মুহাম্মদ নূরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা: 


“আমি আই. সি. এস. এ চতুর্থ স্থান দখল করেছি, কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি সরকারি চাকরিতে জয়েন করবোনা।আমি দেশ সেবার কাজে আত্ম নিয়োগ করতে চাই।” চিত্ত রঞ্জন দাসকে ঠিক এ ভাবেই চিঠি লিখে ছিলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু।জানকি নাথ বসু ও ভগবতী দেবীর ১৩ সন্তানের নবম সন্তান ছিলেন সুভাষ চন্দ্র।তখন তিনি তুখোড় ছাত্র।সেই সমাজে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে একটা বড় চাকরি পাওয়া মনে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া।তার উপর প্রশাসনিক চাকরির পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করা চাট্টি খানি কথা ছিলনা।বিশেষ করে তৎকালীন এলিট সমাজে ইংরেজদের কাছাকাছি আসা আর তাদের অনুগ্রহ পাওয়ার একটা প্রতিযোগিতা অবশ্যই ছিল।সুভাষ চন্দ্র বসুর পিতা ছিলেন প্রখ্যাত আইন জীবী।বাংলা ছেড়ে তিনি কটকে থাকতেন আইন ব্যাবসার জন্য।সন্তান সন্ততিদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে ছিলেন সরকারি পদে বড় আমলা হবার জন্য। ইংরেজ আমলে ইংরেজ সরকারের স্নেহধন্য হবার থেকে বড় পাওনা আর কিছু থাকতে পারে?সুভাষ চন্দ্রের জীবন স্বাভাবিক গতিতে গেলে অন্যরকম হওয়ার কথা।কিন্তু তা হয়নি।

সংবেদনশীল মন আর তীব্র আত্ম সম্মানবোধ সুভাষকে ভিন্ন পথে চালিত করে। উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে তার চোখ খুলে যায়। ইংরেজ জাতি কতটা স্বাধীন চেতা,তারা কতটা আত্মসম্মান নিয়ে চলে তা দেখার পর সুভাষের হৃদয় ডুকরে কেঁদে ওঠে। আমার দেশ তো এমন নয়? আমরা তো মাথা তুলে কথা বলতেও ভয় পাই। পরাধীনতার শৃঙ্খল একটা জাতিকে কতটা অসহায় করে দেয়, কতটা দুর্বল করে দেয় তা ভাবতে গিয়ে তাঁর মাথা ঘুরে যায়।

ঠিক এই জায়গায় এসে বর্তমান যুব সমাজের জন্য একটা চিন্তার খোরাক রয়েছে। যখন ভারতের প্রথিতজশা অনেক মনীষী ইংরেজদের আনুগত্য করে, ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন তখন সুভাষ চন্দ্র ভাবছেন ঠিক তার উল্টোটা।তাঁর বিচারে ভারতের দুর্দশার কারণ যারা তাদের দ্বারা আর যাইহোক দেশের সামগ্রিক উন্নতি হতে পারেনা। এই জন্যই বলা হয় সুভাষ বসু আলাদা ধাতু দিয়ে গড়া।তিনি ভাবতে লাগলেন ইংরেজরা স্বাধীন আমরা স্বাধীন হবোনা কেন?স্বাধীনতা আমার জন্মগত অধিকার। সেই অধিকার কেউ ছিনিয়ে নিতে পারেনা ।সেই সঙ্গে সঙ্গে তিনি এও উপলব্ধি করলেন যে কোন অত্যাচারী শাসকের কাছে দয়া মায়া আশা করা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়। যারা নিজেদের জন্য গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ইত্যাদি বিষয়ে খুব সজাগ তারা আমাদের কোনো অধিকার কেন দিতে চায়না? আসলেই তারা ভারতের মানুষদেরকে মানুষই মনে করেনা।এই অপমান বোধ থেকেই তাঁর মধ্যে জাগ্রত হয় তীব্র আত্নাভিমান।এই অভিমানই তাঁকে দেশ সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে।তিনি ইংরেজদের পদলেহন না করে তাদের মাথায় বাড়ি মারার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আজকের যুব সমাজের কাছে বিনীতভাবে একটা প্রশ্ন রাখতে চাই। সুভাষ চন্দ্র বসুর সামনে কী সুখময়, নিরুপদ্রব জীবনের হাতছানি ছিলনা? তিনি কী চাকরী বাকরী করে ,বিবাহ সাদী করে, একটা সুখময় জীবন উপভোগ করতে পারতেন না?সবকিছু ত্যাগ করে নেতাজী কেনো বেছে নিলেন এই কন্ঠকাকীর্ন পথ? তার জন্য তো অপেক্ষা করছিল ফুল বিছানো রাস্তা। নেতাজীর মূর্তিতে মাল্য দান করে, আর তাঁর মৃত্যু রহস্য নিয়ে বাক বিতণ্ডা করে কাল ক্ষেপন নয় বরং তাঁর জীবন দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ দিক গুলি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা আজকে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।
নেতাজীর জীবন দর্শনের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর ধর্ম নিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা।জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষকে ভালোবাসা তাঁর কাছে নীতি কথা ছিলনা। তিনি আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন মানবতাবাদী। কোনো মুখোশ তিনি পছন্দ করতেন না। সাম্প্রদায়িক বিভাজন যে ইংরেজদের চাল সেটা তিনি বুঝে ছিলেন হাড়ে হাড়ে।সেই সঙ্গে তিনি এদেশের মুসলিম সমাজের আসল সমস্যাও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।তাই তিনি চিত্ত রঞ্জন  বসুকে পছন্দ করতেন। চিত্ত বসুর আকস্মিক প্রয়াণে তাই সাংঘাতিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন নেতাজী। চিত্ত বসু মুসলিম সমাজের উন্নতির জন্য আন্তরিক ছিলেন।এমনকি তিনি মুসলিম সমাজের উন্নতির জন্য সেই সময়েও সংরক্ষনের প্রস্তাব দেন।হিন্দু মুসলিমের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ছাড়া যে দেশের উন্নতি সম্ভব নয় সেটা তারা বুঝে ছিলেন হাড়ে হাড়ে।আজকে ভারতবর্ষকে পিছিয়ে রেখেছে এই সাম্প্রদায়িক মানসিকতা।নেতাজী থাকলে দেশ ভাগ হতোনা।নেতাজী থাকলে সাম্প্রদায়িকতা মাথা চাড়া দিতে পারতনা।কিন্তু এ দেশের দুর্ভাগ্য যে তার নেতাজির মতো এক মহান আত্মাকে ধরে রাখতে পারেনি।

নেতাজীর দৃষ্টি ছিল সুদূর প্রসারী।তিনি স্বাধীনতার কথাই ভাবতেননা।স্বাধীন ভারত কেমন হবে তা নিয়ে ও নেতাজির ছিল সুস্পস্ট পরিকল্পনা। তার স্বপ্নের ভারতের নমুনা আমরা দেখতে পাই আজাদ হিন্দ ফৌজের মধ্যে। জাতি ধর্ম ভাষা আঞ্চলিকতা নির্বিশেষেতিনি আজাদ হিন্দ বাহিনীতে যেভাবে সকল কে সম্মান জানিয়ে ছিলেন, সকলকে দিয়ে ছিলেন সমান গুরুত্ব তেমনি ভাবে ভারতের প্রতিটি নাগরিক সমান গুরুত্ব পাবে এটাই ছিল তার স্বপ্ন। আজকের সাম্প্রদায়িকতার এই বিষময় পরিবেশে তাই নেতাজি জীবন দর্শন নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা হওয়া দরকার।

 

Advertisement
mamunschool