জানে আলম, টিডিএন বাংলা: রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্ট-২০০৯ আইনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ফেল নিষিদ্ধ ছিল। সেই আইনের সংশোধন আনে কেন্দ্রীয় সরকার। তারা বিভিন্ন বোর্ডকে নির্দেশ দেয় পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণিতে পাশ-ফেল প্রথা পুনরায় চালু করতে। তাই রাজ্যে ২০২০ শিক্ষাবর্ষে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির স্কুলে ফের ফিরছে পাশ-ফেল প্রথা। তবে তামিলনাড়ু, কেরল বা মহারাষ্ট্র পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনার বিপক্ষে রায় দেয়।

পড়ুয়ারা মানুষ? না গিনিপিগ? একটার পর একটা পরীক্ষা। কখনো পাশ-ফেল, কখনো সিলেবাস পরিবর্তন , কখনো ইউনিট টেস্ট, কখনো রেমিডিয়াল টেস্ট, কখনো নয়া পরিকাঠামো – কোন কিছুরই স্থায়িত্ব নেই।  বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ছাড়াই পরিবর্তন। আসলে মানুষের জাতগত স্বভাব কি জানেন? এরা পরিবর্তনের পরিপন্থী। তবুও যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে সব সময় ডাইনামিক হতে হবে – এই ভয় ও দুর্বলতা কাজ করে তার মধ্যে। তাই যুগে যুগে শিক্ষাবিদ বা দার্শনিকরা শিক্ষাক্ষেত্রে নীতি ও আর্দশের পরিবর্তনে সমাজের কল্যাণ নিহিত আছে ভেবেই মানুষ যে কোন পরিবর্তনে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় কি জানেন? ক্ষমতার বাহুবল বা অপব্যবহার যাই বলুন না কেন, নেতা- আমলাদের আদি রোগ হল তারা উদ্দেশ্য ও বিধেয় এই দুইটি সব সময় গুলিয়ে ফেলে। অনেক পুরাতন ব্যাধির মতোই তা বারংবার মোচড় দিয়ে ওঠে। পাশ-ফেল বাতিল করে ফের চালু করার প্রস্তাব তারই দৃষ্টান্ত।

পাস-ফেল বিষয়ে আমার নিজস্ব কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করার পূর্বে পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণিতে পাশ-ফেল এবং রেমিডিয়াল টেস্ট নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন মনে করি:-

শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘জানুয়ারিতে নতুন শিক্ষাবর্ষেই পঞ্চম ও অষ্টমে আবার পাশ-ফেল চালু হয়ে যাচ্ছে। যে-সব পড়ুয়া অকৃতকার্য হবে, তাদের জন্য থাকবে ‘রেমিডিয়াল টেস্ট’।’’ পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে কোনও পড়ুয়া ফেল করলে তাকে দু’মাস বিশেষ ক্লাস করিয়ে আবার পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়া হবে। এই পরীক্ষার নাম ‘রেমিডিয়াল টেস্ট’। সেই টেস্টও যদি সে পাশ করতে না-পারে, তা হলে তাকে আগের ক্লাসেই থেকে যেতে হবে। ভালো কথা। কিন্তু পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বোর্ড পরীক্ষায় অসফল প্রার্থীদের পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে ফের সংশোধনী পরীক্ষা দিতে হবে। এই দুমাস তারা কোন ক্লাসে বসবে? কারা কিভাবে তাদের পাঠ দেবেন ? রেমিডিয়াল টেস্ট কী ভাবে নেওয়া হবে? টেস্ট কি স্কুল নেবে না বোর্ডের মাধ্যমে হবে? পরীক্ষার খরচ কে দেবে ? সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণিতে উঠলে তাদের এক বছরের পরিবর্তে দশমাসের শিক্ষাবর্ষ হয়ে যাবে। অকৃতকার্য পড়ুয়ারা এমনিতেই অসচেতন ফলে রেমিডিয়াল টেস্টের আগে তার স্কুলে আসা বন্ধ হয়ে গেলে স্কুলছুট হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এই বিষয়ে সঠিকভাবে নির্দেশিকা তৈরি, পঠন পাঠন ও পরীক্ষার নেওয়ার পরিকাঠামো তৈরি করে, কি ভাবে স্কুলে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে তাদের মুল স্রোতে অনায়াসে ফিরিয়ে আনা যায় তা ভাবতে হবে। না হলে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাবে।

