আব্দুল হান্নান, টিডিএন বাংলা : কোলকাতা গিয়েছিলাম ভোর বেলায়। সঙ্গী ছিল স্ত্রী ও ছোট মেয়ে মায়মুনা। সকালে দেবগ্রাম ষ্টেশন থেকে ৫টা ১৫ র রানাঘাট মেমো ধরি। ঠিকঠাক সিটও পেয়ে যাই। রানাঘাটে নেমে পরপর দুটি শিয়ালদহ লোকাল আছে। যারা যান তারা সবাই জানেন। একটি ছাড়ে ৭টা২০ মিনিট। আর গ্যালপিনটা ৭টা৩০ মিনিট। গ্যালপিনটা যেহেতু আগে ঢোকে তাই ওটাতেই চেপে বসলাম। আমার মাথায় টুপি মুখে দাড়ি আমার স্ত্রী বোরখা পরে আছে।

ট্রেন চলতে শুরু করলে একের পর এক ষ্টেশনে তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ চাকুরীজীবি বাবুরা উঠতে শুরু করে যারা নাকি নিত্যদিনের যাত্রী। শুরু হল নিত্যনতুন খিস্তি। তাদের প্রতিটি কথায় কথায় (বাঁ….) এটা ওদের কমন খিস্তি। যারা সিট নিয়ে বসে আছে তাদের অনেক কে জোরপূর্বক উঠিয়ে সিট দখল করছে। আমাকেও সিট ছাড়তে বলা হয়। সোজাসাপটা উত্তর দিলাম কোলে মেয়ে আছে স্ত্রীর তিনটি অপারেশন, তাই সম্ভব নয়। ব্যাস আর যাবি কোথায়। আমাকে সরাসরি হুমকি দেওয়া শুরু- ‘এই রকম মানসিকতা নিয়ে এই ট্রেনে উঠবেন না। এখানে আমরা যা বলি তাই-ই হয়। সিট ছাড়তে না পারলে আর কখনো এই ট্রেনে উঠবেন না।’

আমি কোন উত্তর দিলাম না। সবাই আমাদের দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন আমরা মানববোমা। উঠতি বয়সের কিছু যুবক আমাদের দিকে বড় বড় চোখে  ৮-১০ বার জয় বজরং বালী, জয় শ্রী রাম স্লোগানে গোটা বগি কাঁপিয়ে দিলো। মায়মুনার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমরা যাবো তো শিয়ালদহ কিন্তু তাদের চেঁচামেচি হইহুল্লোড় খিস্তি অশ্লীলতার মাত্রা এতটাই সীমা ছাড়তে শুরু করলো যা আমাদের দমদম নেমে যেতে বাধ্য করলো। তাদের এই অমানবিক নির্যাতনে আমরা মর্মাহত হলাম। আমার মেয়ে আর ঘুমাতে পারেনি যার বয়স মাত্র ১৪ মাস।

মনে হল গোটা রেলটা যেন তাদের বাপ দাদার সম্পত্তি। তাছাড়া পেপার ছড়িয়ে গোটা বগিতে কলিগদের জন্য জায়গা রাখা তো আছেই। মনে মনে ভাবলাম এই বগিতে মানুষ তো অনেক আছে কিন্তু তারা সবাই জীবন্তলাশ ছাড়া কিছুই নয়। কেউ প্রতিবাদ করেনি। সবাই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। এইতো আমার সোনার বাংলা! বর্তমান সময়ে সারা ভারতের কোথাও ট্রেনে, বাসে বা বাইকে সফর করাতে নিরাপত্তা নেই। আজ আমি কাল আপনি পরশু আর একজন। সবাই আজ নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছি।

মানুষ শিক্ষিত হলে তার ব্যবহারে সমাজ মুগ্ধ হয়। কিন্তু হায়! আফসোস! এরাও কাগজে কলমে ‘শিক্ষিত’ কিন্তু এত বাজে এদের  ব্যবহার যে আপনি সেখানে সপরিবারে ভ্ৰমন করতে লজ্জিত হবেন। এরা কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই শিক্ষার্জন করেছে কে জানে। ভারতীয় রেল মন্ত্রক সহ বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর কাছে আবেদন, আমাদের মত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিন। বাংলার পবিত্র মাটিকে এইভাবে অপবিত্র হতে দেবেন না। দিনদিন মানুষ নৈতিকতা হারিয়ে ফেলছে। সমাজের এই কীট গুলির জন্য যদি এক্ষুনি কীটনাশক প্রয়োগ না করেন সারা বাংলা আগাছাতে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। পরবর্তী প্রজন্ম এই আচরণ ক্ষমা করবেনা। আমার আরও দাবী, প্রতিটি রেলে রেল পুলিশ সর্বক্ষণ টহলদারী করুক যাতে করে আমাদের মত সাধারণ রেল যাত্রীরা স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করতে পারে। এতে এই অপরাধ অনেকটাই কমবে বলে মনে করি।
জয় হিন্দ।

আব্দুল হান্নান
কালীগঞ্জ, নদীয়া,