তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা:  ফুল ফুটুক, না, ফুটুক আজ বসন্ত।

আকাশে বাতাসে বসন্তের রঙ লেগেছে। প্রকৃতি আজ তার সব রূপ উজার করে দিয়েছে। যেখানে পলাশ ফোটে, মাদলের মাতাল সুরে আজ সেখানেই মন ভেসে যেতে চাইছে। কারণ শীতের রুক্ষ দিনের অবসান ঘটিয়ে `আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে…’।

বসন্ত কালকে রঙে রঙে রঙিন করে তোলে যে উৎসব, তা হল দোলযাত্রা বা হোলি খেলা। নতুন করে জেগে উঠে, নতুন আনন্দে নতুন আশায় রঙিন হয়ে ওঠার এই উৎসব শীতল রুক্ষতার আগল ভেঙে বলে ওঠে, ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল…..।

ফাগের রঙিন স্পর্শে আন্দোলিত হয়ে অন্তর বলে ওঠে, ‘দোলে দোলে দোলে প্রেমের দোলনচাঁপা হৃদয় আকাশে/ দোল ফাগুনের চাঁদের আলোর সুধায় মাখা সে।’ মনে পড়ে যায়, সেই কবে বৃন্দাবনে প্রেমিক যুগল রাধাকৃষ্ণের রঙের উৎসবে মেতে ওঠার কথা—‘বসন্ত আওল রে! মধুকর গুনগুন অমুয়ামঞ্জরী কানন ছাওল রে।’

প্রাচীন ইতিহাস ও প্রাচীন চিত্রে দোল বা হোলির অসংখ্য চিত্র অঙ্কিত হয়ে আছে। রাজস্থানে রাজপুতদের কাছে হোলি খেলা কার্যত প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছিল। শুধু রঙেই নয়, হোলিখেলাকে কেন্দ্র করে রাজপুতদের জাতীয়তাবোধের পরিচয়ও বারবার দেখা গেছে। জাতির সম্মান পুনরুদ্ধারে ভূনাগ রাজার রানি কী করেছিলেন?

‘পত্র দিল পাঠান কেসর খাঁরে
কেতুন হতে ভূনাগ রাজার রানী
লড়াই করি আশ মিটেছে মিঞা?
বসন্ত যায় চোখের উপর দিয়া
এসো তোমার পাঠান সৈন্য নিয়া
হোরি খেলব আমরা রাজপুতানী’।

দোলযাত্রা- হোলি উৎসব

দোলযাত্রা একটি হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব। এই উৎসবের অপর নাম বসন্তোৎসব। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।

বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির ও গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপিনীর সঙ্গে রঙ খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়।

আবার এই পূর্ণিমা তিথিতেই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম বলে একে গৌরপূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়। দোলযাত্রা উৎসবের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিকও রয়েছে। এই দিন সকাল থেকেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে আবির, গুলাল ও বিভিন্ন প্রকার রঙ নিয়ে খেলায় মত্ত হয়।

উত্তর ভারতে হোলি উৎসবটি বাংলার দোলযাত্রার পরদিন পালিত হয়। হোলি নামটা এসেছে ‘হোলিকা’ থেকে। দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা। প্রচণ্ড নিষ্ঠুর ছিল দুই ভাইবোন। হিরণ্যকশিপু অপরাজেয় থাকার বর পেয়েছিল। তাই কোনও দেবতাকেই মানত না। বলত দেবতা নয়, পুজো তাকেই করতে হবে। কিন্তু হিরণ্যকশিপুর পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন বিষ্ণুর ভক্ত। সে তার বাবার আদেশ মানতে রাজি নয়। হিরণ্যকশিপু ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। নানা ভাবে ছেলেকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ফল হল না। শেষে প্রহ্লাদকে ভুলিয়েভালিয়ে জ্বলন্ত চিতায় বসল হোলিকা। নিজে গায়ে দিল অগ্নি-নিরোধক শাল। কিন্তু আগুন জ্বলে উঠতেই সেই শাল উড়ে গিয়ে প্রহ্লাদকে ঢেকে ফেলল। অগ্নিদগ্ধ হল হোলিকা। বিষ্ণুর আগমন ঘটল। তাঁর হাতে নিহত হল হিরণ্যকশিপু। ওই আগুন হল অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়ের প্রতীক। হোলিকা দগ্ধ হওয়ার পরের দিন পালিত হয় হোলি।

 

শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব

দোলযাত্রা উৎসব শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব নামে পরিচিত। শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে। দোলপূর্ণিমার দিনই শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবের আয়োজন করা হয়। আগের রাতে বৈতালিক হয়। দোলের দিন সকালে ‘ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল’ গানটির মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সন্ধ্যায় গৌরপ্রাঙ্গণে রবীন্দ্রনাথের কোনও নাটক অভিনীত হয়।

বসন্ত উৎসবে মেতে উঠেছে সারা বাংলা। সকাল হতেই রঙে রসে জাল বুনে মেতে উঠেছে আপামর বাঙালি। আগামী কাল হোলির রঙে রেঙে উঠবে দেশ।