মুহাম্মদ নূরুদ্দিন, টিডিএন বাংলা:ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা/ দুরবস্থা নিয়ে চলছে এক লুকোচুরি খেলা। সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান, আন্তর্জাতিক রিপোর্ট ইত্যাদিতে যতই ভারতের বেহাল অর্থনীতির কথা তুলে ধরা হচ্ছে সরকার ততই এটাকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ভারতে গাড়ী শিল্পে মন্দা দেখা দেওয়া এবং তার প্রভাবে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল দেশজুড়ে। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ও ভারতের ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলেন তখন সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধে না উঠে বিজেপি তার বিরোধিতা করতে লাগলো। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সিতারামন ঘটা করে জানিয়ে দিলেন, গাড়ী বিক্রি কমে যাওয়ার কারণ অর্থনৈতিক মন্দা নয়।আসলে জনগন ওলা উবেরের প্রতি বেশি ঝুঁকছে বলে গাড়ী বিক্রী কমে যাচ্ছে। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর খেয়াল নেই যে ওলা উবের নৌকাও নয়, হাওয়াই জাহাজও নয়। সেটাও গাড়ী। এভাবে বালিতে মুখ লুকিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে যে বাঁচা যাবেনা এই সহজ কথাটা তারা বুঝতে চাননা।
এইভাবে সত্য থেকে মুখ লুকিয়ে থাকার বিকামিকে বলা হয় austrichias policy.।
মরুভূমিতে যখন ঝড় ওঠে তখন উট পাখী তাড়াতাড়ি বালিতে নিজের মুখটা লুকিয়ে নেয়। সে যখন কাউকে দেখতে পায়না তখন সে ভাবে পৃথিবীতে কেউ তাকে দেখতে পাবেনা। এটা আত্ম প্রতারণার এক নাম। আমাদের দেশের শাসক দল জেনে বুঝে এই আত্ম প্রতারণার শিকার হচ্ছে। সরকারের এই অন্ধত্ব ততটা উদ্বেগের কারণ হতোনা যদি জাতি জাগ্রত থাকত। কিন্তু জাতির একটি বড় অংশ ধর্মীয় আফিমের মোহে এমন অন্ধ হয়ে যাচ্ছে যে তারাও সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে ভুলে যাচ্ছে। মোসাহেবের দল সরকারের সবকিছুকে ভালো আর সমালোচকদের সবকিছুকে খারাপ দেখতে পাচ্ছে।
আর এস এসের মত সংগঠনের প্রধান, মোহন ভাগবত ভারতের অর্থনৈতিক মন্দা কে বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করছে। খবরে প্রকাশ বিজয়া দশমীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মোহন ভাগবত বলেছেন, জিডিপি’র হিসাব দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে নাকি যাঁচাই করা যায়না। তাঁর কথা আর্থিক বৃদ্ধির হার শূন্যের নীচে না নামলে নাকি তাকে মন্দাও বলা যায়না। অর্থ নীতির বেহাল নিয়ে দেশে বড্ড বেশি আলোচনা হচ্ছে বলে তিনি বিরোক্তিও প্রকাশ করেন। তাঁর মতে অর্থনীতি নিয়ে এই অহেতুক আলোচনা দেশকে অর্থনৈতিক ভাবে আরো পিছিয়ে দেবে।
একে বালিতে মুখ লুকানো ছাড়া আর কীই বা বলা যাবে? যখন আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার বা আই এম এফ এর নতুন ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্রিস্টিলিনা জর্জিবা ভারতের অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গোটা বিশ্ব এখন মন্দার মধ্য দিয়ে চলছে। তার মধ্যে ভারতের অবস্থা বেশি উদ্বেগ জনক বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরো জানিয়েছেন ভারতের মন্দার হার আরো স্থায়ী হবার আশঙ্কা রয়েছে। গত ছয় বছরের তুলনায় ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার সবচেয়ে কমে এসে ৫% শতাংশে ঠেকেছে। ২০১৯ – ২০২০ সালে আরো অনেক বেশি নীচে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই এম এফের মতে যা আসা করা গিয়েছিল তার থেকে বেশী দুর্বল ভারতের অর্থনীতি।