তিন দশক আগের ঘটনা আজও মনে আটকে আছে। আমি তখন পঞ্চম পরীক্ষায় উত্তীর্ন আর আমার দাদার বন্ধু আজিরুল দাদার সাথে ক্লাস সিক্সে পড়ত। আজিরুলকে আমি মামা বলতাম। বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরের দিন দুপুরে গ্রামের একটি গাছের তলায় মাচায় বসে অনেকেই পরীক্ষা ফল নিয়ে গ্রাম্য আড্ডায় ব্যস্ত। সেই সময় গ্রামের অধিকাংশ পড়ুয়ারা একই ক্লাসে বারবার ফেল করত। আমি এক চ্যান্সে পাশ করেছি, সিক্সে উঠবো। সব বিষয়ে ভালো নম্বরও তুলেছি। তাই অনেকে আমাকে নিয়ে গর্ব করছিল। এমন সময় আজিরুল মামা বলে উঠলো আমি “ইয়ার-এর  সাথে একই ক্লাসে পড়বো না।” আমার ডাক নাম ইয়ার। সত্য সত্যিই আজিরুল মামাকে আর স্কুলে ভর্তি হতে বা যেতে দেখেনি। কারন সে ফেল করেছিল। এর আগে সে ফাইভে” তিনবার ফেল করার পর শিক্ষকদের দয়ায় সিক্সে উর্ত্তীন হয় এবং ইতিমধ্যে ফের দু বছর একই ক্লাসে মানে সিক্সে তখন। তাই বার বার একই ক্লাসে জুনিয়রদের সাথে পড়াটা তার হীনমন্যতার কারন। ফলে পড়া ছেড়ে সে বোম্বে রওনা দেয়।  এখনও সে বোম্বে রাজমিস্ত্রির কাজ করে।

এটাও স্পষ্ট  মনে পড়ে আমরা পঞ্চম শ্রেণীতে গিয়ে A, B, C, D পড়তে শুরু করি। কারন ১৯৮০ র সরকার প্রাইমারিতে পাশ-ফেল প্রথা এবং ইংরেজি তুলে দেয়। যুক্তি ছিল পাস–‌ফেল থাকলে পরীক্ষা ভীতির ফলে শিশুরা পড়া ছেড়ে দেবে এবং ড্রপ আউট বাড়বে। আর শোনা-কথা ‘চাষির ছেলে ইংরেজি শিখে কী করবে?‌’ যদিও নেতা–‌মন্ত্রীরা নিজেদের সন্তানের প্রতি সজাগ ছিল। প্রায় সকলেই তাঁদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করতেন। তারা রাজ্যের শিক্ষাকে পিছিয়ে রেখেছিল শত যোজন দূরে। এর বিরুদ্ধে বহু আন্দোলন ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। অহংকারের বশীভূত হয়ে অবজ্ঞাভরে বামফ্রন্ট সরকার দীর্ঘ বিশ বছরের অধিক কাল ধরে আন্দোলনকেও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল। পরিশেষে বিলম্বে হল বোধোদয়। পঁচিশ বছর পর স্বীকার করে সরকার, প্রাথমিক স্তরে ইংরেজি তুলে দেওয়া তাদের ঐতিহাসিক ভুল ছিল। এবং তা ফিরিয়ে আনলেও পাস–‌ফেল আর ফেরায়নি। কিন্তু ততদিনে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা তলানিতে। সেই ক্ষতির মাসুল এখনো দিতে হচ্ছে। কিন্তু পাস–‌ফেল চালুর দাবিতে একের পর এক আন্দোলন চালু ছিল আজও বর্তমান।

এর মধ্যেই ২০০৯ সালে পার্লামেন্টে পাস হয় শিশু শিক্ষার অধিকার আইন। ২০১২ র রাজ্য সরকার সেই আইনের দোহাই দিয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাস–‌ফেল তুলে দেয়। ফলে প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাস–‌ফেল প্রথা পুনঃপ্রবর্তনের দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকে। তখন কিন্তু বিপক্ষে ছিল তৃণমূলের একটা বড় অংশ।

সেই সময় আমি বহরমপুর ইউনিয়ন ক্রিস্টিয়ান টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বিএড প্রশিক্ষণরত। কলেজটিতে সারা বছর কোন না কোন প্রোগ্রাম লেগেই থাকত। কলেজেরই একটি বির্তক অনুষ্ঠানে আমি অবশ্যই পাস-ফেল প্রথার পক্ষে বিতর্ক অনুষ্ঠানে গলা ফাটিয়েছি এবং কোর্স শেষে একটি ফিটব্যাক ফর্ম ফিলাপআপ করতে হয়। সেখানেও পাস- ফেলের পক্ষে মতামত পেশ করেছি। পাস-ফেল না থাকায় পড়াশোনার জন্য পুরস্কার বা তিরস্কার কিছুই থাকছে না ফলে ছাত্র ছাত্রীরা পড়ার প্রতি মনযোগ হারিয়ে ফেলছে।

