দোলন গঙ্গোপাধ্যায়, টিডিএন বাংলা: আমাদের অর্থাৎ হিন্দু উচ্চবর্ণের ভারতবাসীর পক্ষে আজ বলা সোজা যে, চলুন ভাই সব ভুলে গিয়ে মিলেমিশে থাকি। যতই আমাদের রাজনৈতিক নেতারা (এবং আমরাও) বলি না কেন, এ মামলায় কোন পক্ষের হার অথবা জিত হয়নি, আমরা মনে মনে জানি, এ মামলায় আমাদের অর্থাৎ হিন্দু রামভক্তদের জয় হয়েছে। বিজেতার পক্ষে সব ভুলে এগোনো সম্ভব, বিশেষত সে বিজেতা যদি জানেন যে, তার বর্গের কথায়ই এখন দেশ চলে, তারাই সংখ্যাগরিষ্ট। কিন্তু সংখ্যালঘু পরাজিত নাগরিকের পক্ষে হার মেনে নেওয়া সহজ নয়। কারণ, এ তাদের ধর্মীয়, আইনী এবং নাগরিক অধিকারের লড়াই। তবু গতকাল থেকে এদেশের ইসলামধর্মালম্বী মানুষরা দেশের শান্তি রক্ষার জন্য যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছেন, যা তারা সচরাচর সবসময়ই করে থাকেন, তার জন্য আমাদের তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপণ করা প্রয়োজন।

গতকালের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামতে একথা পরিস্কার যে, ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের অবস্থা সঙ্গীন। যে গণতন্ত্রে শুধুমাত্র শাসক দল নয়, বিরোধীরা পর্যন্ত সংখ্যাগুরুর ধামাধরা হয়, তাকে আর যাই বলা যাক ন্যায়নিষ্ঠ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা চলে না। যে রাজনৈতিক পন্ডিতরা বলছেন, এসব মন্দির-মসজিদ ছেড়ে এখন ভাত-কাপড়ের লড়াই, স্কুল হাসপাতালের দাবীর প্রতি মনঃসংযোগ করা দরকার, তাদের বলি, ভাত-কাপড়, স্কুল হাসপাতালের সঙ্গে ধর্মাচরণের অধিকারের কোন বিরোধ নেই।ব্যাক্তিগতভাবে আমরা নাস্তিক অথবা আস্তিক যাই হই না কেন, একথা আমাদের মানতেই হবে, যে দেশে ধর্মের কারণের মানুষকে মব লিঞ্চিং-এর শিকার হ’তে হয়, যে দেশে ধর্মের কারণে নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে মানুষ তটস্থ থাকে, যে দেশে ধর্মীয় নাম লুকিয়ে মানুষকে সংখ্যাগরিষ্ঠের নামগ্রহণ করতে হয়, ধর্মীয় পোশাক, খাদ্যাভাস ত্যাগ করতে হয় শুধুমাত্র জীবনধারণের জন্য, সে দেশে ধর্ম একটা বড় ব্যাপার বৈকি। আর শুধু দ্বন্দ্বের কারণেই নয়, পৃথিবী জুড়ে ধর্ম এবং সংস্কৃতি গলা জড়াজড়ি ক’রে থাকে। এদেশে তো থাকেই। এদেশে মানুষের জীবনে ধর্ম এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, মহাকাব্যের চরিত্রকে দেবতা জ্ঞাণে শুধু পুজো করা হয় না, আইনী লড়াই সেই পৌরাণিক চরিত্র একজন বাদীপক্ষও বটে। মজার কথা হল, যখনই সংখ্যালঘুর, নির্দিষ্টভাবে একটি সম্প্রদায়ের ধর্মাচরণের প্রশ্ন ওঠে তখনই আমরা, হিন্দু লিবারেলরা (এবং বামপন্থীরাও), বলতে থাকি, ধর্ম ছাড়ুন, রোটি, কাপড়া অর মোকান-এ মনোনিবেশ করুন। আমাদের হিপোক্রেসির কোন তুলনা হয় না!

পরিশেষে একটা কথা বলা প্রয়োজন বোধ করছি। সমস্যা থেকে চোখ সরিয়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। খুশী খুশী ভাব করলেই সত্যিকারের সুখ আসে না। ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের আজ গভীর অসুখ। সে অসুখ কোন সম্প্রদায়কে ৫ একর জমি দান করলেই সেরে যাবে, একথা ভাবা আর মূর্খের স্বর্গে বাস করা একই কথা। যদি আমরা সত্যিই ধর্মনিরপেক্ষ, ন্যায়নিষ্ঠ, গণতান্ত্রিক মাতৃভূমি চাই, তাহলে এদেশের ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে দাবী তুলতে হবে যে, এদেশ যতটা আমাদের, ততটাই ইসলামধর্মালম্বী মানুষের, এদেশের ইতিহাসে যতখানি রামের ভাগ, ততখানিই রহিমের ভাগ। ধর্মের ভিত্তিতে যে বিভাজন, সেই বিভাজনকে ধর্মীয় অধিকারের লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন করা বড় ভুল হ’য়ে যাবে।

আর হ্যাঁ, ভাতকাপড়, ইস্কুল, হাসপাতালের লড়াই তো জারি থাকবেই।
(লেখক: কলামিস্ট ও আজাদ ফাউন্ডেশনের ডাইরেক্টর, ফেসবুক ওয়াল থেকে)