প্রতীকী
MD Nuruddin
মুহাম্মদ নুরুদ্দীন

মুহাম্মদ নূরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা: মিশ্রিত এলাকা,পরিচিত লোকজন, সকাল সন্ধ্যায় রীতিমত দেখাশোনা,কুশল বিনিময়, পারস্পরিক সুখ দুঃখ ভাগা ভাগী করে নিয়ে যারা এতদিন কালাতিপাত করে আসছিল সেই রকম এক এলাকা দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ কানে এলো, “বানাচ্ছ বানাও, ভালো করে বানাও দুদিন পর তো সব আমাদেরই হবে।”। হঠাৎ কথাটা কানে একটু বেসুরো লাগলো, পিছন দিকে তাকিয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলাম। দেখলাম, মাস্টার মশাই ঘর বানাচ্ছেন। গ্রামের মানুষ, চাষার ছেলে, অতি কষ্টে লেখাপড়া শিখে একটা চাকরী জোগাড় করেছে। সংসারের টানা টানি সামলে জেলা শহরে এক টুকরো জমিও সংগ্রহ করেছে বহুদিন আগে। এতোদিন কাজে হাত দিতে পারেনি। বেচারা বাধ্য হয়ে এবার একটা আস্তানা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ছেলে মেয়ে বড় হচ্ছে আর তো একঘরে থাকা চলেনা। এই স্বাভাবিক জীবন চিত্রের কাছে কথাটা একটু বেসুরো ঠেকলো। এই বেসুরো তাল আজকের আলোচনার মুখ্য ভাবনা।

একজন ছাপোষা প্রতিবেশীর কন্ঠে চেনা সূর হঠাৎ বেসুরো হয়ে উঠলো কেনো। অনেকে ভাবতে পারেন এ আবার এমন কী কথা যা নিয়ে এত আলোচনা।তাই বিষয়টা একটু খুলে বলা ভালো। আসাম থেকে পূর্ব ভারত এন আর সি নিয়ে উত্তাল। আসামে পঞ্চাশ লক্ষ মানুষকে তাড়ানো হবে। মোট তিন কোটি জনসংখ্যার পাহাড় ঘেরা এই ছোট্ট রাজ্যটিতে এন আর সির দাপট জন মনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। আসার বাণী শোনানো হয়েছে – মুসলমানরাই বিদেশী, বহিরাগত। তাদের সবাইকে আসাম থেকে সরানো হবে। তাতে কার সর্বনাশ হবে, তারা দেশ হারিয়ে, ভিটে মাটি ছাড়া হয়ে কোথায় যাবে এসব চিন্তা মাথায় না এসে এক শ্রেণির মানুষের জিভে জল এসে যায়। আর এতে তো আমার পৌষ মাস।কার সর্বনাশ হলো দেখে আমার লাভ নেই।পঞ্চাশ লক্ষ মানুষকে হঠাতে পারলে তাদের ভিটে মাটি, বাগান বাড়ি, সব তো আমাদের। আরে বাছতে বাছতে এখন পঞ্চাশটা এসে ঠেকেছে উনিশে। তাও বা কম কী? হোক না উনিশ লাখ। ফ্রী যখন পাবো তখন যা পাবো সবটাই লাভ। লোক সভা নির্বাচনের আগে ঠিক এই কথাটাই কানে কানে ফিসফিসিয়ে কয়ে দিয়েছিল একটি দলের নেতা। আসামে এন আর সি হচ্ছে, বাংলায়ও হবে, সারা দেশে হবে। বাংলা থেকে দু কোটি মানুষকে বিতাড়িত করার ঘোষণা তারা ইতিমধ্যে দিয়ে রেখেছে। এমন মহাপুরুষ কেইবা আছে এর পরও তার জিভে জল আসবেনা?
