মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী, টিডিএন বাংলা: পৃথিবীতে অজ্ঞাত এক মহামারি দেখা দিয়েছে, বিশেষজ্ঞরা যার নাম করােনা ভাইরাস দিয়েছেন। পৃথিবীর মানুষ ইতিপূর্বে এহেন দুরারোগ্য সম্মুখীন হয়নি। শতাধিক দেশের নাগরিক এই রােগে আক্রান্ত। বেহাল অবস্থা। এর মধ্যে যতটুকু করা যায়, দেশ – বিদেশের সরকার পক্ষ সেটা করছে। কিন্তু এই মরণরােগের কোনাে ওষুধ বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে পারেনি বা এর পূর্বাভাসও দিতে সক্ষম হয়নি। আমাদের দেশের কেন্দ্রীয় সরকার সংক্রমণ প্রতিরােধের বিষয়ে প্রচারাভিযান চালানাের কথা ঘোষণা করেছে। একই ভাবে আমাদের রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী সতর্কতামূলক বিষয়ের জন্য ৬-৭ দফা কর্মসূচী ঘােষণা করেছেন। সকলের পক্ষে যা মেনে চলা প্রয়ােজন।

কুরআনে করীম ও হাদীস শরীফে তথা দ্বীন – শরীয়তে ‘ উন তথা মহামারির বিষয়ে উল্লেখ ও সতৰ্কতার পথও নবীজি সা . এরশাদ করছেন। কোথাও মহামারি পরিলক্ষিত হলে সেখানে যেন বাইরের লােক না পৌঁছায়, আক্রান্ত এলাকার জনগণও যেন বাইরে না আসেন। এই সতর্কবাণী নবীজি সা. হাদীস শরীফে বলেছেন। বুখারী শরীফের হাদীসে আছে, হযরত আয়েশা রা. বলেন যে, নবীজি সা. মহামারির (ওয়াবা’) বিষয়ে দু’য়া করে বলেছিলেন, এই জ্বর এবং মহামারি বসতিবিহীন জঙ্গল আল-যুহার দিকে পাঠিয়ে দিন। আল্লাহ নবীজি সা.- এর দুয়া কবুল করেছিলেন এবং সেই জ্বর থেকে মদীনাবাসী মুক্তি পেয়েছিলেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. কর্তৃক বর্ণিত, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. একদা শ্যামদেশের ( অধুনা সিরিয়া ) উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। তিনি যখন সার্গ নামক স্থানে পৌঁছালেন তখন আবু উবাইদা বিন আল – জাররাহ ও তার সঙ্গীরা ফারুখ-এ-আযমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানান যে, শ্যামদেশের মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে। এরপর আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর রা. মুহাজির, আনসার ও বর্ষীয়ান কুরাইশদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে মদীনা প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত ঘােষণা করেন। এরপর তিনি আল্লাহকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন ও মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

আমরা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের মানুষ। আল্লাহর হুকুম মেনে পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ যারা আদায় করেন তাদের দিনে পনেরােবার মুখমন্ডল পানিতে ধােওয়া, মুখের ভিতরে মুখ ভরে পানি নিয়ে কুলি করা, নাক পরিষ্কার করা, পানি দিয়ে চোখ ধােওয়া, দুই হাতের কনুই পর্যন্ত ধােওয়া, পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ধােওয়ার নির্দেশ ওযুর মধ্যে দেওয়া হয়েছে। ভালোভাবে ওজু করালে শরীর – স্বাস্থ্য বহু জীবাণু থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। একইভাবে প্রাতঃরাশ , দুপুরের লাঞ্চ, বিকালের চা – নাস্তা, নৈশভােজের পুর্বে মুখ ও দুই হাতের কজি পর্যন্ত পানি দিয়ে ধুয়ে খাদ্যগ্রহণ করাটা সতর্কতার অনুষঙ্গ। মসজিদের মধ্যে অনেক গামছা, কাপড় ঝোলানাে থাকে। এর পর তাতে অনেকে মুখ মােছেন। এটা পরিহার করতে হবে। নিজের রুমাল বা কাপড় দিয়ে মুখ হাত মুছবেন। নামায এবং জামাতের পাবন্দী তথা মসজিদে বসে দুয়ার আয়ােজন করা প্রয়োজন।

সাধারণত কোনাে মসজিদ থেকে সংক্রামক ব্যাধি ছড়ায় বলে আমাদের জানা নেই। দিনের বেলায় বা বাদ মাগরিব মসজিদে বসে দুয়া ইউনুস পড়া, কলেমা ‘তাইয়েবা পড়া তথা বালা – মুসীবত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে ভিক্ষা চাওয়া, তওবা-ইসতেগফার করা, সাদকাহ দেওয়া প্রয়ােজন। নিজ নিজ বাড়িতে রাত্রিবেলা ঘুমানাের আগে সকলে মিলে দুয়া ইউনস ন্যূনপক্ষে ৪০ বার পাঠ করে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের নিকট সুস্বাস্থ্য কামনা এবং মহামারি থেকে রক্ষার জন্য দু’য়া চাওয়া প্রয়ােজন। একইভাবে ফজর ও মাগরিব বাদ তিনবার করে ‘বিসমিল্লাহিল্লাযি লা ইয়া দ্বুররু মাআ’সমিহি শাইয়ুন ফীল আরদ্বি ওয়ালা- ফীসসামায়ি ওয়া হুয়াস সামিউল আ-লীম’ পড়ে আমাদের শরীরে ফুঁক দিয়ে ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট দুয়া করি। নিজ নিজ এলাকার মানুষ তথা আমাদের দেশ তথা সারা পৃথিবীর মানুষকে যাতে আল্লাহ সুস্থ রাখেন তার জন্য দুয়া করি।

বিজ্ঞান – প্রযুক্তি মানুষকে জন্ম দেয়নি। ঔষধ প্রতিরােধ ব্যবস্থা একটা ওসীলা। মানুষের জীবন-মরণ আল্লাহরই হাতে। সৃষ্টিজীবের প্রতি অমানবিক জুলুম- অত্যাচার ও অহংকার পৃথিবীতে বেড়ে গেলে এই ধরনের বিপর্যয় দেখা যায়। এই কারণে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা, তার হক মেনে চলার প্রচেষ্টা আমাদের করতে হবে।

(লেখক: রাজ্যের গ্রন্থাগার মন্ত্রী ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের রাজ্য সভাপতি)