সাইয়েদ আজহারউদ্দিন, টিডিএন বাংলা: প্রত্যেক বছরই আমার বন্ধু, সহকর্মীরা আমাকে রমজান কী? কীভাবে তা পালন করতে হয়? সিয়াম পালনের জন্য কতক্ষণ অভুক্ত থাকতে হয়? রমজান সংক্রান্ত এই ধরনের প্রশ্ন করে থাকেন। কিন্তু এই বছর আমার সামনে কোনও প্রশ্নই উপস্থাপিত হয়নি। কোভিড নাইনটিনের প্রকোপে বিশ্বের সমস্ত জায়গাতে নেমেছে স্তব্ধতা, বদলে দিয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। আজ আমরা সকলেই নিজ নিজ ঘরে আবদ্ধ।

পৃথিবীর অধিকাংশটাই আজ লকডাউন নামক পিঞ্জরে আবদ্ধ। অনেকেই হারিয়েছেন তাদের প্রিয় মানুষগুলিকে। স্বজন হারা সেই সমস্ত পরিবারের প্রতি অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে গভীর সমবেদনা জানিয়েই আমি ২০২০-র এই রমজান কে স্বাগত জানিয়েছি। বিশ্ব জুড়ে চলমান স্তব্ধতা, অতিমারির প্রকোপে বিশ্বের এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতির কারণে আমাদের অনেকেই মনে করেন আমাদের এই বছরের রমজান কে তার প্রকৃত রঙ অথবা স্বাদের সহিত উদযাপন করা উচিত নয় কোনভাবেই। কিন্তু আমার মতে এই ধারণাটা সম্পূর্ণ রূপে একটা ভ্রান্ত ধারণা এবং এই ব্যাপারে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কোনও কারণ আমি দেখিনা। রমজান কে তার প্রকৃত রুপ রসের সাথেই উদযাপন করা উচিত।
‌রমজান কী? ইসলামিক ক্যালেণ্ডারের নবম মাস হল রমজান মাস। প্রভাত থেকে শুরু করে গোধূলি লগ্ন পর্যন্ত একজন সুস্থ স্বাভাবিক ব্যক্তি সিয়াম অর্থাৎ রোজা পালন করে থাকে। এই পবিত্র মাসে একজন বিশ্বাসী মুসলমান উষার আগে খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে তার উপবাস শুরু করেন যা “সেহরী” নামে পরিচিত এবং গোধূলিতে খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে তার উপবাস ভঙ্গ করে থাকেন যা” ইফতার”নামে পরিচিত।

“এ কতিপয় নির্দিষ্ট দিনের রোযা। যদি তোমাদের কেউ হয়ে থাকে রোগগ্রস্ত অথবা মুসাফির তাহলে সে যেন অন্য দিনগুলোয় এই সংখ্যা পূর্ণ করে। আর যাদের রোযা রাখার সামর্থ আছে (এরপরও রাখে না) তারা যেন ফিদিয়া দেয়। একটি রোযার ফিদিয়া একজন মিসকিনকে খাওয়ানো। আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও সানন্দে কিছু বেশী সৎকাজ করে, তা তার জন্য ভালো। তবে যদি তোমরা সঠিক বিষয় অনুধাবন করে থাকো। তাহলে তোমাদের জন্য রোযা রাখাই ভালো।(আল কুরআন ২:১৮৪)

সিয়াম আমাদের পানাহার, বিভিন্ন মন্দ কাজ এবং ক্রোধ থেকে বিরত রাখে। সিয়ামের মাধ্যমে আমরা ক্ষুধার্তদের ক্ষুধাকে অনুভব করতে পারি। চলমান এই লকডাউনে অনেকেই আজ অভাবগ্রস্তে পরিণত হয়েছে।আসুন আমরা নিজেরা তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই এবং অন্যকেও উদ্বুদ্ধ করি। এই রমজান হোক অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করার রমজান। নবী মুহাম্মদ(ﷺ) থেকে বর্ণিত হয়েছে “যে রমযান মাসে ঈমান সহকারে ও সাওয়াবের আশায় সিয়াম পালন করবে তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।” (আল হাদিস)

রমজান মাসে কেন সিয়াম পালন করতে হয়? মহিমান্বিত আল কুরআন এই মাসেই অবতীর্ণ হয়।”রমযানের মাস, এ মাসেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য পুরোপুরি হিদায়াত এবং এমন দ্ব্যর্থহীন শিক্ষা সম্বলিত, যা সত্য-সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয়।” (আল কুরআন ২:১৮৫) সিয়াম ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি এবং বান্দার সাথে প্রভুর নৈকট্য লাভের এক অন্যতম পন্থা এবং দানের মাধ্যমে দারিদ্রের সাহায্য করার এক চমৎকার উপায়।

সিয়াম পালনের আসল উদ্দেশ্য হলো সমস্ত মন্দ থেকে আত্মসংযম করা এবং নিজেকে প্রভুর নিকট পরিপূর্ণ রূপে আত্মসমর্পণ করা। আর এক দিক থেকে রমজান প্রশিক্ষণ এবং নিজের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের এক উত্তম উপায় হিসাবেও গণ্য হয়।