একটি ঘটনা শেয়ার না করলেই নয়। আমি যখন শিক্ষকতায় প্রথম যোগদান করি সেদিন আমাকে প্রথম দশম শ্রেণীতে পাঠালে আমি ক্লাসে ঢুকতে গিয়েই ফিরে আসি এবং হেডমাস্টার কে বলি ওই ক্লাসে একজন অভিভাবক বা কোন স্যার টেবিলে বসে কি যেন করছেন। পরে জানতে পারলাম যে সে অভিভাবক বা কোন শিক্ষক নয়। সে ওই শ্রেণীর পড়ুয়া। প্রতি ক্লাসে একাধিক বার ফেল করে করে তার বয়স বেড়ে গেলেও সে স্কুল আসা ছাড়েনি।

শিক্ষকতা করতে গিয়ে এই কয়েক বছরের যে অভিজ্ঞতা শিক্ষার মান এতটাই তলানিতে নেমেছে তা প্রকাশ করাটাই  লজ্জ্বার। অষ্টম শ্রেণি পাশ করা একটি ছেলেকে চতুর্থ শ্রেণির  সহজ অঙ্ক দিলে তার যা অবস্থা মনে হয় যেন দাঁত ভেঙ্গে গেল। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তৃতীয় শ্রেণির প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। আর রিডিং পড়া তো দূরের কথা  নাইনে পড়া কোন ছাত্রী নিজের নাম টাও কন্যাশ্রী ফর্মে ভালো করে লিখতে শেখেনি। আপনি জেনে অবাক হবেন যে এই পরিস্থিতি চলমান সত্ত্বেও শিক্ষক, ছাত্র, স্কুল, এমনকী অভিভাবক, কারও কোনও হেলদোল নেই। সকলেই একে অপরের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে খালাস। গরীব মানুষের শিক্ষা আজ ডাক্তারের ভাষায় ‘অপারেশন সাকসেসফুল বাট পেশেন্ট ডায়েড’।

 মায়ের মুখে শোনা, আগে কেউ মাধ্যমিক পাশ করলে মানুষ তাকে দেখতে যেত ঘোড়ায় চড়ে। আমার মনে হয় এখন কেউ ফেল করলে তাকে দেখতে যাওয়া উচিত কেন সে ফেল করল। তবে ফেল করার অনেক কারণ থাকতে পারে তার মধ্যে মূল কারণ হিসেবে আমার মনে হয়েছে কি জানেন? বেশিরভাগ শিক্ষক শিক্ষিকার শ্রেনী পরিচালন দক্ষতা নেই তারা পড়ুয়াদের পাঠ-গ্রহণ ক্ষমতা মাপতে অক্ষম তাই তাঁরা কচিকাঁচাদের যত্ন না নিয়ে ভাষণ দেন বেশি। এই অভ্যাস ত্যাগ না করলে ফেলের সংখ্যা কমানো যাবে না। কম স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন বাচ্চাদের চিহ্নিত করে তদের জন্য সম্পূর্ণ মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অতিরিক্ত সময় দিয়ে পাঠদান করলে ফেল আটকানো যাবে। আর ফ্রেন্ড ফিলোজফার ও গাইড সম্পর্ক তৈরি করতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দূরত্ব কমিয়ে আনতে হবে যা বর্তমানে দেখাই যায়না। এবং সব থেকে যে বেশিরভাগ শিক্ষালয়ের সমস্যা অধিক পড়ুয়ার চাপ। এক জন শিক্ষক প্রতি সর্বাধিক চল্লিশ জন শিক্ষার্থীর বেশি হলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জানার আকাঙ্খা পূর্ণ করা সম্ভব হয় না। এছাড়া এক জন কিছু না জানা ছাত্রকে উপর ক্লাসে তুলে দেওয়া হয় বটে কিন্তু তার জন্য বিশেষ কিছু অতিরিক্ত পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয় না। ফলে দিন দিন পিছিয়ে পড়ায় এক সময় তারা পড়ার ইচ্ছেটাই হারিয়ে ফেলছে। ফলে স্কুলছুটের প্রবণতাও বাড়ছে।

শিক্ষার্থী ফেল করলেই বরং অত্যধিক হীনমন্যতায় ভোগে এই ভেবে যে সহপাঠী বন্ধুরা উঁচু শ্রেনিতে উঠে গেলেও সে পূর্বের শ্রেনিতেই রয়ে গেল। এই হীনমন্যতায় স্কুল-ছুট পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকল অর্থাৎ বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যেত। এই সব কারনে শিক্ষাবিদগণ কিছু সিদ্ধান্ত নেন। কি সেই সিদ্ধান্ত?

