তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা : বসন্ত পঞ্চমীর সকাল মানেই প্রথম ভালোবাসার কথা মুখ ফুটে বলার দিন। ভোরবেলায় ওঠার অভ্যাস তৈরি হয়নি। তবু মা জোর করে উঠিয়ে দিয়েছে। বাড়ির খুদে সদস্যটির আজ যে হাতেখড়ি। স্লেট-পেনসিলে অ আ ক খ। তারপর তড়তড়িয়ে ছোটাতে হবে কেরিয়ার গ্রাফ। আজ তারই হাতেখড়ি। সরস্বতী পুজো মানে কৈশোরে আর একটু রঙিন হওয়ার দিন। মুখ ফুটে ভালোবাসার কথা বলার দিন। প্রথম শাড়ি পরা কিশোরীর নিবিষ্ট অঞ্জলি দেওয়ার সময় আড় চোখে তাঁরই ধ্যানে মগ্ন সদ্য গোঁফের রেখা গজানো কলেজ ছাত্রটি। দিন বদলেছে। বদলেছে লাইফ স্টাইল। এরকই কিছু টুকরো মুহূর্ত আজও অমলিন। তবে অনেক মুহূর্তই আজ স্মৃতি পটে ফ্রেমবন্দি। খুঁজলেও তাদের আর ঠিকানা পাওয়া যাবে না।

হারিয়ে যাওয়া সকাল সরস্বতী পুজো আসার কয়েক দিন আগে থেকেই স্কুলে পড়া শিকেয় উঠে যেত। শুরু তোড়জোর। ক্লাস নাইনে তো কথায় নেই। দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। পুজোর আগের দিন দল বেঁধে ঠাকুর আনতে যাওয়ার হিড়িক। রাতে ঘুম নেই। সকাল হতেই মুখে একরাশ হলুদ মেখে বেড়িয়ে পড়া। প্রথমে নিজের স্কুল। তারপর পাশের স্কুলগুলিতে টো টো কোম্পানি। ছেলেদের স্কুলও যে গন্তব্য ছিল না এমন নয়। আবার পাশের স্কুল থেকে ছাত্ররাও এই সুযোগে মেয়েদের স্কুলে এসে প্রথম আলাপ জমানোর সুযোগ পেত। প্রথম পরা শাড়ি নিয়ে একেবারে হিমশিম দশা। পুজো শেষে প্রসাদ বিতরণ। তারপর দেরি করে বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনি। দুপুরে খুচুরি ভোগ। সরস্বতী পুজোয় নাকি পড়তে হয় না। কারণ বইপত্র মায়ের পায়ে নিবেদিত। একটা দিন পড়াশুনো না করার চান্স ছাড়তে চাইবে না কোন্ বিজ্ঞ পড়ুয়া!

একালের সেলফির হিড়িক বদলেছে জীবন যাপন। বদলেছে সরস্বতী পুজোর সকালে আনন্দের ধরণ। সেদিন যাঁরা ছিল ক্লাস নাইন, আজ তাঁরাই গিন্নি। আজ তাঁদের কন্যারাই নতুন শাড়ি চরিয়ে পুজো মণ্ডপে হাজির। এখন আর সরস্বতী পুজো শুধু স্কুলে সীমাবদ্ধ নেই। পাড়ায় পাড়ায় সকাল থেকে শুরু হয়ে যায় বাগদেবীর আরাধনা। মণ্ডপের সামনে প্রথম আলাপ হওয়া কলেজ ছাত্রের সঙ্গে সেলফিতে এক ফ্রেমে বন্দি হওয়ার অফুরান সুযোগ। স্কুলে একবার যেতেই হয়। বন্ধুরা দল বেঁধে স্কুলে আড্ডা দিতে হাজির। মোবাইল ক্যামেরায় বন্দি হতে থাকে রাশি রাশি আহ্লাদিত মুখের ভিড়। চিরাচরিত রূপেও বদল জীবন ধারার সঙ্গে সঙ্গে সরস্বতী পুজো দিন আনন্দের ধরণই যে বদলেছে এমনটা নয়। বাগদেবীর রূপের দেদার পরিবর্তন করে চলেছেন মৃৎশিল্পীরা। ধ্যানমন্ত্রে বর্ণিতপ্রতিমাকল্পটিতে দেবী সরস্বতীকে শ্বেতবর্ণা, শ্বেতপদ্মে আসীনা, মুক্তার হারে ভূষিতা, পদ্মলোচনা ও বীণাপুস্তকধারিণী এক দিব্য নারীমূর্তি রূপে কল্পনা করা হয়েছে। প্রাচীন কাল থেকে মা সরস্বতীর এই রূপের পুজো হয়ে এসেছে।

এখন দুর্গাপুজো, কালীপুজো পেরিয়ে থিমের ছোঁয়া এবার সরস্বতী পুজো মণ্ডপে। শুধু শহর এলাকা নয়, গ্রামেও সরস্বতী পুজোতে লেগেছে থিম পুজোর হিড়িক। কোথাও মণ্ডপে ফুটে উঠছে দেশাত্মবোধের কোলাজ, আবার কোথাও কাল্পনিক মন্দিরের আদল। এমনকী কোনো পুজোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্পোরেট কানেকশন।
সমাজ ও রাজনীতি দুর্গাপুজো বা কালীপুজোর মতো এখানে পুজো ঘিরে রাজনীতির দাপট সেভাবে এখনো দেখা যায় না। কারণ চরিত্র বদল হলেও এখনও বেশিরভাগ পুজো হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প থেকে শুরু করে সমাজ সচেতনতার বার্তা কিন্তু থিমে উঠে আসে। শহরাঞ্চল বা জেলাতেও এই ধারা অব্যাহত আছে। মাদক বিরোধী প্রচার, নারী নির্যাতন নিয়ে থিমের প্রবণতা দেখা যায়। এমনকী যে বছর নোট বাতিল সারা দেশে আলোড়ন ফেলেছিল, তারপরেই সরস্বতী পুজোতে সেই বিমুদ্রাকরণকে কোথাও কোথাও থিম করতে দেখা গেছে। পুজোর রীতি রেওয়াজ মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পুজো আয়োজিত হয়। তিথিটি শ্রীপঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত। এই পূজায় বিশেষ উপাচার বা সমগ্রীর প্রয়োজন হয়। যথা- অভ্র-আবীর, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ। পুজো জন্য বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুলও প্রয়োজন হয়।
লোকোচার অনুসারে ছাত্রছাত্রীরা পুজোর আগে কুল খায় না। এমনকী পুজোর দিন কিছু লেখাও নাকি নিষিদ্ধ। এই দিন ছোটদের হাতেখড়ি দিয়ে শুরু সিলেবাসের প্রথম পাঠ। পুজোর পরদিন চিড়ে ও দই মিশিয়ে দধিকরম্ব বা দধিকর্মা নিবেদন করা হয়। এরপর পূজা সমাপ্ত হয়। সন্ধ্যায় প্রতিমা নিরঞ্জন হয়।

তবে প্রতিমা নিরঞ্জন হয় স্কুল, কলেজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাড়ার পুজোগুলিতে। বাড়ির প্রতিমা সাধারণত বিসর্জন হয় না। আগেরবারের প্রতিমা বিসর্জন করে নতুন প্রতিমাকে ঘরে অধিষ্ঠান দেওয়া হয়। জীবন রেখার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে পুজোর ধরণ। বদলেছে হালচাল। তা সত্ত্বেও এই সরস্বতী পুজোকে ঘিরে অনেক ভালোবাসার ইতিকথা আগেও রচিত হয়েছে, এখনও হচ্ছে।