশ্বজুড়ে রয়েছেন,যাদের ক্যামেরা, কলম মুখোস খুলে দেয় ভণ্ডদের। সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যকামী,ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠির তাক করা বন্দুকের সামনে যারা দাঁড়িয়ে যায় বুক চিতিয়ে,তুলে আনে খবরের ভেতরের খবর।অনুসন্ধান, অন্তর্তদন্তে পেঁয়াজের মতো খুলে যায় ষড়যন্ত্রের গভীর ফাঁস। জার্নালিজম তাদের কাছে শুধু পেশা হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে একটি ‘ইজম’ বা আদর্শিক মতবাদ।

দাঁড়িয়ে আছো তুমি.. : গৌরি লঙ্কেশ, শান্তনু ভৌমিকরা এই পথেরই অনুসারী।  তাঁরা নিজেদের জীবন দিয়ে এই কাজ করে গেছেন,সত্যের সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন।কিন্তু কী এর প্রতিদান? সমীক্ষা বলছে, যারা মরে তাদের আর বিচার করা হয় না। তারা সাংবাদিক, কেউকেটা নয়।অতএব ছেড়ে দেওয়া হোক।ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর রিপোর্ট (২০১৫) অনুযায়ী  দুই বছরে ১৪২ জন সাংবাদিক আক্রমণের মধ্যে মাত্র ৭৩ জনকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। এমনকি গৌরি লঙ্কেশ, শান্তনুর খুনেরও কিনারা হয়নি।সাংবাদিকরা এখানে অনেকটা তৃতীয় শ্রেণির তুচ্ছ নাগরিকদের মতো, যাদের জন্য বিচারব্যবস্থার সময় ও মনোযোগ খুবই কম।

গত ২৪ বছরে এ দেশে যে ৭০ জন সাংবাদিক মারা গেছেন তাদের মধ্যে ৪০ জনই সৎ সাংবাদিকতা, রাজনীতি, দুর্নীতি ইত্যাদি নিয়ে রিপোর্ট করার জন্য প্রতিপক্ষের বিষনজরে পড়েছেন। সম্প্রতি জয় শাহের দুর্নীতির ক্ষেত্রেও এই বিষয়টা স্পষ্ট দেখা গেছে। ‘দ্য ওয়্যার ‘ অনলাইন নিউজ সাইটটির ক্ষেত্রে আহমেদাবাদ হাই কোর্টের  রায় জয় শাহের খবর ছাপার ব্যাপারে মানহানির অভিযোগ তুলেছে। ভারতের এই ট্রাডিশন সমানে চলছে। আর যদি লোকাল কোনো পেপারের আঞ্চলিক ভাষার সাংবাদিক হয়, তা হলে তো মোমবাতি মিছিলও জোটে না। অথচ তারাই বেশি আক্রমণের শিকার হয়। তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য থ্রেট দেওয়া হয়। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি  যদি এর বিপক্ষে থাকে তা হলে পুলিশ কেস নিতেই চায় না। আর এরই ফলস্বরূপ গত দশ বছরে কোনো খুনের কিনারা হয়নি এই দেশে।

২০০৮-এ  বিখ্যাত চিত্র পরিচালক ক্যাথরিন বিগেলো ইরাক যুদ্ধের পটভূমিতে ‘দ্য হার্ট লকার ‘ নামে একটি সিনেমা বানান। এখানে সাধারণ মানুষ নয়, লাইমলাইট ফেলা হয় সেইসব ভিক্টিমদের উপর যারা জীবন হাতে নিয়ে এই যুদ্ধ করে চলেছে। তাদের পরিবার আছে, আছে সংসার,ছোট্ট শিশু।অথচ শান্তি রক্ষার দোহাই দিয়ে তাদের যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। ঠিক তেমনই  বহু সাংবাদিক মধ্যপ্রাচ্য, মিন্দানাও,মালিতে কাজ করে চলেছেন। তাদেরও জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। অথচ তাদের পাঠানো খবরই আমরা ড্রইং রুমে বসে ব্রেড অ্যান্ড বাটার দিয়ে গিলে খাচ্ছি।