কিন্তু তিক্ত হলেও একটি সত্য ঘটনা হলো সিয়াম পালনকারী অধিকাংশ ব্যক্তি সিয়ামকে এই সমাজের কাছে ভুল ভাবে উপস্থাপন করে থাকে এবং তারা ভাবে তারা যেটা করে সেটাই ইসলাম। তাদের ভুল উপস্থাপনের কারণে অমুসলিমদের কাছে, রমজান কুরআনের জীবন গড়ার, কুরআন পাঠের অথবা অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর মাস না হয়ে কেনাকাটার ধুম পড়ে যাওয়ার অথবা হালিম সহ হরেক রকমের খাদ্য সম্ভার সাজানো এক আড়ম্বরপূর্ণ মাস হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে। কিন্তু কুরআন কেবল মুসলিম জাতির জন্য নয়, সমগ্র মানব জাতির জন্য প্রেরিত হয়েছে। আসুন এই মাসকে বলি কুরআন এর মাস।

অন্যান্য মাসের থেকে রমজান মাস কেন পৃথক হিসেবে গণ্য হয়? উষা থেকে গোধূলি লগ্ন পর্যন্ত উপবাসের সাথে সাথে এই পবিত্র মাসে একটি বিশেষ প্রার্থনা হয়ে থাকে যা ‘তারবিহ’ নামে পরিচিত। একজন বিশ্বাসীর জন্য বছরের তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা বাধ্যতামূলক। আল্লাহকে খুশি করার জন্য তারবিহ নামে এই বিশেষ প্রার্থনা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক ব্যাপার, কোন প্রকারের বাধ্যবাধকতা নেয়। বিধ্বংসী কোভিড নাইনটিনের প্রকোপে চলমান এই সংকটাপন্ন অবস্থাতে আমাদের অযথা বাইরে ঘোরাঘুরি না করে নিজ গৃহে আমরা ‘তারবিহ’ এর নামাজ আদায় করতে পারি। এই লকডাউনের সীমাহীন অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের গৃহে ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহ্‌র নিকট করোনা মুক্ত বিশ্বের জন্য প্রার্থনা করতে পারি। আসুন সকলে করোনা মুক্ত এক সুস্থ পৃথিবীর জন্য প্রভুর নিকট প্রার্থনা করি।

এই মাসের শেষ দশ রাত আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু এই দশ রাতের এক রাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। এই মহিমান্বিত রাত লাইলাতুল কদর নামে পরিচিত।

“আমি এ (কুরআন) নাযিল করেছি কদরের রাতে। তুমি কি জানো, কদরের রাত কি? কদরের রাত হাজার মাসের চাইতেও বেশী ভালো। ফেরেশতারা ও রূহ এই রাতে তাদের রবের অনুমতিক্রমে প্রত্যেকটি হুকুম নিয়ে নাযিল হয়। এ রাতটি পুরোপুরি শান্তিময় ফজরের উদয় পর্যন্ত।” (সুরা কাদর)

লকডাউনের বিধি নিষেধ মান্য করে চলুন। আর এটাই বেশি বেশি প্রভুর নিকট প্রার্থনা করার জন্য উপযুক্ত সময়। রমজানের শেষ দশ রাতে ইবাদত বন্দেগীতে নিযুক্ত করে লাইলাতুল কদরের সন্ধান করুন, ইতিকাফ (আল্লাহর সাথে কিছু সময় একাকিত্বে ব্যায় করা) পালন করুন।

মুসলিম সম্প্রদায় কীভাবে রমজান উদযাপন করে থাকে? ভিন্ন সংস্কৃতির ভিন্ন প্রথা অনুযায়ী রমজান পালিত হয়ে থাকে। ভিন্ন রকমের খাদ্য প্রস্তুত করে মাঝে মধ্যে প্রতিবেশী,বন্ধু, পরিবারের পরিজনদের সাথে ইফতারে সামিল হয়ে রমজান পালন করা হয়। আবার কখনো গরীব দুঃখীদের ইফতার এবং রাতের খাবারে আমন্ত্রণ করার মাধ্যমে অথবা তাদের জাকাত প্রদানের মাধ্যমে রমজান উদযাপন করা হয়ে থাকে। লকডাউনের কারণে আমরা পরিবার, বন্ধুদের সাথে মিলিত হতে পারছিনা ঠিকই কিন্তু টেকনোলজির সহায়তায় আমরা আমাদের প্রিয়জনদের কুরআন, হাদিস থেকে বিভিন্ন উক্তি ও রোজার বার্তা প্রেরণ করে শুভেচ্ছা জানাতে পারি। মহামারীর এই সংকটকালীন অবস্থা দূর হলে আমরা অবশ্যই আমাদের প্রিয়জনদের সাথে পূর্ণ মিলনের পরিকল্পনা করতে পারি।

