ডি এন ঝা, টিডিএন বাংলা: অযোধ্যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় হতাশাজনক। যে যুক্তির ওপরে এই রায় সাজানো হয়েছে, তার অনেক কিছুই প্রশ্নযোগ্য। একটি অংশ হলো ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের ২০০৩-র রিপোর্টের উল্লেখ। শীর্ষ আদালত সেখান থেকে কিছু সিদ্ধান্ত টেনেছে। ওই রিপোর্ট সবদিক থেকেই ভ্রান্ত, নির্ভরযোগ্য নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে ওই খনন করা হয়নি। আদালতের রায়ে ওই খননকার্য চালানো হলেও প্রথম থেকেই ধরে নেওয়া হয়েছিল তলায় একটি হিন্দু মন্দির রয়েছে। এই ধারণাকে প্রমাণ করার জন্য যা যা বলতে হয় বলেছে। যে যে প্রমাণ এই পূর্বনির্ধারিত ধারণার সঙ্গে মেলে না তা গোপন করা হয়েছে। যেমন পশুর হাড়, চিত্রিত পাত্র, গ্লেজড টাইলস পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু তা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়নি। ওই রিপোর্টে ইটের তৈরি স্তম্ভ পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ওই খনন দেখছিলেন এমন প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনেকে তখনই অভিযোগ করেছিলেন এধার-ওধার থেকে পাওয়া ইট একজায়গায় জড়ো করে স্তম্ভের তত্ত্ব খাড়া করা হচ্ছে। সেই স্তম্ভও কোনও ভারবাহী স্তম্ভ নয়। মজার কথা হলো গোটা রিপোর্টে মন্দিরের অস্তিত্বের কোনও উল্লেখ নেই কিন্তু ‘রিপোর্টের সংক্ষিপ্তসার’ পরিচ্ছেদে হঠাৎ মন্দিরের উল্লেখ করা হয়। এই অংশটির লেখক কে, তা বলা নেই। বোঝাই যায় এ বিকৃত রিপোর্ট। ইতিহাসবিদরা ওই রিপোর্টকে আগেই খারিজ করে দিয়েছেন। এর আগে চার ইতিহাসবিদ— সূরয ভান, আথার আলি, রামশরণ শর্মা ও আমি— সমস্ত পুরাতাত্ত্বিক ও পাঠ্য নিদর্শন খতিয়ে দেখেছিলাম। আমাদের উপসংহার ছিল মসজিদের নিচে কোনও হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্ব নেই। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, অ-ঐস্লামিক কাঠামো পাওয়া গেছে বলে এএসআই বলেছে। তা কী, স্পষ্ট নয়। এই নিয়েও পুরানো বিতর্ক রয়েছে। এলাহাবাদ হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল সেখানে হিন্দু পক্ষের বিশ্বাস অন্য যুক্তির ওপরে প্রাধান্য পেয়েছিল। ঐতিহাসিক প্রমাণকে অস্বীকার করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় খারিজ করে দিয়েছে। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ক্ষেত্রে ভ্রান্ত রিপোর্টকেই উল্লেখ করেছে। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে মুসলিম শাসকরা হিন্দুদের মন্দির ভেঙেছেন। কিন্তু হিন্দু শাসকরা এর থেকে বেশি মন্দির বা ধর্মস্থান ভেঙেছে। জৈন এবং বৌদ্ধদের অসংখ্য ধর্মস্থান তারা ভেঙে দিয়েছে। কে কত ধর্মস্থান ভেঙেছে, তা নিয়ে গবেষণা চলতেই পারে। মধ্যযুগের ভারতে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের তেমন ইতিহাস না থাকলেও অযোধ্যায় ১৮৫৫-তে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত হয়েছিল। অওধের নবাব সেই সংঘাতের মীমাংসায় মসজিদের বাইরে মূর্তি বসানোর অনুমতি দিয়েছিলেন, ওই জায়গাই পরে সীতা কা রোসই নামে পরিচিত। ওয়াকফ বা ট্রাস্টও তিনি তৈরি করেছিলেন। ১৮৮৫-তে আইনগতভাবেই ঠিক হয় মসজিদে মুসলিমের অধিকার থাকবে, সীতা কা রোসই হিন্দুদের হবে। এই প্রশ্নে সাম্প্রদায়িক অভিযান নতুন করে শুরু হয় ১৯৪৯-র ডিসেম্বরে মসজিদের অভ্যন্তরে চুপিসারে মূর্তি বসিয়ে দেবার পর থেকে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ তৈরি হবার পরে এবং বাবরি মসজিদের জায়গাতেই রামমন্দির বানাতে হবে এই স্লোগান তোলার পরে সাম্প্রদায়িকতা চড়া মাত্রা পায়। তারপরে কীভাবে রামমন্দির নির্মাণের অভিযান চালানো হয়েছে তা আমরা সকলেই দেখেছি। আমার মনে হয়, বিচারবিভাগের উচিত ছিল আগেই ইতিহাসবিদ ও বিশেষজ্ঞদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার। তাঁদের অভিমত নেওয়া যেতে পারত। এমনকি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া যেতে পারত। কোনও একটি রিপোর্টের হঠাৎ এবং বিচ্ছিন্ন উল্লেখ করে কোনও বিশ্বাসের ধারণাকে বৈধতা দেওয়ার প্রয়াস ভালো লাগেনি। পেশাদার ইতিহাসবিদ আমি বলতে পারি রাম ওই ২.৭৭ একরেই জন্মেছিলেন তা কোনোদিনই প্রমাণ করা সম্ভব নয়। এই বিশ্বাসের পিছনে যুক্তি নেই। বিশ্বাসের ভিত্তিতে যুক্তিকে পিছনে ঠেলে দেওয়া সমাজের পক্ষে কল্যাণকর নয়।

(সৌজন্যে: গণশক্তি। লেখক দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রাক্তন অধ্যাপক, অযোধ্যা বিশেষজ্ঞ)