আফরিদা খাতুন

আফরিদা খাতুন, টিডিএন বাংলা :

“হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন—
শক-হুন-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন।
পশ্চিমে আজি খুলিয়াছে দ্বার, সেথা হতে সবে আনে উপহার,
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে—
এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে॥”
– গীতবিতান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

-একথা রবি ঠাকুরের কলমের ডগা থেকে বার হওয়া নিছক আকাশকুসুম স্বপ্ন ছিল না। বিশ্ব কবি রচিত এই কবিতার প্রত্যেকটি শব্দের মাধ্যমে কবি অতীত ভারতের একটি আদর্শ চিত্রকে অঙ্কিত করেছেন। আসলে ভারত নামক এই মানবতার মহাসমুদ্রে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে আছড়ে পড়ছে নানারকমের ঢেউ। ভারতবর্ষের মাটিতে যুগে যুগে আগত আর্য, শক, হুন, মঙ্গল, মুঘল, পাঠন সকলের সমারহই তো ভারতের আসল পরিচয়। ভিন্নতার মধ্যে এই ঐক্যই ভারতকে বিশ্বদরবারে আর সকলের থেকে করছে নন্দিত।

কিন্তু ভারত নামক মহামানবের মহাসমুদ্র আজ মারাত্মক দূষিত বিভেদের বিষে। মহামানবের মহাসমুদ্রের স্বচ্ছ জল বারে বারে ঘোলাটে হচ্ছে মানবতার ক্ষত থেকে ঝরে পড়া লাল রক্তের রঙে। যত্রতত্র ভাসছে অবালবৃদ্ধবনিতার প্রাণহীন মৃত দেহ অথবা দেহহীন মৃত প্রাণ। ভারত নামক যে উঠানে ভিনদেশী কুটুম্বের ঘটত মহাসমারহ, যে ভারতের বাহু সর্বদা প্রসারিত থাকতো সকলকে আপন করে নেওয়ার জন্য, যে ভারত সহায়-সম্বলহীনদের সযত্নে নিজ বক্ষে আগলে রেখে, দিত ভারতীয়র পরিচয় সেই মহাপ্রাণ ভারত আজ দূর্বল, তার আগলে রাখা মানুষগুলো আজ বহু বছর পর পেল ভিনদেশীর পরিচয়।

২০০ বছরের ইংরেজদের পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্ত পেয়ে আহত শরীরের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে যে ভারত তিরাঙ্গা গায়ে জড়িয়ে নেচে ওঠেছিল সেই ভারত আজ খুইয়ে বসেছে সব কিছু। নেই তার সাহস-শক্তি, হারিয়েছে তার শান্তি-সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা। ভারতের মাটি উর্বরের পরির্বতে চাষীদের গাঢ় দুশ্চিন্তার ছাপে হয়ে উঠেছে অনুর্বর। আজ ভারত তিরাঙ্গার বদলে ধারণ করেছে গৈরিক বৈরাগ্যের বসন। আর সে বৈরাগ্য ধারণ করেছে সত্য-সাহস-সম্প্রীতি থেকে।

দুই বছর পূর্বে দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ কাহিনী আলোচনা প্রসঙ্গে আমার শিক্ষক অভিষেক বোস কে দক্ষিণ ভারতের দেব মূর্তির কুৎসিত হওয়ার কারণ জানতে চেয়েছিলাম, যেখানে বাংলার দেব মূর্তি গুলি যথেষ্ট রুপের অধিকারী। তিনি উত্তরে বললেন, সুন্দর রুপের অধিকারী দেবী মূর্তিগুলির আর্যদের হাত ধরে ভারতে আগমন ঘটেছে। আর দক্ষিণ ভারতের বাসিন্দাগণ আর্যদের হাত ধরে আসা এই সমস্ত সুন্দর রুপের অধিকারী দেবী মূর্তিগুলি সানন্দে গ্রহণ করেনি।

