জানে আলম, টিডিএন বাংলা:  মাদ্রাসায় দেশবিরোধী কাজকর্মের অভিযোগ বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে৷ মাদ্রাসা বিতর্ক- এক মুর্খামি। হয়তো মাদ্রাসা সম্পর্কে সত্য না জেনে, বা জেনে বুঝেও মিথ্যা প্রচার। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে মাদ্রাসাগুলিকে সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর বলা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জি কিষাণ রেড্ডির এ ধরনের মন্তব্য দেশের সংস্কৃতির অপমান ছাড়া আর কিছুই নয়। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে বন্ধ করার এক ঘৃণ্য চক্র। কোনও ছাত্র যদি সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। একটি ব্যক্তিগত অপরাধকে সার্বিক ভাবে মাদ্রাসার উপর চাপানো কি ঠিক হবে? কখনও না।

প্রশ্ন হল, মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা সাড়ে চোদ্দশ’ বছর ধরে চলে আসছে। এটা অত্যন্ত গর্বের যে, কোনও মাদ্রাসায় কখনো কোনও নাশকতা, কোন সন্ত্রাসের ছায়া কোনদিনও ছিল না, আজও নেই এবং থাকবেও না। আর এখন হঠাৎ করে বললেই হলো মাদ্রাসাগুলিকে সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর? যদি তাই হয় তাহলে পরিষ্কার ভাবে বলতে হবে কোন কোন জেলার কোন কোন মাদ্রাসায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছে। তিনি কোন ধরনের মাদ্রাসার কথা বলতে চেয়েছেন? সেই মাদ্রাসা গুলি কি সরকারি? না বেসরকারি? খারিজা না মক্তব? না মসজিদের সঙ্গে যুক্ত কোনো মাদ্রাসা? না অন্য কিছু? তার একটি লিস্ট তৈরি করা হোক।

দেশের প্রতিটি মাদ্রাসায় সি সি ক্যামেরা বসানো হোক। সঠিক তদন্ত হলে তা আইন মোতাবেক বন্ধ করা হোক। কারণ মাদ্রাসার জন্ম হয়েছে সন্ত্রাস আর শয়তানি চক্রান্তের শেকড় উপড়ে ফেলে পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন করতেই। সেই সত্য চেপে রেখে এ ধরনের অপবাদ অস্থিরতা তৈরি করা সুপরিকল্পিত অভিসন্ধি ছাড়া কি আর হতে পারে? খাগড়াগড় কাণ্ডের পরে জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ একটিও উদাহরণ দিতে পেরেছে কি? কখনও পারবে না কারন আদতে তা নয়। আসলে মাদ্রাসা কি ? তার লক্ষ উদ্দেশ্য কি ? সেখানে কি পড়ানো হয়? কারা পড়ে ? তা জানলে সরকার শ’য়ে শ’য়ে অলিতে গতিতে মাদ্রাসা স্থাপন করত।

মাদ্রাসা শব্দটি একটি আরবি শব্দ। শব্দটি উৎপত্তি ‘দারসুন’ শব্দ থেকে, যার বাংলা অর্থ ‘পাঠ’। আর মাদ্রাসা এর বাংলা অর্থ ‘পাঠের জায়গা’। যার অর্থ বিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মাদ্রাসা একটি পবিত্র স্থান যেখানে জ্ঞান শিক্ষা চর্চা হয়। জ্ঞানই আলো , আলোই শিক্ষা, শিক্ষাই মেরুদন্ড- এই উপদেশ বাণী গুলোর প্রকাশের অনেক আগেই শিক্ষার জন্ম। মানব সভ্যতার বয়স যতদিন, শিক্ষার বয়সও ততদিন। কারণ প্রথম মানুষ আদমকে সৃষ্টি কর্তা জ্ঞানী ও নবী হিসাবেই প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছেন।

“পড়, তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন”(সূরা আলাক্ব-১) এই প্রথম বাণী কোরানে পাওয়া যায়। আর আল কুরআনের শিক্ষা ব্যবস্থা শুরু হয় মাদ্রাসা তেই। মূলত মুসলমানদের অধ্যয়ন-গবেষণা প্রতিষ্ঠান হল মাদ্রাসা। সাধারণ অর্থে মাদ্রাসা হচ্ছে আরবি ভাষা ও ইসলামি বিষয়ে অধ্যয়নের প্রতিষ্ঠান। মাদ্রাসার প্রাথমিক স্তর মক্তব, ফোরকানিয়া। ফোরকানিয়া শব্দের মূল ফুরকান যার অর্থ বিশিষ্ট। মিথ্যা থেকে সত্যকে সুস্পষ্টভাবে পৃথক করে বলে পবিত্র কুরআন-এর আরেক নাম আল ফুরকান।