স্বাভাবিকভাবে লক লকিয়ে উঠছে লালসার ফেনা। লোভ এমন বস্তু যা নিমেষের মধ্যে ভুলিয়ে দেয় যাবতীয় মানবতাবোধ, ন্যায় নীতি, ইনসাফ। নিমেষের মধ্যে আপনাকে পর করে দেয় পরকে করে আপন। আর মানব চরিত্রের ঠিক এই দুর্বল জায়গাটাকে বেছে নিয়েছে অমিত – মোদিরা। একদিকে ধর্মের জিগির, আর একদিকে লালসায় ইন্ধন। এই দুই মরীচিকার মায়াজালে আচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে দেশের জনগণকে।
জ্বালানী গ্যাসের দাম বাড়ছে বাড়ুকনা, বেকারত্ব আকাশ ছুঁয়েছে, তাতেকি? কল কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? ছাড়ো তো ওসব রাহুল মার্কা প্যান প্যানানি। দেশ পেয়েছে এক লৌহ মার্কা প্রধানমন্ত্রী। ভারত এবার জগৎ সভার শ্রেষ্ঠ আসন নিতে চলেছে বলে কথা। এই সময় ওই সব জিডিপি আর আর্থিক মন্দার গল্প ভাল্লাগেনা।
এহেন জাতীয়তাবাদী সরকার এদেশ কখনও দেখেনি। এই এক সুযোগ। এসুযোগ হারালে দ্বিতীয়বার পাওয়া যাবে কীনা সন্দেহ। হোকনা নোট বন্দীর নামে দেশ বন্দক দেওয়ার ব্যবস্থা,আমরা দেশের নাগরিক নিজেদের কুরবান দিতে প্রস্তুত আছি। নিজেদের ঘাম ঝরানো টাকা রাতা রাতি ছেঁড়া কাগজে পরিণত হয়েছে তো কী হয়েছে? দেশের জন্য এতটুকু ত্যাগ স্বীকার করা যাবেনা?
নোটবন্দিতে কালো টাকা উদ্ধার হয়নি, আবার ক্ষুদ্র ব্যাবসা ঝাড় খেয়েছে। রাতারাতি পড়ে যাচ্ছে টাকার দাম। ভারত বাংলাদেশ তো এখন এক সারিতে। চালান-চোরা চালানে যাহোক দু পয়সা দেখতে পেতো হাভাতে বাঙালি তাতেও বালি পড়ে গেল। আন্তর্জাতিক বাজারে টাকার দাম কমছে। দেশ জুড়ে চলছে অর্থনৈতিক মন্দা। পাঁচ শতাংশে নেমে এসেছে জিডিপি বৃদ্ধির হার।গাড়ী, আবাসন সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান ধুঁকছে। কোনো দাওয়াই কাজ দিচ্ছেনা। কৃষি নীতির ত্রুটি তে সাংঘাতিক ভাবে ধুঁকছে কৃষক সমাজ।কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য নেই। গ্রাম গঞ্জে উপার্জন কমেছে সাধারণ মানুষের । দেশের পঞ্চাশ শতাংশ মানুষের উপর দারিদ্র্য চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রিজার্ভ ব্যাংক থেকে নিয়ম বহির্ভুতভাবে সরকার ১.৭৬ লক্ষ কোটি টাকা নিচ্ছে ।বড় বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলি জুড়ে দেওয়া হচ্ছে । সরকারি ক্ষেত্র গুলিকে নিলামে তোলা হচ্ছে। কোন কিছুতেই টনক নড়ে না আমাদের। আমরা যে তার আগে ধর্মান্ধতা আর মেকি জাতীয়তাবাদী টনিক খেয়ে বসে আছি। তার উপর কাশ্মীরের সুন্দরী নারী, আর এন আর সি তে পাওয়া মুসলমান দের ফাউ সম্পত্তি পাওয়ার লালসা তো আছেই।
দেশ উচ্ছন্নে যাচ্ছে অথচ মোদী শাহ রা তালাক ,গোরক্ষা আর গণ পিটুনি দিয়ে দলিত মুসলিমদের শায়েস্তা করার নেশায় বুঁদ। রাম মন্দিরের ললিপপ এখনো তারা সমান ভাবে দেখিয়ে যাচ্ছে জনগণকে। সততা , ন্যায়, নীতি, সুবিচার, আইনের শাসন এসবের আর কোন মূল্য নেই। নাগরিক পরিষেবা, দেশের উন্নয়ন, কৃষক শ্রমিক গরীব মানুষদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার কোন ব্যাপার তাদের মধ্যে নেই। শিক্ষা ,স্বাস্থ্য, নিরাপত্যা জনগনের কোন কিছুই দেওয়ার দরকার নেই।শুধু ধর্মের জিগির আর জাতীয়তাবাদের ললিপপ দেখিয়ে গেলেই হবে। এভাবেই আমরা জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন পেয়ে যাবোই যাবো। (প্রাবন্ধিক: বিশিষ্ট শিশু পাঠ্য বইয়ের লেখক)