সিয়ামের মত যাকাতও ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে উল্লেখিত এক স্তম্ভ। প্রতিটি মুসলিমের জন্য তার আয়ের আড়াই শতাংশ দানের জন্য ব্যায় করা বাধ্যতামূলক। এই যাকাত দ্বীনের কাজে নিযুক্ত কর্মচারী, অভাবগ্রস্ত, নও মুসলিম, আল্লাহর পথে কর্মরত ব্যক্তি ও মুসাফিরদের মধ্যে বণ্টিত করা হয়। যদিও যাকাতের সাথে রমজানের কোন প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেয় কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম তাদের দানের অধিকাংশই এই পবিত্র রমজান মাসে দিয়ে থাকেন। তাই আসুন লকডাউনের স্তব্ধতার এই কঠিন পরিস্থিতিতে অভাবগ্রস্ত দের অভাব দূরীভূত করার উদ্দেশ্যে অথবা ছোট ব্যবসায়ীদের ব্যাবসা সচল করার উদ্দেশ্যে আমরা আমাদের যাকাত প্রদান করি।

ঈদুল ফিতারের প্রয়োজনীয়তা কী?
পবিত্র রমজান মাসের অন্তিম লগ্নে বিশ্বাসী মুসলমানগণ যে উৎসব উদযাপন করে থাকে তাহাই ঈদুল ফিতার নামে পরিচিত। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম পালনের পর মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ঈদুল ফিতার অর্থাৎ দানের উৎসব পালিত হয়ে থাকে। ফিতারাও একপ্রকার দান, যা পরিবারের প্রধান তার পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মাথা পিছু নির্ধারিত অর্থ ঈদুল ফিতারের নামাজ আদায়ের পূর্বে দান করেন, ইহা ঐচ্ছিক নয়, বাধ্যতামূলক।

একদা ঈদুল ফিতারের দিন নবী মুহাম্মদ(ﷺ) যুহাইর বিন সাগির নামক এক বালকের পাশ থেকে অতিক্রম করছিলেন, বালকটি ফুটপাতের ধারে ক্রন্দনরত অবস্থায় বসে ছিল। নবী মুহাম্মদ(ﷺ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন,” বাছা তুমি কাঁদছো কেন? এই খুশির দিনে তুমি কেন কাঁদছো? প্রত্যত্তুরে বালকটি তাঁকে বললো, “এই খুশির দিনে সকলে কতো আনন্দ করছে, আমার বন্ধুরা নতুন পোশাক পরিধান করেছে, সুস্বাদু খাবার গ্রহণ করছে। কিন্তু আমি অনাথ, আমার নতুন পোশাক নেই, আমার কাছে না আছে যাওয়ার কোন জায়গা আর না আছে খাবার কিছু।” নবী মুহাম্মদ(ﷺ) সমস্তটা শুনে স্নেহ মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, ” আমি তোমার কষ্ট অনুভব করতে পারছি। আমিও আমার পিতা-মাতা কে হারিয়ে ছিলাম যখন আমি বালক ছিলাম। তারপর হেসে সেই বালককে বললেন, “আমি যদি তোমার নতুন পিতা হয়, আমার স্ত্রী যদি তোমার নতুন মাতা এবং আমার কন্যা যদি তোমার নতুন বোন হয় তাহলে কী তুমি খুশি হবে? নতুন আশার আনন্দে উৎফুল্ল কণ্ঠে সেই সর্বহারা বালকটি বলে উঠলো “হ্যাঁ, অবশ্যই! সারা জাহানে এর থেকে আর কোন খুশির ব্যাপার নেয়।” সেই খুশির ঈদের দিন নবী মুহাম্মদ(ﷺ) সেই বালককে সস্নেহে নিজে গৃহে নিয়ে গিয়ে তাকে নতুন পোশাক এবং সুস্বাদু খাবার দিলেন। সেই দিন সেই অনাথ পথ শিশুটি নবী মুহাম্মদের(ﷺ) স্নেহে সমগ্র পৃথিবী ফিরে পেয়েছিল।

রমজান কেবল কেনাকাটার ধুম লাগানোর বা সুস্বাদু খাবার পদের সমারোহের মাস না, অন্যদের প্রতি খেয়াল রাখার এবং আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের জন্য এই পবিত্র মাসকে মানব জাতির জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। মহামারীর পরবর্তী (সম্ভবত রমজানের পরে) সময়েও নিজের কল্যাণকর কাজ অব্যাহত রাখুন। কেবল অভাবী, অসহায়দের নয়,নিজ গৃহে মা-বোন, স্ত্রী-কন্যা কে সংসারের কাজে সহযোগিতা করুন, ইহা প্রয়োজন ও বটে। আপনি নিজে পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব পড়বে আপনার পরিবারের উপর, আপনার পরিবার যদি পরিবর্তিত হয় তাহলে তার প্রভাব পড়বে আপনার এলাকা তথা সমাজে, যা বিশ্বের বুকে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। এভাবেজ আপনার নিজের পরিবর্তন পরোক্ষ ভাবে বিশ্বের পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

(লেখক : বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক,
অনুবাদ: আফরিদা খাতুন আঁখি)