তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা ‘‘সেই কবেকার ফেলে আসা/ পায়ের ধুলো/ ঘুমের মধ্যে আমাকে পেছন থেকে/ সামনে তাড়া করে।’’ ২০০১ সালে শেষ কাব্যগ্রন্থছড়ানো ঘুঁটি’-তে ‘অরণ্যে রোদন’ কবিতায় লিখেছিলেন কথাগুলো। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েই কি উচ্চারিত হয়েছিল কথাগুলো? কারণ এরপর সালটা ২০০৩। ৮ জুলাই একটু পা চালিয়েই চলে গেলেন পদাতিক কবি। রয়ে গেল তাঁর সৃষ্ট অফুরান সম্পদ। 

ফুলগুলো সরিয়ে নাও/ আমার লাগছে।/মালা/জমে জমে পাহাড় হয়/ফুল/জমতে জমতে পাথর।‘’- `পাথরের ফুল’ নামে সেই কবিতা নাড়িয়ে দিয়েছিল বাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতির আবহমানতাকে। ১৯৫৬ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তাঁর কলম থেকে বেরিয়েছিল এই লেখা।

আজ বাংলা জুড়ে এখানে ওখানে তাঁর কবিতা নিয়ে বড় বড় সভা হচ্ছেআবৃত্তি হচ্ছে,কবিতা পাঠের আসর বসছে। ফুলে মুখ ঢেকে যাচ্ছে কবি সুভাষের। মালার ভারে ক্লান্ত হচ্ছেন কবি। কিন্তু তিনি যে নব সূর্যোদয়বিপ্লবনতুন দিন আনার কথা বলেছিলেনতা মেনে একটু পা চালিয়ে চলার কথা কি ভাববে বাংলার সুভাষপ্রেমীরা?

অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু পার্টি ভাগের সময় সদস্য পদ ত্যাগ করেছিলেন। এক সময়ে বামপন্থী কর্মীদের মুখে মুখে ফিরত সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার লাইন-`প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’ কিংবা`সাতটি রঙের ঘোড়ায় চাপায় জিন/তুমি আলো আমি আঁধারের আল বেয়ে/আনতে চলেছি লাল টুকটুকে দিন।‘ পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট পার্টির কাজকর্ম নিয়ে হতাশা জমেছিল তাঁর মনে।

বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে শেষ জীবনে। কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে হন বিতর্কিত। সেই বিতর্ক নিয়ে আলোচনায় না গিয়েও বলা যায়১৯৪০ এ প্রথম কাব্যগ্রন্থ `পদাতিক’ প্রকাশের মধ্যে আধুনিক বাংলা কবিতার জগতে নতুন সুরধ্বনি উচ্চারিত হল। পদাতিক কাব্যগ্রন্থের প্রারম্ভে ঘোষিত হচ্ছে-

প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য,

ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা

চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য।

কাঠফাঁটা রোদে সেঁকে চামড়া।

মানবিক বোধ ও রাজনৈতিক বাণী তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান অভিমুখ। পদাতিক কাব্যগ্রন্থের `মে-দিনের কবিতা’ কেবল শ্রমিক শ্রেণির এক বিজয় কাব্য নয়। এতে ব্যক্ত হয়েছে ঔপনিবেশবাদের উচ্ছেদসাধনের ঋজু প্রত্যয়।

শতাব্দী লাঞ্ছিত আর্তের কান্না

প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা,

মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা আর না।

পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা।

প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য

এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,

দুর্যোগে পথ হয়হোক দুর্বোধ্য

চিনে নেবে যৌবন আত্মা।‘’

জগৎজুড়ে যে পথে শান্তি আনা সম্ভবসেই পথের রেখা তাঁরা কাছে ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁর কবিতায় সেই পথনির্দেশিকাও আছে। কবিতাটির নাম `বাঁয়ে চলোবাঁয়ে

বাঁয়ে চলো ভাই,

বাঁয়ে।

কালো রাত্রির বুক চিড়ে,

চলো

দুহাতে উপড়ে আনি

আমাদেরই লাল রক্তের রঙিন সকাল।‘’

রঙিন সকাল আনার সরব অভিলাস। তিনি এভাবেই এক স্বতন্ত্র কাব্য ভাষায় জন্ম দিয়েছিলেনযা পরবর্তীকালের কবিদের অনুসরণ করতে বাধ্য করেছে।

তাই তাঁর মৃত্যুদিনে পদাতিকের সঙ্গে পা চালিয়ে বাংলা কি লাল টুকটুকে দিনের স্বপ্ন দেখবে না?