সম্পাদকীয়, টিডিএন বাংলা : কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ভারতীয় সেনা কনভয়ের উপর হামলা চালিয়ে সন্ত্রাস বাদীরা প্রায়৫০ জন সেনাকে হত্যা করার পর উত্তাল উপমহাদেশের রাজনীতি। নিরীহ জওয়ানদের এভাবে বার বার প্রাণ দিতে হওয়ায় শোকে, দুঃখে, ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা দেশ। সব রাজনৈতিক দল এই পরিস্থিতিতে সরকারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু এক শ্রেণীর প্রচার মাধ্যম ও একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল ঘটনাকে যেভাবে মেরু করনের রাজনীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। যে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি দেশকে দুর্বল করতে চায় এতে তাদের উদ্যেশ্যই সফল হবে।

সেনা কনভয়ের উপর হামলা ও এতো বিশাল সংখ্যাক সেনা কর্মীর শাহাদাৎ শুধু উদ্বেগ ও দুঃখের বিষয় নয় রীতিমত দুশ্চিন্তার বিষয়ও বটে। কীভাবে এই ধরণের হামলা হল, এতো শক্তি থাকা সত্বেও কেন আমরা তা প্রতিহত করতে পারলামনা এসব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হওয়া একান্ত জরুরি। কিন্তু সরকার, মিডিয়া, বা জনগনের একটা বড় অংশের ভূমিকা দেখে মনে হচ্ছে যত দোষ নন্দ ঘোষের উপর চাপিয়ে তারা সস্তায় বাজিমাত করতে চায়। সব দায় বেচারি সংখ্যালঘু মুসলমান আর বেচারি নিরীহ কাশমিরীদের উপর চাপিয়ে তাদের উপর হামলা করে তারা নিজেদের বাহাদুরী দেখাতে চায়।

ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে কাশ্মীরি দের উপর হামলা শুরু হয়েছে। এর প্রতিবাদে ক্ষুব্দ কাশ্মীরিরা সকাল সন্ধ্যা হরতাল পালন করেছে। গোটা জম্মু জুড়ে কারফু থাকা সত্বেও কাশমিরীদের উপর হামলা হচ্ছে বলে অভিযোগ।সরকারী সচিবালয়ের কর্মীরা নিজেদের নিরাপত্তা চেয়ে সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। দিল্লী, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কাশমীরি ছাত্রদের উপর হামলা হচ্ছে। অবস্থার কথা বিবেচনা করে আলীগড় বিশ্ব বিদ্যালয় কাশ্মীরি ছাত্রদের ক্যাম্পাসের বাইরে বের হতে নিষেধ করেছেন। দিল্লী মাইনরিটি কমিশনের চেয়ারম্যান জাফরুল ইসলাম খান দিল্লী পুলিশ কমিশনার অমূল্য পটনায়ককে চিঠি দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন দিল্লিতে শুধু কাশ্মীরি ছাত্র নয় সাধারণ মুসলমানের উপর ও হামলা হচ্ছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী কিছু সংগঠন বেছে বেছে মুসলীম এলাকায় মিছিল করছে উত্তেজনাকর স্লোগান দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন জাফরুল ইসলাম। দেরদুনেও কাশমিরীদের উপর হামলা হচ্ছে এবং কাশমিরীদের বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও ছাত্রীদের ও টার্গেট করা হয়েছে।

কাশ্মীরি সবকয়টি রাজনৈতিক দল এই ধরণের হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। প্রবীণ নেতা ফারুখ আব্দুল্লা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন কাশ্মীর সমস্যা রাজনৈতিক সমস্যা । রাজনৈতিক ভাবে এর মুকাবিলা করতে হবে।আজ যদি নিরীহ কাশ্মীরি যুবকরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মার খেয়ে রাজ্যে ফিরে আসতে বাধ্য হয় তাহলে তারা প্রতিক্রিয়া শীল হয়ে উঠতে পারে। নিরীহ মানুষের উপর হামলা করা মানেই তাদেরকে উগ্রতার দিকে ঠেলে দেওয়া।ফারুক আব্দুল্লা কাশ্মীরি পন্ডিতদের দেওয়া সরকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।তিনি বলেন, আমরা আর কতদিন মার খেতে থাকব আর মারতে থাকব? আমাদের একটা সমাধানের রাস্তা খুঁজতে হবে। ফারুক আব্দুল্লা এই ধরণের ঘটনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ভুল নীতিকেই দায়ী করেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মাহবুবা মুফতী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন শিক্ষিত ও সভ্য নাগরিকরাও সব কাশ্মীরিকে এক পংক্তিতে ফেলে ভয়ানক প্রচার চালাচ্ছে। তাহলে এই জেহাদীদর সঙ্গে তাদের তফাৎ কোথায় বলে তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন।

জনগন জানতে চায় যে রাজ্যে নয় লাখ সেনা মোতায়েন রয়েছে, যেখানে দেশের সর্বোচ্চ সিকুরিটি এলার্ট সেখানে এধরণের ব্যার্থতা কেনো? আমরা কেনো অগ্রিম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারিনা। আমাদের সেনাদের প্রাণ যাবার পর কেনো আমরা হম্বি তম্বি করি? জনগণ আরো জানতে চায় যখনই কেন্দ্রীয় সরকার সংকটে পড়ে বারবার তখনই কেন সন্ত্রাসী হামলা হয়? পাকিস্তানেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। সরকার এসব দিকে খেয়াল না দিয়ে দাঙ্গা লাগিয়ে যুদ্ধ বাধিয়ে সস্তায় কেল্লা ফতে করতে চায়।এরকম হম্বি তম্বি শুনতে শুনতে জনগন বিরক্ত হয়ে গেছে। এখন মানুষ চায় একটা স্থায়ী সমাধান।

যুদ্ধ কোন সমস্যার সমাধান হতে পারেনা। যুদ্ধ আরো যুদ্ধের জন্ম দেয়।হিংসা কোন সমাধান নয়। হিংসা হিংসাকেই বৃদ্ধি করে। সেই সঙ্গে সঙ্গে এ কথা ও মনে রাখতে হবে উভয় দেশে সন্ত্রাসবাদীদের থেকে শান্তিকামী সাধারণ মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শান্তিকামী মানুষদের সঙ্গেই আলোচনা করতে হবে।তাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। সন্ত্রাসীদের কাছে শান্তি কী পরাজিত হবে?

কাশ্মীরি যুবকরা দেশের সম্পদ। তাদের বিরুদ্ধে পাটেলগান ছুড়ে, তাদের অন্ধ করে দিয়ে, তাদের হত্যা করে কী সন্ত্রাস দমানো যাবে? আমার দেশের যুব সমাজ কে মূল স্রোতে ফিরিয়ে না আনতে পারার ব্যার্থতা আমার।সেনাদের উপর গাড়ী বোমা হামলা যেমন উদ্বেগের তেমনি উদ্বেগের তার দায় নিরীহ জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া।মানুষকে বাদ দিয়ে কখনও দেশ হতে পারেনা। দেশ তো  মাটি নদী নালা আর গাছপালা নয়। জনগন কে নিয়েই দেশ।জনগনের নিরাপত্তার সাথে কোন সমঝোতা চলেনা। যারা সন্ত্রাসের পথ ধরেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু দেশ তাকে উপড়ে ফেলে দিলে হবেনা। সামনের লোক সভা নিরবাচনের কথা মাথায় রেখে শাষক দল  যে সস্তার রাজনীতি করতে চাচ্ছে তা ভয়ংকর।

           মুহাম্মদ নূরুদ্দীন, কলকাতা