গত ১১ বছরে বিশ্বে প্রায় হাজারখানেক সাংবাদিকের মৃত্যু হয়েছে। এবং প্রতি দশজনের মধ্যে একজনের খুনের কিনারা হয়েছে। অর্থাৎ সাংবাদিকরা সারা বিশ্ব জুড়েই একটি তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক।অথচ তারা মানুষকে সচেতনতা, সংগ্রাম, আলোর দীপ্তি জোগাচ্ছে। তাদের প্রাপ্তি শুধু মোমবাতি?

অবশেষে ‘কিন্তু’ আসে : কিন্তু,হ্যাঁ এই ‘কিন্তু’ই চলে আসে বর্তমান ডটকমের যুগে সাংবাদিকতার জগতে। একটি মহৎ পেশা (একটি ইজম) তখন দাঁড়িয়ে যায় প্রশ্নচিহ্নের মুখে যে, এটি এখন কতটা মাহাত্ম্য বজায় রেখেছে। কতটা কৌলিন্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে এই ধর্মটির?

সাংবাদিকতার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বড় বড় ব্যক্তিরা,রামমোহন, বিদ্যাসাগর, কাজি নজরুল ইসলাম আদর্শ প্রচারের উদ্দেশ্যে এই কাজে নিযুক্ত হয়েছে। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে ভারতবর্ষে সাংবাদিকতা এই নিয়তেই  চলেছে।রামনাথ গোয়েঙ্কা, কিংবা বরুন সেনগুপ্ত,গৌরকিশোর ঘোষ —-এঁদের নাম স্বমহিমায় উজ্জ্বল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও এটা সত্য যে, এই পেশা এখন নিছক একটি ‘জব’এ পরিণত হচ্ছে ধীরে ধীরে।

কে,কী,কোথায়, কখন, কেন,কীভাবে —এই মূলমন্ত্রগুলো সবসময় সাংবাদিকদের সঙ্গে জুড়ে থাকে।এই নিয়েই তাদের ঘরসংসার । কিন্তু ইদানীং এর সঙ্গে আরেকটি শব্দের যুক্ত হয়েছে। পাবলিক খাবে তো? প্রফিট বিচার করে তবে খবর ছাপা হচ্ছে। এটা টিআরপি বাড়াবে তো?এই খবরটা ছাপলে মন্ত্রীরা খুশি হবে তো? কিংবা যারা সংবাদপত্রের  পিছনে টাকা ঢালছে, তাদের মনোরঞ্জন হবে তো? এই প্রশ্ন ঘুরপাক খায় তাদের মনে।পেইড নিউজের রমরমা চলছে প্রিন্ট থেকে ইলেকট্রনিক,অনলাইন  —-সমস্ত মিডিয়ায়। গ্রামীণ খবরের স্পেস কমিয়ে দিয়ে সস্তা সেনসুয়ালিজমের সুড়সুড়িতে মেতেছে মিডিয়া।

সাংবাদিকের চোখ দিয়ে দুনিয়া দেখে ঘুম থেকে জেগে ওঠা মানুষ। চায়ের কাপের সঙ্গী হয় খবরের কাগজ।  পছন্দসই নিউজ চ্যানেলে রিমোট ঘোরে। মত-অমত তৈরি হয়। তাই এখন সেই সময়। যখন সময়টা খুব একটা ভালো নয়। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর এটাই ভালো সময়। এখন জান্না জিহাদরা এগিয়ে যাচ্ছে।  সময় এখন সেই পথে পা মেলাবার। আর বিশ্ববিবেকের দাঁড়ানো উচিত সেইসব মানুষদের পাশে,যারা নিজেদের জীবন বাজি রাখছেন প্রতিনিয়ত। (সৌজন্যে : দৈনিক কলম)