প্রাথমিক স্তরের যেসব মাদ্রাসায় কুরআন পাঠ ও আবৃত্তি শেখানো হয় সেগুলিকে বলা হয় দর্‌সে কুরআন। সাধারণত স্থানীয় কোন মসজিদেই আশেপাশের পরিবারের ছোটদের প্রাথমিক পর্যায়ের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়। মসজিদের ইমাম ও মোয়াজ্জিনরাই সাধারণত এর শিক্ষক বা উস্তাদ হন। মসজিদে নববীতে অবস্থিত ‘সুফফা’ হলো ইসলামের প্রথম মাদ্রাসা বা জামেয়া বা বিশ্ববিদ্যালয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন এর প্রথম শিক্ষক এবং সাহাবায়ে কিরাম প্রথম ছাত্র সমাজ। এখান থেকে শিক্ষার ইতিহাস সামনে অগ্রসর হয়।

ইসলামী যুগের শুরুতে, মধ্যযুগে এবং অতি সাম্প্রতিক কালেও ঔপনিবেশিক যুগের আগ পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব ছিল কুরআন, হাদিস, সিরাত ও ফিকাহর ওপর। এর সাথে সাথে সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, যাবতীয় সাইন্স এসবের গুরুত্ব ছিল। ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা পৃথিবী কোন ধর্মগ্রন্থে বা মনীষীর বাণীতে পাওয়া যাবে না। ইসলামী শাসন কালে শিক্ষা সভ্যতার অবদান ইতিহাসে অভূতপূর্ব সাক্ষী বহন করে। স্বয়ং রাজধানী দিল্লিতেই ১০০০টি মাদ্রাসা ছিল। এবং ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে শুধু বাংলাতেই ৮০ হাজার মাদ্রাসা ছিল। যেগুলোতে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং শিল্পকলার চর্চা হত।

কিন্তু ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে পর শুরু হয় ইংরেজ শাসন। ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি দীর্ঘ১০০ বছর শিক্ষায় না হস্তনীতি গ্রহণ করে। ইংরেজগণ তাদের শাসন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন জারি রাখার উদ্দেশ্যে Divide and rule নীতি প্রয়োগ করে। এ নীতির মূল লক্ষ্য ছিল দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে মুসলমানদের মাঝে জাতিগত বিভাজনের আয়োজন করা। তাদের এ নীতি সফলতার সাথে বাস্তবায়ন হয়েছে। বৃটিশ এ দেশ থেকে চলে গেছে সেই ১৯৪৭ সালে। তাদের তৈরি শিক্ষাব্যবস্থা আজও অক্ষুন্ন আছে।

মাদ্রাসা সন্ত্রাসের আতুড় ঘর নয়, বরং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পীঠস্থান ছিল এই মাদ্রাসা। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে মাওলানা জিয়াউদ্দিন ছদ্মনামে টুপি ও পাগড়ি পরে আফগানিস্তানের মধ্যে দিয়ে বিদেশে পালাতে যিনি সাহায্য করেছিলেন যে মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি। তিনি ছিল আদতে মাদ্রাসার ছাত্র। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মুহাম্মদ আলী, শওকত আলী, মাওলানা ভাসানী, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি, মাওলানা অসফাকুল্লাহ ছাড়াও রাজা রাম মোহন রায় এরা সবাই মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। মাদ্রাসায় যদি জঙ্গি ট্রেনিং দেওয়া হত, তবে ইমাম ইমদাদুল্লাহ রসিদীর মতো লোক বের হতনা।

পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা খুবই আধুনিক। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন এতই উন্নত যে রাজ্যের এমন অনেক মাদ্রাসা রয়েছে যেখানে মুসলিমদের তুলনায় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের পড়ুয়া বেশি৷ ভারতে বেসরকারি মাদ্রাসায় পড়েনা এমন সংখ্যা শতকরায় একেরও কম। সরকারি ও বেসরকারি মিলে প্রায় ৪% মুসলিম মাদ্রাসায় পড়ে। সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, মাদ্রাসায় পড়ে যেমন হিন্দু, আদিবাসী ছাত্রছাত্রী বাংলায় প্রায় ১২% এর মত। মাদ্রাসা গুলি গিয়ে গিয়ে দেখুন কতজন অমুসলিম সেখানে চাকরি করেন!