পাশ-ফেল প্রথা তারা তুলে দিলেন, পরিবর্তে ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য সংশোধনী পরীক্ষা আনলেন। পাঠ্য-পুস্তকে অবাঞ্ছিত তথ্যের বোঝা তুলে দিলেন এবং পাঠ্য-পুস্তকের পৃষ্ঠা সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দিলেন।  নম্বর পাওয়ার ক্ষেত্রে গ্রেড সিস্টেম আনলেন। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ফেল করেও পরবর্তী শ্রেনিতে যাওয়ার সুযোগ দিলেন ইত্যাদি। আবার পাশ-ফেল তুলে দেওয়ায় বর্তমান সময়ে শিক্ষার কি করুন দুর্দশা তা আমরা হাড়ে হাড়ে টেরও পাচ্ছি।

শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের খুশি করতে পাশ-ফেল তুলে দেওয়া হয় বটে, কিন্তু শিক্ষায় প্রতিযোগিতা না থাকায় পড়ুয়ারা না পড়েই বা অল্প পড়েই উঁচু শ্রেনিতে উঠেছে। শিক্ষিত তকমা নিয়ে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠাও করছে আবার সার শূন্য সেই অল্প বিদ্যার যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরী পরীক্ষায় বসার স্বপ্ন দেখছে অর্থাৎ শিক্ষার্থীর মূল লক্ষ্য চাকুরী পরীক্ষা পর্যন্ত পৌঁছানো। কোন জ্ঞান অর্জন নয়। ভোট ব্যাংক বাড়ানো, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় টিকে থাকার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক নেতারা ভেবেছিল পাশ-ফেল তুলে দিয়ে শিক্ষার্থী- অভিভাবকের মন জয় করা যাবে।

শেষমেশ কি হল? পড়ুয়ারা কিছু না শিখেই বিনা বাধায় একটার পর একটা শ্রেণী অতিক্রম করে মাধ্যমিকের প্রান্তদ্বারে পৌঁছায়। এ যেন কোন ব্যক্তিকে গাছে উঠিয়ে মই কেড়ে নিলে যে হাল হয় সেই অবস্থা শিক্ষার্থীর হয় মাধ্যমিক পরীক্ষার সময়। সেই ব্যর্থতা ধামা চাপা দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক নেতারা চাপ দেয় কমিশনকে। কেন জানেন ? পরীক্ষা প্রশ্ন সহজ, পরীক্ষা হলে শিথিল, পরীক্ষার খাতা দেখার ক্ষেত্রে এবং নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে নরম-মনোভাবাপন্ন এবং উদারতা দেখাতে হবে যাতে বিনা বাধায় মাধ্যমিকটাও পাশ করে যায়।

 আন্তঃসার শূন্য জ্ঞান অর্জন করে শিক্ষার্থীরা যখন বিনা বাধায় উচ্চ-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সরকারী চাকুরীর যোগ্য হয়ে গেল তখন প্রতিষ্ঠা পেল বেকারত্ত্বের সংখ্যা। এক হাজার শূন্য পদে পাঁচ লক্ষ প্রতিযোগী। সরকার কাকে ছেড়ে কাকে চাকরী দেবে? প্রার্থী বাছাই করতে সময় লেগে যায় বছরের পর বছর। আশা করি সমস্যার মাত্রা বুঝতে আর বাকি নেই? বাস্তবের এই জটিল সমস্যাগুলো স্বাভাবিকভাবেই কারো জানার কথা নয়। কারণ সাধারণ মানুষ রাজনীতি বুঝলেও কূটনীতি বোঝে না। সমস্যাটা এখানেই। তবে আমি শুধু সমস্যার কথা বলেই এড়িয়ে যাই না। তার সমাধান দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টাও করি। কেবল আপনার পড়ার ও জানার ধৈর্য্য থাকলেই হবে। লিখতে আঙুল ব্যথাকে আমি প্রশ্রয় দিই না।