বিজেপি সরকার থুবড়ির জোরে এই সকল রিপোর্টকে উড়িয়ে দিতে চাইলেও সরকারও পরিসংখ্যানে তাকে আড়াল করতে পারেনি। শেষবার প্রকাশিত ত্রৈমাসিক সরকারি পরিসংখ্যান বলছে , বৃদ্ধির হার নেমে এসেছে পাঁচ শতাংশে। চাহিদায় ভাটার টান। খরা চলছে লগ্নিতেও । নতুন কর্ম সংস্থানের সুযোগ নেই বললেই চলে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ খুইয়েছেন কয়েক লক্ষ মানুষ। পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে গাড়ী থেকে বিস্কুট সর্বত্রই বিক্রি বাটা তলানিতেই
শুধু আই এফ এম নয়, মুডিজ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাও ভারতীয় অর্থনীতির দুরবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এর ফলে বিনিয়োগ আরো কমছে। আর এস এসের মত সংগঠন যারা আজন্ম বিদেশি পুঁজির ঘোর বিরোধী ছিল তারাও দেশে বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাচ্ছে। এযেন ভূতের মুখে রাম নাম। তার পরও লগ্নির দেখা নেই। কেননা অর্থনীতির নিজস্ব একটা গতি আছে সে পথ না মাড়িয়ে লাঠি ডান্ডা দিয়ে অর্থনীতি কে চাঙ্গা করা যায়না।
এরূপ এক ডান্ডা পেটার তথ্য খাড়া করেছেন কেন্দ্রের আইন মন্ত্রী রবি শঙ্কর প্রসাদ। তিনি বলছেন ইদানিং দু তিনটি সিনেমা ভালো বাজার করেছে। এর থেকেই বোঝা যায় দেশে মন্দা নেই সব বিরোধীদের অপপ্রচার।
ভারত যে মন্দার মধ্যে নেই তা বোঝানোর জন্য প্ৰধানমন্ত্রী তাঁর ব্যক্তিগত বিলাসিতা ও খরচের বহর বাড়িয়েই চলেছেন। শুধু তাই নয় তিনি রাশিয়ার মত উন্নত দেশকেও উন্নয়নের খাতে সহযোগিতার কথা বলেছেন একেই বলে ভিখারির জমিদারি ঠাট। এসব করে রাজনীতির পালে হয়তো কিছুটা হওয়া টানা সম্ভব হবে কিন্তু মন্দা রোখা যাবেনা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়ে মায়াজালের ভুলভুলাইয়াতে জনগণকে ব্যাস্ত করে রাখা। তাদের সামনে এখন মন্দির মসজিদ আর পাকিস্তান। হিন্দু রাষ্ট্রের নেশায় তারা এখন মত্ত। এদিকে বিজয় মালিয়া, মেহুল চস্কি, নীরব মোদীরা দেশের এক লক্ষ ছিয়াত্তর হাজার কোটি টাকা লুঠ করে নিয়ে পালিয়ে গেলো সেদিকে কারো খেয়াল নেই। একজন গরীব কৃষক, শ্রমিক, জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে কোন মতেই ছাড় পায়না। বরং তাদের ঋণের সুদ চাপতে চাপতে তা আসলের দশ গুন হয়ে দাঁড়ায়। এই সব গরীব মানুষ ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে আত্ম হত্যার মত পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু যারা হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে বসে আছে সরকার তাদের ঋণ মাফ করে দেওয়ার ব্যাপারে সদা তৎপর।
গত লোকসভা নির্বাচনে আসা করা গিয়েছিল জনগন এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলবে। কিন্তু রাম রাজ্যের নেশা তাদেরকে একথা ভুলিয়ে দিয়েছে। তেলের দাম বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ছে। কোন খেয়াল নেই। বাস্তবের মুখোমুখি না হয়ে সর্বত্র মুখ লুকানোর চেষ্টা। এভাবে সত্যকে আড়াল করে কী কখনো দেশ রক্ষা করা যাবে?