মনোরঞ্জন ব্যাপারী, টিডিএন বাংলা: আমরা ভারতবর্ষে আসি ১৯৫৩ সালে । তবে নানা পথ ঘুরে ধাক্কা খেতে খেতে যাদবপুরে আসি ১৯৬২ সালে । যেখানে আমরা বাস করতাম সেটা ওপারবাংলা থেকে আসা মানুষের কলোনী । কিন্ত আমরা অবাক হয়ে দেখলাম এখানে আমাদের যে জাত- সেই ‘নমোশুদ্দুর’ জাতের একজন মানুষও নাই। অনেকদিন পরে একজনকে পেয়েছিলাম যে জাতফাত পাল্টে ‘উচ্চবর্ন’ তালিকায় নাম তুলে দিয়েছে। সত্যি বলতে কী আমাদের জাতিতে কিছু এমন পদবি আছে যা উচ্চবর্নেও আছে । তাই যার একটু বিত্ত জমেছে পোশাক আসাক একটু ‘ভদ্দোরোচিত’ করে নিতে পেরেছে সে আর নিজেকে নমোশূদ্দুর বলে পরিচয় দিতে চাইছে না ।

মনে তখন এই কারনে খুব কষ্ট পেতাম। অনেকবার আমি আমার কথায় লেখায় এ নিয়ে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছি । কিন্ত আজ মনে হচ্ছে তারা যা করেছেন অনেকটা ভেবে চিন্তে বাধ্য হয়ে করেছেন । না করে তাদের কোন উপায় ছিলনা । নির্বোধের দলে নাম থাকায় সমাজে সম্মান বাড়ে না অপমানিত হতে হয় । এটা তারা জানে বলেই এমনটা করে।

মানুষ- যে কোন মানুষ তার বাবার নাম জাতির নাম দেশের নাম জেলারনাম বলতে গর্ব বোধ করে থাকে । যখন আমি কাউকে বলতে শুনি আমি বরিশাইল্যা বাঙাল, চারন কবি মুকুন্দ দাস, বিপ্লবী হেমন্ত ব্যাপারী, কবি জীবনান্দ দাস, কবি শঙ্খ ঘোষ, নট নাট্যকার উৎপল দত্ত, অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী-আমাগো জিলার মানুষ । আমারও গর্বে বুকটা ভরে ওঠে । কিন্ত যখন আমাকে আমার জাতির নাম বলতে বলা হয় ভিতরে ভিতরে কেমন যেন কুঁকড়ে যাই। গর্বিত হবার মত কোন উপাদান খুঁজে না পেয়ে জাত বলতে হীনমন্যতা এসে গ্রাস করে ।

এর কারন এই নয় যে আমার জাতির অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র দুর্বল অসহায় নিরক্ষর । এমন জাতি সারাদেশে অনেক আছে । লজ্জা সে কারনে নয়- লজ্জার কারন এই যে- আমার জাতির অধিকাংশ ভয়ংকর রকম নির্বোধ । এত পরিমানে নির্বোধ আর কোন জাতিতে নাই । এরা যে কে আপন কে পর কিছুই চিনতে পারেনা, চিনতে চায়ও না । কিসে উপকার কিসে ক্ষতি জানতেই চায় না । হাজার বছর ধরে সে যে অজ্ঞান অন্ধকারের বন্ধকূপে মাথা গুঁজে পড়ে আছে সেখানেই পড়ে থাকতে চায় । সে মুক্তি চায় না, মহাবিশ্বের জ্ঞান বিজ্ঞানের আলো তার ভালো লাগে না । অন্ধকার তার বড় প্রিয় ।
তার জাতির যে শ্রেষ্ট পুরুষ,যার জন্য এই জাতির কিছু পরিচিতি সারাদেশে চর্চার বিষয়, সেই মহান পুরুষের বাক্য বানী উপদেশ পর্যন্ত এরা মেনে চলতে চায় না । তার সারা জীবনের লড়াই ছিল ব্রাম্মন্যবাদের বিরুদ্ধে । আর এরা মুখে সেই আদর্শের কথা বললেও চলছে ঠিক তার উল্টো পথে । পা চাটছে সেই ব্রাম্মন্যবাদেরই। ভাবছে এতেই মোক্ষ এতেই মুক্তি ।