আমরা পঞ্চম শ্রেণীতে বেশিরভাগ সেইসব শিশুদের পাই যাদের মানের দক্ষতা অর্জন একেবারে তলানিতে। আবার কেউ কেউ একদম অক্ষর পরিচয়হীন। এই ব্যর্থতা শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষকের দায়বদ্ধতা, স্কুল পরিদর্শকের কর্তব্য, শিক্ষা দফতরের প্রশাসনিক দক্ষতা এই সকল বিষয়ে একটা বড় প্রশ্ন চিহ্ন রেখে যায়! শিশুকে ফেল করিয়ে তার উত্তর মিলবে কি? প্রতিটি শিশু যেন স্কুলে ভর্তি হতে পারে, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ক্রমাগত পাশ করে তারা বাংলা ইংরেজি লিখতে-পড়তে ও অঙ্ক কষতে সক্ষম হয়- তা নিশ্চিত করাই শিক্ষানীতির কাজ। এতেও আমরা প্রশ্নের সম্মুখীন। পাশ-ফেল না ভেবে ভাবা উচিত সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনার মান ক্রমশ পড়ছে কেন?

আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হল- গরিব ছেলে যে দুবেলা দুমুঠো খাবার কি করে জোগাড় করবে তার জন্য তার বাবা চিন্তিত। সেই জাগায় পড়াশোনা কত টা হবে? তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আমার স্কুল সংলগ্ন এলাকায় একটা ছেলে বিড়ি বাঁধছে, মাঠে কাজ করতে যাচ্ছে, হকারী করতে যাচ্ছে আবার স্কুলও আসছে। সেই বাচ্চাটা কে কোন রকম টেনে নিয়ে যাওয়ায় চ্যালেঞ্জ! সরকারকে এই ব্যাপারে আলাদা ভাবে প্রোজেক্ট নিতে হবে বিশেষ করে অর্থনৈতিক দিকটা ভালো করে দেখতে হবে। অনেক সরকারি স্কুল মাদ্রাসা আছে যেখানে ছাত্র অনুপাতে শিক্ষক নেই। সেখানে বেসরকারি মিশন ও স্কুলগুলিতে পর্যাপ্ত শিক্ষক বর্তমান ফলে ভালো রেজাল্ট হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে পড়তে হয়, সে সব স্কুলে পাস–‌ফেল আছে। সেখানে কিন্তু ড্রপ আউট হয় না, কারণ সে সব স্কুলে পরিকাঠামো সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলির তুলনায় অনেক ভাল, সেখানে পড়াশোনার পরিবেশও অনেক ভাল। অথচ আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় সেই সব স্কুলে পড়ার সুযোগ সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েদের নেই, সেখানে শুধু অর্থবান পরিবারের সন্তানরাই পড়তে পারে। তাই গরিব ও মধ্যবিত্তদের সন্তানদের স্বার্থে পাস–‌ফেল প্রভাব ফেলবে। যতক্ষণ না সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলির উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে। সেই সঙ্গে শিশু শিক্ষার অধিকার আইনেও যেটুকু পরিকাঠামো, যে ছাত্র–‌শিক্ষক অনুপাতের কথা বলা হয়েছে তার ব্যবস্থা করতে হবে।

আমাদের মূল সমস্যাটা কোথায় জানেন? আমরা শিক্ষার মূল লক্ষ্য মানেই ভেবে নিয়েছি সরকারি চাকরি অর্জন করা। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সরকারী চাকুরী নয় বরং ব্যবসা, শিল্প, বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষ (কৃষি ও মৎস), পশুখামার প্রভৃতি প্রচুর স্বাধীন পেশার ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করা। তাই এই বিষয়ে সরকার ও জনগণের খেয়াল রাখতে হবে। সমস্যা হলে উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরি করতে হবে। আর এই সার্বিক পরিকাঠামোগুলি যেদিন উন্নত হবে সেদিন ফেল করে হা-হুতাশ বা আফশোষ করার দিনটিও চলে যাবে। শিক্ষাক্ষেত্রে যদি সার্বিক পরিকাঠামোর কথা না ভেবে শুধু পাশ-ফেল বিষয়েই নয় শিক্ষা সম্পর্কিত যে কোনো বিষয়ে রাজনৈতিক নেতা-নেতৃত্বদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হলে তার তিক্তফল কিন্তু ভোগ করবে খেটে খাওয়া অসহায় পরিবারগুলির সন্তানরাই।

লেখক:
প্রধান শিক্ষক
নূর জাহানারা স্মৃতি হাই মাদ্রাসা