সেখ মুহাব্বত : ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোনজন ?

কান্ডরী বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’

আগামি ২৫শে মে বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী। আর তাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করে ময়দানে নেমেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ। আগামি ২৫ শে মে তারা নজরুল জয়ন্তী পালন করবে। এতেই রীতিমতো হতবাক কবি সসাহিত্যিক এবং এমনকি নজরুল পরিবারও। আরএসএসের যুক্তি নজরুর ইসলাম মুসলিম হলেও আদতে হিন্দু ছিলেন। কেননা তিনি ছেলে মেয়েদের হিন্দু নাম রেখেছিলেন, লিখেছেন ৫০০ এর বেশি শ্যামা সঙ্গীত। তাই আরএসএসের এই সিদ্ধান্ত।
কিন্তু ভাবতে অবাক লাগছে যে মানুষটি সারা জীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে গেলেন আর তাঁকে নিয়ে এমন ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু করল আরএসএস। এখন নজরুল ইসলাম বেঁচে থাকলে হয়তো তিনি এদের বিরুদ্ধে তাঁর ব্রজ্য কলম ধরে বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন। তিনি যে নিজেই সাম্প্রদায়িকতার ঘোর বিরোধী ছিলেন তা তাঁর লেখনিতেই স্পষ্ট। তাঁর বৈশিষ্ট্য তিনি রাজনীতিবিদ, মানবপ্রেমিক, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষানুরাগী, অসাম্প্রদায়িক ভারতবর্ষের রূপকার। তাঁর কবিতা ও গান হৃদয় অনুরণনের ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের। তাঁর কবিতা ও গান বিদ্রোহের। তাঁর কবিতা ও গান অসাম্প্রদায়িকতার। তাঁর কবিতা ও গান পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙ্গার। তাঁর কবিতা ও গান স্বাধীনতার। তাঁর কবিতা ও গান মুক্তির। তাঁর কবিতা ও গান মনুষ্যত্ব বোধের। তাঁর কবিতা ও গান বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের ও বিশ্বের সকল সুন্দরের, সকল মানুষের। তিনি লিখেছেন-

“মোরা একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু মুসলমান।”

“বদনা গাড়ুতে গলাগলি করে, নব প্যাক্টের আশনাই।

মুসলমানের হাতে নাই ছুরি, হিন্দুর হাতে বাশ নাই।”

সকল মানুষকে শুধু মানুষ পরিচয়ে তিনি দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি বলেছিলেন —

‘সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শুন এক মিলনের বাঁশী।’

অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যবাদী আদর্শ তিনি লালন করেছেন সারাজীবন। তাই ১৯৪১ সালের এপ্রিলে কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র রজতজয়ন্তী উৎসবে সভাপতি রূপে তিনি ভাষণ দিয়েছিলেন এই ভাষায়—

‘হিন্দু-মুসলমানের দিনরাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র্য, ঋণ, অভাব— অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাঙ্কে কোটি কোটি টাকা পাষাণস্তূপের মত জমা হয়ে আছে। এ অসাম্য ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে সংগীতে কর্মজীবনে অভেদ ও সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। আমি যশ চাই না, খ্যাতি চাই না, প্রতিষ্ঠা চাই না, নেতৃত্ব চাই না। জীবন আমার যত দুঃখময়ই হোক, আনন্দের গান-বেদনার গান গেয়ে যাব আমি। দিয়ে যাব নিজেকে নিঃশেষ করে সকলের মাঝে বিলিয়ে। সকলের বাঁচার মাঝে থাকবো আমি বেঁচে। এই আমার ব্রত, এই আমার সাধনা, এই আমার তপস্যা।’’

‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় ভারতভূমির স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে তীব্রকণ্ঠে কবি ঘোষণা করলেন-

‘’হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোনজন?
কান্ডারী বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’’

‘’কুলি মজুর’’ কবিতায় অসাম্প্রদায়িক কবি সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন-

‘সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশি।’

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য সব সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করতে কবি তাঁর দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় লিখেছিলেন-

‘’এস ভাই হিন্দু। এস মুসলমান। এস বৌদ্ধ। এস ক্রিশ্চিয়ান। আজ আমরা সব গণ্ডী কাটাইয়া, সব সঙ্কীর্ণতা, সব মিথ্যা, সব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি। আজ আমরা আর কলহ করিব না। চাহিয়া দেখ, পাশে তোমাদের মহাশয়নে শায়িত ঐ বরি ভ্রাতৃগণের শব। ঐ গোরস্থান- ঐ শ্মশান ভূমিতে শোন শোন তাহাদের তরুণ আত্মার অতৃপ্ত ক্রন্দন।’’

সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় সারা ভারতবর্ষের মানুষকে স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য জাগিয়ে তোলাই ছিল তাঁর ওই বক্তব্যের মূল সুর ও উদ্দেশ্য। মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ, জাতিতে জাতিতে বিভেদ, সম্প্রদায়গত দাঙ্গা-সংঘাত বিশেষ করে হিন্দু-মুসলিম জাতিগত দ্বন্দ্বে নজরুল সংক্ষুব্ধ ও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। তাই সকল সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে উঠে তিনি ঘোষণা করলেন- ‘’গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি
সব দেশে সব কালে ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’’ (মানুষ)

তিনি দেখতে চেয়েছিলেন ভারতবর্ষের সব সম্প্রদায়ের মানুষের মহামিলন এবং একতা। আর তাই তিনি সব ধর্মের বিভেদ ঘুচিয়ে অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়- ‘গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে
হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।’ (সাম্যবাদী)

শুধু তাই নয়, তিনি ইসলামী গজল-গান রচনার পাশাপাশি অসংখ্য শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তন ও দেবস্তুতিমূলক সঙ্গীত রচনা করে হিন্দু-মুসলিমের সমান ভালবাসায় সিক্ত হন।

অন্যদিকে হিন্দু-মুসলিম কুসংস্কারপূর্ণ কিছু ধর্মান্ধ মানুষের সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে নতুন সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন। তাই তিনি বললেন-

‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নতুন সৃজন বেদন
আসছে নবীন জীবনহারা অসুন্দরের করতে ছেদন।’

‘আমার সুন্দর’ প্রবন্ধে নজরুল বলেছেন, ‘আমি মানুষকে ভালোবাসতে পেরেছি। জাতি-ধর্ম-ভেদ আমার কোন দিনও ছিল না, আজও নেই আমাকে কোন দিন তাই কোন হিন্দু ঘৃণা করেননি। ব্রাহ্মণেরাও ঘরে ডেকে আমাকে পাশে বসিয়ে খেয়েছেন ও খাইয়েছেন।’
যেখানে মানবতা ভূলুণ্ঠিত সেখানে তাঁর ‘বিষের বাঁশি’ বেঁজে উঠেছে এবং মানবতার সুর তুলেছে। ব্রিটিশ শাসকের প্রতি কবির অভিশাপ এবং ক্ষুব্ধ উচ্চারণ-
‘প্রার্থনা করো, যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস
যেন লেখা হয়, আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ।

নজরুল তাঁর লেখায় ভন্ড-ধর্মব্যবসায়ীদের আঘাত হেনেছেন তীব্রভাবে-

‘‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা রয়েছি বসে
বিবি তালাকের মাছলা খুঁজি হাদিস, কোরান হাদিস চষে।”

সমালোচকরা তাঁকে বলত হিন্দু কবি। এ বিষয়ে নজরুলের বক্তব্য ‘ আমি মুসলমান- কিন্তু আমার কবিতা সকল দেশের, সকল কালের এবং সকল জাতির। কবিকে হিন্দু-কবি, মুসলমান-কবি ইত্যাদি বলে বিচার করতে গিয়েই এত ভুলের সৃষ্টি।’
(২৩শে অগ্রহায়ণ ১৩৩২, আন্ওয়ার হোসেনকে লেখা চিঠি )।

কবি এভাবে নিজেকে এবং তাঁর লেখনীকে কোন সম্প্রদায়, জাতি, গোষ্ঠী, দল, দেশ, ধর্ম কোনকিছুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। আর তাই তিনি হয়ে উঠেছেন সকল কালের, সকল জাতির, সকল দেশের, সকল মানুষের সর্বোপরি সমগ্র বিশ্বের। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে উদার ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি লালনকারী নজরুল হয়েছিলেন সকল শ্রেণী ও জাতির মিলন দূত। আর তাই তো কবি অন্নদা শংকর রায় নজরুলকে নিয়ে লিখেছেন-
‘ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/আর সব কিছু/ভাগ হয়ে গেছে/শুধু ভাগ হয়নি কো/ নজরুল।’