তাই আজও তারা ভারতের অতীততে পূজিত দেবদেবীকে আরাধনা করে চলেছে। ভিন্নমতের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ ভারতের বাসিন্দাগণ আর্যদের অনুপ্রবেশকারী নামে আখ্যা দিয়ে তাদের বিতাড়িত করার কোন প্রয়াসই তো গ্রহণ করেনি। তাহলে কেন কয়েক দশক বসবাস করা পরেও আসমের ওই সমস্ত মানুষকে আজ ভুগতে হচ্ছে বিতাড়িত হওয়ার সংশয়ে? বিভেদের রঙ চড়িয়ে ভারতের ভূমিকে ৪০লাখ মানুষের বসবাসের জন্য নিষিদ্ধ করার এই প্রয়াস স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের ঐতিহ্যের চরম অবমাননা ছাড়া আর কিইবা হতে পারে?

কাঁটাতারে আটকে থাকা মানুষগুলি কী পরবাসী হিসাবে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করবে? নাকী এ দেশের নাগরিক হিসেবে সস্তা দামে কেনা পতাকাকে উড়াবে ভারী মূল্যের গর্ব বোধের সাথে? যাদের কে ভারতের মাটি, জল, বাতাস দিয়ে চরম দুর্দিনে নিজের ঘরে ঠাঁই দিয়েছিল পরম স্নেহের সাথে তারা হয়তো কোন ক্ষণে ভাবেনি দীর্ঘ ৭০বছর পরে তাদের গলায় কাঁটাতারটা এমনভাবে জড়িয়ে যাবে! তাদের ভারতীয়র পরিচয়টা আজ ওষ্ঠাগত হবে এই কাঁটাতারর ফাঁসে!

আজ নাগরিকপঞ্জীর তালিকা থেকে বাদ যাওয়া মানুষগুলি তাদের জীবন প্রাণ বিসর্জন দিতে বসেছে ভারতীয় পরিচয় ফিরে পেতে। এই ৪০লাখ মানুষের গৃহের নারীদের ভারতীয় পরিচয় পেতে গিরগিটির মতো হয়তো প্রতিনিয়ত বদলাতে হচ্ছে নিজের সত্ত্বাটাকে। হয়তো ‘অনুপ্রবেশকারী’ এই কলঙ্ক ঘুচাতে সে নিজ হাতে তুলে দিচ্ছে নিজের দেহটাকে কলঙ্কিত হওয়ার জন্যে। কারণ নিজ দেশে অনুপ্রবেশকারী হিসাবে বাঁচা মানে জীবন্ত লাশ হিসেবে বেঁচে থাকার সামিল।

আজ দেশের স্বাধীনতা দিবসে নেতা মন্ত্রীরা সুসজ্জিত মঞ্চে গাইবে স্বাধীনতার জয়গান। রং চড়িয়ে দেবে লম্বাচওড়া ভাষণ। কিন্তু এই ভারতে কোথায় স্বাধীনতা ? যে মাটিতে বংশ পরম্পরায় বসাবসের পরেও ৪০লাখ মানুষের ভারতীয় পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকা আজ গভীর সংকটের মুখে! যে ভারতে আজ সত্য প্রকাশের মাসুল দিতে হয় প্রাণ দিয়ে! যে দেশের মাটিতে এই একবিংশ শতাব্দীতেও নিম্নবর্ণের মানুষদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে! যে ভূমিতে সংখ্যালঘুদের ডাকা হয় বহিরাগত নামে! যে দেশে নারীদের নেই সসম্মানে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা! যে দেশের চাষীদের অতীতের নীলচাষীদের ন্যায়ে প্রাণ খোয়াতে হচ্ছে ঋণের দায়ে! সেই দেশে স্বাধীন আর পরাধীন এই দুটি কথার মধ্যে কোন পার্থক্যই বুঝি আর থাকে না। স্বাধীন ভারত ভূমির থেকে বুঝি ব্রিটিশদের কারাদণ্ডে সম্প্রীতির চিত্রটা অনেকটাই স্পষ্ট ছিল। কিছু না হলেও সেখানে হিন্দু-মুসলিম, আর্য-অনার্য দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হিংসা-বিদ্বেষ-বিভেদহীন এক ভারত গড়ার স্বপ্ন দেখত।