বর্তমানে একরকম অমুসলিম শিক্ষকের এর সংখ্যা মুসলিম শিক্ষকের এর চেয়ে বেশি। একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন আপনার পরিচিত কেউ হয়তো মাদ্রাসায় চাকরি করেন। বিশেষ করে আমার মাদ্রাসায় আট জনের মধ্যে তিন জন হিন্দু শিক্ষক শিক্ষিকা বর্তমান। তাদেরও কাছেও খোঁজ খবর নিতে পারেন মাদ্রাসায় কি হয়। কিন্তু প্রচার করা হয় মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন মারফত শুধু মোল্লারাই চাকরি করে- যা মোটেই সঠিক নয়।

এ রাজ্যে অন্যায়ের প্রতিবাদ যেমন নন্দীগ্রাম আন্দোলন, সিঙ্গুর আন্দোলন, বিভিন্ন জমি আন্দোলনের শুরুটা করেছে মাদ্রাসার ছাত্ররা। সংখ্যায় কম কিন্তু দরিদ্র ঘরের এইসব ছেলেরা সৎ, দেশপ্রেমী হয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে জানে। অশ্লীলতা, হিংসা, নোংরামি ও পাপাচারের বিরুদ্ধে সব সময় তারা বক্তব্য দেন। এ দেশে হাজার হাজার বেসরকারি মাদ্রাসা আছে। বাংলাতেও আছে। যেকোন লোক যেকোন সময় মাদ্রাসায় গিয়ে খোঁজ নিতে পারেন মাদ্রাসা ছাত্রদের সম্পর্কে।

চুরি, ডাকাতি, হত্যা, ব্যভিচার, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, মাদক ও প্রশ্নপত্র ফাঁস ইত্যাদির মত অনৈতিক কাজে মাদ্রাসার পড়ুয়ারা কোন ভাবেই যুক্ত থাকে না, বরং ঘৃনা করে। আবার বেসরকারি ও খারিজ মাদ্রাসাগুলো অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তান ও অসহায় এতিম শিশুদের বিত্তবানদের সহযোগিতায় নীরক্ষরতা দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। মাদ্রাসা শিক্ষার সবচেয়ে বড় অবদান হলো সৎ ও আদর্শ ব্যক্তি গঠন। মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা সরকারি-বেসরকারী বিভিন্ন চাকুরী করার পাশাপাশি মসজিদে জুমার খুতবা, ওয়াজ মাহফিল, সভা-সেমিনার ও ব্যক্তিগতভাবে মানুষকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সৎভাবে জীবনযাপন করার উপদেশ দেন। তাঁদের উপদেশ শুনে সাধারণ মানুষ সৎভাবে জীবনযাপন করার চেষ্টা করেন। অতএব সৎ ও আদর্শ জাতি গঠনে মাদ্রাসা শিক্ষার ভূমিকা অস্বীকার্য ।

সর্বোপরি ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। তাই সন্তানকে পরিপূর্ণ ইসলামি শিক্ষাদানের যথাযথ ব্যবস্থা করা পিতার নৈতিক দায়িত্ব।
একথা সকলের জানা যে মহানবী (সা.) শিক্ষার আলো দিয়ে একটি বর্বর ও অশিক্ষিত জাতিকে সুশিক্ষিত ও সুশৃঙ্খলিত ও সর্বোত্তম জাতিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হন। আমাদেরও উচিত মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়ন ঘটিয়ে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে আসা যাতে আমাদের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তেমন কোন পার্থক্য না থাকে। আবার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটিয়ে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে আসা উচিত যাতে মাদ্রাসা শিক্ষার ইসলামী ধ্যান-ধারণা ও পরিবেশের সাথে তেমন কোন পার্থক্য না থাকে। নৈতিক, আদর্শিক ও চারিত্রিক দৃঢ়তাসম্পন্ন জনশক্তি উৎপাদনের জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চার কোন বিকল্প নেই। এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি অবশ্যই শিক্ষাব্যবস্থায় অগ্রধিকার পাওয়া উচিত।