শরদিন্দু উদ্দীপন

শরদিন্দু উদ্দীপন, টিডিএন বাংলা: গত ২৬শে জুলাই রাজ্যের বিধানসভা অধিবেশনে “পশ্চিমবঙ্গ”এর নাম পরিবর্তন করে “বাংলা” রাখার সিদ্ধান্ত পাশ হয়ে গেল। যদিও সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় নি। কংগ্রেস এবং বামপন্থীরা এর বিরোধিতা না করলেও বিজেপি এই সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করেছে। “বাংলা” নামটি এখন কেন্দ্র সরকারের অনুমোদন পেলেই এই রাজ্যের নাম হবে বাংলা।

এখন প্রশ্ন হল ২০১৯ এর নির্বাচনের আগে হঠাৎ রাজ্যের নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন হল কেন? এর উত্তরে বলা হচ্ছে যে, ইংরেজী অক্ষর “W” থাকার কারণে নানা ইস্যুতে রাজ্যের প্রতিনিধিরা একেবারে শেষ দিকে বক্তব্য রাখার সময় পান যা অনেক সময় যথার্থ গুরুত্ব পায় না। তাই “বাংলা” হলে প্রতিনিধিরা প্রথম দিকেই বক্তব্য রাখার সুজোগ পাবেন এবং তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

১৯৯৯ সালে বাম শাসনকালীন সময়ে সর্বসম্মতিক্রমে এই “বাংলা” নামকরণ চেয়ে কেন্দ্রের কাছে অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল। তৎকালীন এনডিএ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অটল বিহারীর নেতৃত্বে এনডিএ সরকার ‘বাংলা” নামকরণের অনুমতি দেন নি। ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট রাজ্যের নাম পরিবর্তন নিয়ে বিধানসভায় প্রস্তাব আসে। সেই সময় বাংলায় রাজ্যের নাম ‘বাংলা’, হিন্দিতে ‘বঙ্গাল’ এবং ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল’ পাশ হয়েছিল। সেই প্রস্তাবও কেন্দ্রীয় অনুমতি পায়নি। এবার তিন ভাষাতেই “বাংলা” নামের প্রস্তাব করা হল।

রাজ্যের প্রতিনিধিরা যে বক্তব্য রাখতে চান তা জাতীয় স্তরে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠুক এটাই তো কাম্য। সে ক্ষেত্রে “বাংলা” নামকরণ না করে “বঙ্গ” রাখলেও তো সমস্যা হবার কথা ছিল না। তবে “বঙ্গ” বিসর্জন দিয়ে “বাংলা” নামকরণের যুক্তি কি? বাম সরকার থেকে মমতা ব্যানার্জীর সরকার কেন “বঙ্গ” ছেড়ে “বাংলা” নামকরণের জন্য এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন?
এই বিষয়ের উপর আমরা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে একটু জেনে নেব। বিধান সভায় প্রস্তাব পাশ হবার পরে তিনি জানান যে “আজকের দিনটি আমাদের কাছে এক ঐতিহাসিক দিন। বাংলা নামের প্রতি আমাদের আবেগ জড়িত। তাই এই রাজ্যের নাম বাংলা হওয়ায় আমরা গর্বিত। আশা করি, রাজ্যবাসীও খুশি। তাই রাজ্যবাসীকে জানাই অভিনন্দন। বাংলা নামে আমরা আজও স্বচ্ছন্দ বোধ করি। তাই আজ এই রাজ্যবাসীর জন্য এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হলো”। তিনি আরো জানান যে যাঁরা এই নামের বিরোধিতা করেছে, তারা ফের আরও একটি ঐতিহাসিক ভুল করল। ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। নাম বদলের বিরোধিতা সত্যিই দুঃখজনক”।
মমতা ব্যানার্জী ইতিহাসের কতটুক খবর রাখেন আমার জানা নেই। তবে তিনি যে “বঙ্গ” নাম থেকে সরে গিয়ে “বাংলা” নামকরণের উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তা অবশ্যই ঐতিহাসিক ব্লান্ডার।
বঙ্গ বিভাজনের পর এই রাজ্যের কি নামকরণ হবে তা নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নানা লেখায় “বাংলা” এবং “বঙ্গ” দুটি শব্দই ব্যবহার করেছেন। সেই ব্যবহার বঙ্গের অতীত ইতিহাসের থেকে কাব্যের প্রয়োজনে বেশী ছিল। ভাষাতাত্ত্বিকেরা “বাংলা” নামটি প্রত্যাহার করেন। প্রখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক এবং জাতীয় শিক্ষক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেন; ‘পশ্চিম বঙ্গ’ (ওয়েস্ট বেঙ্গল) বলিলেই সঙ্গে সঙ্গে তাহার জবাব-রূপে ‘পূর্ব বঙ্গ’ (বা ইস্ট বেঙ্গল) নামটিও আপনা হইতেই আসিবে। সমগ্র ‘বঙ্গদেশ’ সমন্ধে এই ঐক্যবোধকে বাঁচাইয়া রাখিবার জন্যই, বঙ্গীয়-সাহিত্য পরিষদ হইতে প্রতিবাদ করা হইয়াছিল-মাঝে যে প্রস্তাব উঠিয়াছিল যে ‘পশ্চিম বঙ্গ’ (ওয়েস্ট বেঙ্গল) নামটিকে বর্জন করিয়া তাহার স্থানে কেবল ‘বঙ্গদেশ’ বা বাঙ্গালা দেশ (বেঙ্গল) বলা হউক, ভারত-সরকারও এই নাম গ্রহণ করুক, তাহা অনুচিত, অযৌক্তিক ও অনৈতিহাসিক, এবং দেশাত্ববোধের পরিপন্থী। অতএব এই প্রস্তাব পরিত্যক্ত হউক। সুখের বিষয়, পশ্চিম বঙ্গ নামটিকে বিতাড়িত করিবার প্রস্তাবটি সমন্ধে এই আপত্তি উঠায়, ইহা গৃহীত হয় নাই (সুনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায়:গৌড় বঙ্গ, বঙ্গদর্পনে সংকলিত-পৃষ্ঠা ৬৭)।
অতীতের সমস্ত ঐতিহাসিক দলিলে এই পূর্ব জনপদের নাম “বঙ্গ”। সংস্কৃত সাহিত্যেও এই জনপদকে “বঙ্গ” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সিংহলে প্রাপ্ত মহাবংশ, দ্বীপবংশ, কুলবংশ প্রভৃতি গ্রন্থে বিজয় সিংহকে বঙ্গের রাজা সিংহবাহুর পুত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই বিজয় ছিলেন গোতমা বুদ্ধ পূর্ব বঙ্গের রাজকুমার। যিনি পরবর্তী কালে সিংহলের (বর্তমান শ্রীলংকা) রাজা হয়েছিলেন। চর্যাপদের বিভিন্ন দোহায়ও আমরা এই জনপদের নাম “বঙ্গ” হিসেবে দেখতে পাই।
আচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের The Origin and Development of the Bengali Language (ODBL) অনুসারে “বঙ্গ” শব্দটি অস্ট্রীক “বোঙ্গা” শব্দ থেকে এসেছে। এই বোঙ্গা শব্দের অর্থ হল “Spirit” যা আদিবাসীদের শিল্প, সাহিত্য, ভাষা, সংস্কৃতি এবং জীবন দর্শনের সাথে সম্পৃক্ত। বোঙ্গা এক মহান সত্তা। প্রত্যেক দৃশ্য এবং অদৃশ্য পদার্থের মধ্যেই এই সত্তা বিরাজমান। গির (জঙ্গল), বুরু (পাহাড়) এবং কি ঋতুকেও বোঙ্গা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে সাঁওতালী বিন্তিতে। তাই আদিবাসীদের প্রিয় দেশের নাম “বোঙ্গা দিশম” বা মহান সত্তার দেশ। এই বঙ্গার সাথে আলি প্রত্যয় যুক্ত করলে হয় বঙ্গালী। সুতরাং বঙ্গ শব্দটির সাথে বঙ্গালী জাতির আদিবাসী সত্তাটিও সম্পৃক্ত। আমরা চর্যাপদেও দেখতে পাই যে বুদ্ধ সহজিয়া কবি ভুসুক পদ বলছেন,
“বাজণাব পাড়ী পউঅ্যা খালে বাহিউ।
অদঅ বঙ্গালে ক্লেশ লুড়িউ।।
আজি ভুসু বঙ্গালী ভইলী।
ণিঅ ঘরিণী চন্ডালী লেলী।।