ব্রাম্মন্যবাদের যে সবচেয়ে বড় ঘাটি, এই সমাজের একদল লোক যারা নিজেদের ‘শিতক্ষুত’ বলে তারা সেই ঘাটির পদানত হয়ে ভাবছে জীবন বুঝি সার্থক আর ধন্য হয়ে গেল ।

আপনারা জানেন দেশভাগের ফলে উদ্ভুত পরিস্থিতির কারনে এই জাতির লোককে ওপার বাংলা থেকে ওপার বাংলায় চলে আসতে হয়েছিল । যাদের আজ আর যাবার মত কোন জায়গা নেই । আজ এন আর সি নামক একটা ভয়ংকর আইন এনে তাদের উৎখাত ও জেলবন্ধী করার একটা চক্রান্ত শুরু হয়েছে । যে সব মানুষ এই আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তারা বার বার এদের সতর্ক করেছে । এই আইনের করাল থাবা থেকে রক্ষা পেতে হলে কী করতে হবে সেটাও বুঝিয়ে বলেছে । যার প্রথম আর প্রধান কাজ ছিল যারা সেই হানীকারক শক্তি- তাদের সঙ্গ বর্জন করা, দূরত্ব বজায় রাখা । ততোদিনে আসামের বহু মানুষ এন আর সির কোপে পড়ে দেশহীন নাগরিকে পরিনত হয়ে গেছে । বহুজনকে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়ে গেছে । এমন কি পঞ্চাশ জনের বেশি মানুষ আত্মহত্যাও করে ফেলেছে । সেই উদাহরন তুলে বোঝানো হয়েছে ‘ওরা’ শক্তি বৃদ্ধি করলে বাংলার রাজক্ষমতায় এলে এখানেও এন আর সি আনবে । তোমাদেরও উৎখাত করে দেবে । কিন্ত কে শোনে কার কথা ! লোকে বলে পাগলেও নিজের ভালো বোঝে । একটা ছোট্ট বাচ্চা সেও বুঝে যায় কে তাকে ভালোবাসে কে বাসে না । কিন্ত এই জাত এত নির্বোধ যার সামান্য এইটুকু জ্ঞান বুদ্ধিও নেই । আছে মাত্র অন্ধ মুসলমান বিদ্বেষ । আর আছে আমি সব জানি আমি সব বুঝি-এই মুর্খতা । তাই তারা সেই যেমন মুর্খ হাঁস শেয়ালকে নিজের রক্ষা কর্তা ভাবে, এরা চরম ব্রাম্মন্যবাদী ,পুঁজিবাদী, বাঙালী বিদ্বেষী একটা দলকে বন্ধু ভেবে নিজেদের মূল্যবান ভোট দিয়ে শক্তিবৃদ্ধি করে দিয়েছে । মনে মনে আশা করছে ওঁরা ক্ষমতায় এলে মুসলমানদের তাড়িয়ে তাদের ঘর বাড়ি জমি জায়গা সব আমাদের দিয়ে দেবে । বলে না লোভে পাপ আর পাপে মৃত্যু ! এমন লোভ আসামের বাঙ্গালরাও করেছিল । হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে লোভের কি পরিনাম । লোভের বশবর্তী হয়ে যে ভোট দিয়েছিল সেটাই তাদের জীবনের শেষ ভোট হয়ে গেছে । আর জীবনে কোনদিন কোন ভোট দিতে পারবে না । খুন জখম চুরি ডাকাতি না করেও-জেলখানায় গিয়ে ঘানী টানবে আর নিজের কপাল চাপড়াবে ।

