তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা:

১. গত পাঁচ বছরে সামনে এসেছে পরের পর গণপ্রহার ও মৃত্যুর ঘটনা, শিউরে ওঠা পরিসংখ্যান।

২. কারণ? গোরক্ষার নামে তাণ্ডব কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব

৩. ফল – আইন শৃঙ্খলার অবনতি

৪. প্রভাব- রাজনীতিকরা কখনও নীরব, কখনও শ্যাম রাখি কি কুল রাখি!

গত ৫ বছরে খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেল কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-এ আশ্চর্যরকমভাবে একটা শব্দের দাপট দেখা যাচ্ছে। `লিনচিং’- যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় গণপ্রহার ও কখনও মৃত্যু। পরিসংখ্যান যা বলছে, তাতে গত ৫ বছরে গণপ্রহার ও মৃত্যুর ঘটনা আকাশছোঁয়া। `স্ক্রল. ইনে’র খবরে এই তথ্য সামনে এসেছে। তারা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছে কীভাবে গত ৫ বছরে পরের পর গণপ্রহার ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। জনরোষের জেরে নির্মম হত্যাকাণ্ড এককথায় নজিরবিহীন বর্বরতায় পরিণত হয়েছে। ছুতো নাতায় আইন হাতে তুলে নেওয়ার এক দুর্লভ সুযোগ!

দাদরি, ২০১৫

————–

গরুর মাংস খেয়েছেন সন্দেহে উন্মত্ত ধর্মান্ধ কিছু ব্যক্তি পিটিয়ে খুন করেছিল মহম্মদ ইকলাখকে। শুধুমাত্র গুজবের বলি হতে হয়েছে দাদরির এই প্রৌঢ়কে। ঘোষিত হিন্দুত্ববাদীদের এই নৃশংসতায় বিতর্ক ছড়ায় দেশজুড়েই। উঠে আসছে অমোঘ এক প্রশ্ন। কে, কী খাবেন, কার মেনুতে মুরগী থাকবে নাকি গরু, সে বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কীভাবে অন্য কারোর থাকে? পরিস্থিতির ভয়াবহতা টের পাওয়া যায়, যখন ইকলাখদের ফ্রিজে থাকা মাংসের ডিনএনএ টেস্ট করতে পাঠায় স্বয়ং পুলিস প্রশাসন। সেই টেস্টের রিপোর্টও মিলেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, গরু নয়, ইকলাখদের বাড়িতে খাওয়ার জন্য রাখা ছিল পাঁঠার মাংস। আর এখানেই আরও একবার জোরদার হচ্ছে সেই বিতর্ক। যদি, পাঁঠার মাংসের পরিবর্তে গরুর মাংসই পাওয়া যেত মহম্মদ ইকলাখের বাড়ি থেকে, তাহলেও কি কোনওভাবে বিন্দুমাত্র সমর্থনযোগ্য হত ইকলাখকে হত্যা? একটুও কম হত কি তাঁর খুনীদের অপরাধ? অপরাধীদের শাস্তিদানের সঙ্গে মাংসের ডিনএনএ টেস্টের সম্পর্ক কী, সেই প্রসঙ্গে মুখে খুলুপ এঁটেছিল স্থানীয় প্রশাসন। সারা দেশে নিন্দার ঝড় বয়ে যেতে গ্রেফতার করা হয় অভিযুক্ত কয়েকজনকেও। ভয়ঙ্কর অপরাধের পরে দাদরিকাণ্ডে অভিযুক্তরা জামিনে মুক্ত।

পরের পর ঘটনা

——————

দাদরি নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় হয়েছে বেশি। কিন্তু এই ধরণের ঘটনা পরের পর ঘটে চলেছে। বিরামহীন, গোটা সভ্যতাকে এক কথায় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

মার্চ, ২০১৬- ২ পশু ব্যবসায়ীকে গণপ্রহারের পর হত্যা করা হয়। গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁদের দেহ উদ্ধার হয়। ঘটনাটি ঘটেছে ঝাড়খণ্ডে।

জুলাই, ২০১৬- গুজরাতের উনায় স্বঘোষিত গোরক্ষকরা চার দলিত যুবকের জামাকাপড় খুলে তাঁদের গাড়ির সঙ্গে বেঁধে রড দিয়ে পিটিয়েছিল। এই ঘটনার ভিডিও তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দুষ্কৃতীরা সতর্কবার্তা দিতে চেয়েছিল। ঘটনাটি জানাজানি হতেই দেশ জুড়ে হইচই শুরু হয়ে যায়। সংসদ পর্যন্ত বিষয়টি গড়ায়। গোটা ঘটনার জবাবদিহি করতে গিয়ে বিজেপি নাজেহাল হয়।

জুন, ২০১৮- উত্তরপ্রদেশের হাপুরে গোহত্যার গুজবে হত্যা। উত্তরপ্রদেশের হাপুরের এই ঘটনায় গণপ্রহারে ৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মৃত্যু হয় এবং ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ গুরুতর আহত হন। ওই দুই ব্যক্তি গোহত্যা করেছেন এই অভিযোগ তুলে তাঁদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছিল। হাপুরের ঘটনায় যে ভিডিওটি সামনে এসেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, জনতা ৬৫ বছরের বৃদ্ধ সামিয়ুদ্দিনকে মারধর করছে।

গোরক্ষা ছাড়াও গণপ্রহার

————————

গণপ্রহারে মৃত্যুর ঘটনা শুধু গোরক্ষা ও ধর্মান্ধদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজবে ভর করে জনরোষের শিকার হন অনেকে। ছেলেধরা, চোর সন্দেহে মারধর রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে। প্রশ্ন হল, সন্দেহের বশে কাউকে মেরে ফেলা যায়? আইন হাতে তুলে নেওয়া যায়?

পশ্চিমবঙ্গও এই রোগ থেকে বিরত নেই।  সংক্রামক ব্যধির মতো এটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রভাব

———-

গণপ্রহারে এভাবে নির্বিচারে হত্যার ঘটনা ঘটছে। অথচ এর কোনো সরকারি হিসেব নেই। কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টই প্রামাণ্য। `কুইন্ট’- অনুযায়ী ২০১৫ সালে সারা দেশে ৮৮ টি গণপ্রহারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

————————

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এব্যাপারে খুব ক্ষীণ কণ্ঠস্বরের মতো শোনা যায়। ভয়ঙ্কর অপরাধের পরও শাস্তির ঘটনা নজিরবিহীন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে মাঝে মধ্যে বলতে শোনা গেছে, আইন হাতে তুলে নেবেন না।

দাদরি কিংবা উনার ঘটনা নিয়ে দেশ তোলপাড় হয়েছে। কিন্তু গণপ্রহার ও তারপর মত্যুর ঘটনা নিয়ে সেভাবে জোরালো বিরোধী কণ্ঠস্বরও শোনা যায় না। প্রশ্ন হল এই বর্বরতার কি আদৌ অবসান হবে? চোখ বুজে বলা যায়, কঠোর শাস্তি এই রোগের একমাত্র ওষুধ।