বঙ্গালী জাতির সব থেকে নিকট জন হল কোল-সাঁওতাল জাতি। শুধু ভাষা নয় এদের জেনেটিক সম্পর্কও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। অর্থাৎ বঙ্গালা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং জীবন দর্শনের সাথে যে জনজাতির অবদান সব থেকে বেশি “বাংলা” নামকরণ করে সেই সাঁওতাল আদিবাসীদেরই অস্বীকার করা হল।

অন্যদিকে “বাংলা” একটি ভোট-চাইনিজ ভাষা। মূল সাঁওতালী ভাষার অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে এই ভাষার বিকাশ ঘটেছে। বাং+লাম = বাংলা। সাঁওতালী ভাষায় এর অর্থ দাঁড়ায় বন্ধা নয় এমন দেশ। অর্থাৎ উর্বর দেশ। লেপচা ভাষায় বাং+লাম=বাংলা হল দুর্গম দেশ। অর্থাৎ এই “বাংলা” শব্দের মধ্যে জাতি সত্তার যোগাযোগ একেবারে ক্ষীণ যা “বঙ্গ” শব্দের মধ্যে বিরাজমান। তাই বাংলা নামকরণ শুধু ঐতিহাসিক ব্লান্ডার নয় একটি মহান জাতির শিকড় ছিন্ন করার নির্বুদ্ধিতাও বটে।

এদিকে বিজেপি মনে করছে এই পশ্চিমবঙ্গ নামের পিছনে শ্যামাপ্রসাদের অবদান রয়েছে। শ্যামাপ্রসাদের লড়াইয়ের জন্য বাঙ্গালী হিন্দুরা পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্য পেয়েছিল। এই বাংলা নামকরণ নিছক লোক দেখানো নাটক। টিএমসি এবং বিজেপি দুটোই নানা কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত। ভোটের আগে এই সব কেলেংকারী থেকে মানুষের মুখ অন্যদিকে ঘোরানোর জন্যই এই নাম পরিবর্তনের বাহানা। এই বাহানায় বিজেপি এবং টিএমসি এই দুটো দলই আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে থাকবে। অর্থাৎ আরএসএসের মদতপুষ্ট দুটো দলকেই নিয়েই মানুষ আলোচনা করবে। এতে কেলেঙ্কারিগুলি ঢাকা পড়ে যাবে। কিন্তু
আদিবাসী সত্তার প্রশ্নটি বিজেপি, তৃণমূল কেউ ভাববে না!