মজার ব্যাপার এটাই যে আসামের কাতর কান্না বাংলার নির্বোধ গুলোর কানে ঢুকছে না । এরা এখনো অন্ধ ‘আমরা হিন্দু, আমাগো কিছু হইবো না’ আহাম্মুকি ভ্রমে ডুবে বসে আছে । শুনতে পাচ্ছি নাকি কোন এক ঠাকুরের নাম সই করা কাগজ এদের দেওয়া হচ্ছে আর বলা হচ্ছে যার যার কাছে এই কাগজ থাকবে এন আর সি তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না । যে কাগজ দেবার জন্য নাকি কারো কাছ থেকে পাঁচশো, কারো কাছ থেকে সাতশো, আবার কারো কাছ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত মাথা পিছু দাম নেওয়া হচ্ছে ।
ভাবতে পারেন এদের নির্বুদ্ধিতার পরিমান ? কার্গিল যুদ্ধের সাহসী সৈনিক, যাকে রাষ্ট্রপতি পদক দিয়েছে, সেই পদক তাকে বাঁচাতে পারেনি। এমন কী ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পরিবার- তাদেরও বে নাগরিক করে দেওয়া হয়েছে । পঞ্চাশ বছর আগের দলিল পত্র থাকার পরেও অনেকের ঠাঁই হচ্ছে ডিটেনশান ক্যাম্পে । আর এদের বাঁচাবে কোন এক ঠাকুরের নাতির নাম ! এই সব নাম ফাম মরার পড়ে স্বর্গে নিয়ে গেলেও যেতে পারে জীবিতের কোন কাজে আসবে না ।


আমার অনেক পরিচিত জন মানবতা বিরোধী এন আর সি নিয়ে খুবই চিন্তিত । তারা এর বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছে । আমাকেও সঙ্গে পেতে ডাকছে । আমি যাচ্ছি না বলে তাদের অনেকে রাগ করছেন । যতই ডাকুন আমি কিছুতে যাবো না । ডাক্তারি শাস্ত্রে বলে যে রোগী বাঁচার আশা ত্যাগ দেয় কোন অসুধ তাকে বাঁচাতে পারে না । বাঁচে সে যে বাঁচতে চায় । দেখে শুনে মনে হচ্ছে নমো মতুয়া বাঙালরা আর বাঁচতে ইচ্ছুক নয় ,তারা পায়ে পায়ে মৃত্যুর দিকেই হাটছে । কাজেই তাদের বাঁচাবার চেষ্টা করা বেকার । যেতে দাও যাতে তার আত্মার শান্তি সেই দিকে ।
কথায় তো বলে চাঁচা আপন প্রান বাঁচা । এদের বাঁচাবার চেষ্টায় সময় শ্রম অর্থ অপচয় না করে যে ভাবে নিজে বাঁচতে পারি সেই চেষ্টাই করা উচিৎ । আমি এখন সেই চেষ্টাই করছি। বাবা দন্ডকারন্যে পুনর্বাসন পেয়েছিলেন, ৬৯ সালের সেই নথিপত্র জোগাড় করে বেড়াচ্ছি । কিছু পেয়ে গেছি কিছু বাকি আছে । তবে যা পেয়েছি,আমাকে তাড়াতে হলে অনেক কাঠখড় পোড়ানো লাগবে ।

শেষ কথা আমার একটাই- যার অসুখ অসুধ তাকেই খুঁজতে হবে । তুমি রেল লাইনে ঝাঁপিয়ে পড়বে আর আমাকে বলবে বাঁচাও সে আমার দ্বারা হবে না । তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে আমি যদি মরে যাই আমার ঘর পরিবার কে দেখবে ? তবে যেদিন দেখবো কলকাতার রাজপথে কমপক্ষে একলক্ষ নমো মতুয়া বাঙাল মিছিল করছে- ওই সেই মেট্রোর মত নকল সমাবেশ হলে হবে না যেখানে হাজার দশেক লোক হয়ে ছিল অথচ প্রচার চলে দশ বিশ লাখের, সত্যি যেদিন এক লাখ লোক পথে নামবে সেদিন কাউকেই ডাকতে হবেনা, খুড়িয়ে খুড়িয়ে আমিও গিয়ে মিছিলে হাটবো । মিছিলের শেষতম ব্যক্তি আমিই থাকবো।

(লেখক বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও দলিত-চন্ডাল আন্দোলনের নেতা)