আলমগীর সরদার

আলমগীর সরদার, টিডিএন বাংলা: রাজনীতি করলে নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে দলের সর্বোচ্চ নেতা-নেত্রীর কাছে বিবেককে বন্ধক রাখতে হয়। তা নাহলে যেমন ছোট খাটো বা মাঝারি নেতা হওয়া যায়না, এমনকি সমার্থকও হওয়া যায় না। অধীনস্থ নেতা-নেত্রী বা সমার্থকদের কাজ হলো সর্বোচ্চ নেতা-নেত্রী যা বলবেন তার স্বপক্ষে যতপ্রকার অপযুক্তি আছে তা সবই যুক্তি হিসেবে খাড়া করা। সেজন্য দেখতে পাই “নেতা যত বলে পারিষদ-দলে, বলে তার শতগুন…” ।

বলে রাখা ভালো, পৃথিবীর এমন কোন কাজ নেই যার স্বপক্ষে বা বিপক্ষে যুক্তি খাড়া করা যায়না! যুক্তি-পাল্টা যুক্তি যতই উপস্থাপন করা হোক না কেন দেখতে হবে সে যুক্তি যুক্তিগ্রাহ্য কিনা? বা সে যুক্তিতে সার্বিক কল্যাণ আছে কিনা? আমার আলোচ্য বিষয় হলো মদ।
প্রথমে জেনে নেওয়া উচিত মদ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ না অকল্যাণ? কল্যান যদি হয় তাহলে সাধুবাদ, আর যদি অকল্যাণ হয় তাহলে মুর্দাবাদ।

স্মরণাতীত কাল থেকে মদ হলো বিশ্বমানবতার জন্য তীব্র যন্ত্রনার কারণ, অসংখ্য মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ, বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষের ভয়ঙ্কর দুর্দশার কারণ। সমাজে হাজারো সমস্যার নেপথ্যের আসল কারণ এই মদ। অপরাধ প্রবনতার তীব্র উর্ধগতীর উপকরণ এই মদ, সেই সাথে ক্রমবর্ধমান মানসিক বিপর্যয় এবং কোটি কোটি সংসার ভাঙার জীবন্ত দলিল এই মদ, অসংখ্য ধর্ষনের নেপথ্যের কারণ হলো এই মদ। বিশ্ব জুড়ে নীরব ধ্বংসযজ্ঞের তান্ডবলীলা চালিয়ে কোটি কোটি সংসারকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করেছে এই মদ।
তাছাড়া আমরা জানি, স্বাস্থ্যই সবচেয়ে বড় সম্পদ, সুস্বাস্থ্যের জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে। কিন্তু, মদের কারণে স্বাস্থ্যের যে কি ক্ষতি হয় তা জানলে চমকে যেতে হয়। নিয়মিত মদ পানের কারণে, লিভার সিরোসিস, অম্লনালীর ক্যান্সার, মল নালীর ক্যান্সার, অগ্ন্যাশয় ও যকৃতের প্রদাহ, হৃদযন্ত্র স্পন্দন সংক্রান্ত যাবতীয় রোগ, হাইপার টেনশান, গলনালী প্রদাহ,পক্ষাঘাত, সন্যাস রোগ, প্যারালাইসিস, স্নায়ু ও মস্তিষ্কের যাবতীয় রোগ। এমনই হাজারো রোগের উপকরণ এই মদ।
পৃথিবীতে যত অপরাধ সংগঠিত হয় তার সিংহভাগ হয় মদের কারণে। সংগঠিত অন্যায়ের আবার সাজাও হয়। একদিকে মাতাল হবার ছাড়পত্র, অন্যদিকে মাতালের দ্বারা সংগঠিত অন্যায়ের সাজা! এ দ্বিচারিতা কেন? মদ বেঁচে মাতাল হবার সুযোগ করে দিয়ে মাতালের দ্বারা অপরাধ হলে তার আবার সাজা কি? তাহলে সরকার সিদ্ধান্ত নিক মদ কেন্দ্রিক যত অপরাধ সংগঠিত হবে তা ধর্তব্যের বাইরে। সরকার দ্বারা ক্যান্সার বেঁচে অর্থ উপার্জন করে আবার ক্যান্সারের হাসপাতাল গড়ার দরকার কি? এ যেন ভাবের ঘরে চুরি! এ যেন চোরকে বলে চুরি করতে সাধুকে বলে সাবধান।
দুধ বেঁচে মদ খাবার পথ প্রশস্ত করে দেওয়া সরকারের কাজ নয়।
পৃথিবীর কোন জ্ঞানী গুণী বিচক্ষণ কেউ কখনো কি মদের স্বপক্ষে কথা বলেছেন? তথাপিও দেশে মদ চলছে অবাধে।
রাজ্য সরকার আবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলায় জেলায় মদের দোকান খুলবে। এ সিদ্ধান্ত তাদের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছু নয়।
সাথে সাথে কেন্দ্রীয় সরকারকে বলবো, তাৎক্ষণিক তিন তালাক বিলের এত বিরোধিতা করা সত্ত্বেও অর্ডিন্যান্স জারি করে তা পাশ করালেন। খুব ভালো কথা। এবার আপনাদেরকে একটু ভাবতে বলবো যে, যত পার্সেন্ট মুসলিম মহিলারা তালাকের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত, তার চেয়ে হাজার গুণে বেশি দেশের মহিলারা মদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত। একজন মাতাল যদি একটা পরিবারে থাকে সে পরিবার হয় চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সমাজে যদি একজন মাতাল থাকে তাহলে সে সমাজের মানুষ হয় চরমভাবে অতিষ্ঠ । কয়েকটি পরিবারকে বাঁচাতে আপনাদের এত মায়াকান্না! কিন্তু হাজার লক্ষ পরিবারকে নষ্ট করছে যে মদ, তা নিয়ে কোনো সরকারের মাথাব্যথা নেই কেনো? ধিক, শতধিক তোমাদের এই সিদ্ধান্তের। ত্রিশ কোটি মুসলিমদের মধ্যে 300 জন মহিলার তালাকের সমস্যা ছিলো কিনা সন্দেহ! কিন্তু মদ! মদ শুধু মুসলিমদের ক্ষতি করেছে এমনটি নয়, মুসলিমদের চেয়ে শতগুন ক্ষতি করেছে অমুসলিমদের। মদ এমন একটি ভয়ংকর সামাজিক ভাইরাস যার দ্বারা অজস্র পরিবার ক্ষতির সম্মুখীন। মদের কারণে অনেক বৈবাহিক সম্বন্ধ শেষ হয়ে গেছে। একজন শাসক, একজন নেতা, একজন মন্ত্রী কখনোই চান না তার সন্তান বা তার জামাই অথবা কোনো নিকট আত্মীয় কেউ মদ খেয়ে মাতাল হোক। তাহলে মদের এতো রমরমা কাদের ক্ষতির জন্য? সময় এসেছে ভাববার।

এক সময় সি পি এম নেতৃত্ব যেমন নিজ সন্তানদের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে প্রাইমারী স্কুল থেকে ইংরেজি তুলে দিয়েছিলো, তার কুফল আমাদের মতো একটা প্রজন্মকে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে। ঠিক তেমনি এ সরকার ব্যাপকভাবে মদের প্রচলন ঘটিয়ে সামাজিক মেরুদন্ড ভাঙতে চাইছে। আমরা এ সিদ্ধান্তের তীব্র ঘৃণা করি।
আমরা মদ মুক্ত বাংলা চাই, আমরা মদ মুক্ত ভারত চাই।

Not available