তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা : ৩ ফেব্রুয়ারি – খবরের শিরোণামে সারদা কেলেঙ্কারি। প্রকাশ্যে এল সিবিআই-কলকাতা পুলিশ দ্বৈরথ। আবার মিডিয়ার ফ্ল্যাশ লাইট সারদা কেলেঙ্কারির ওপর। আবার সেই ঘটনা মনে করিয়ে দিল একরাশ বঞ্চনা, হতাশা ও মৃত্যুর কাহিনী।

এই সারদা কেলঙ্কারি কেড়ে নিয়েছে কত মানুষের প্রাণ, কত শিশু স্কুল ছুট হয়েছে। কত মেয়ের বিয়ে ভেঙে গেছে। কত লোক বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছে।

সোনারপুরে চায়ের দোকান চালাতেন রাজীব। তাঁর বাবা পান দোকানের মালিক। পরিবারের নুন আনতে পান্থা ফুরানোর দশা। তিনি সারদার এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন কিছু বাড়তি আয়ের আশায়। সেটাই কাল হল রাজীবের।  তাঁর কথায়, আমি বন্ধু, আত্মীয় ও পড়শিদের কাছ থেকে ৯.৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছিলাম। বাবার জমানো ৫০ হাজার টাকাও সারদায় বিনিয়োগ করেছিলাম। কোম্পানি বন্ধ হতেই সবাই আমাকে কুকুরের মতো তাড়া করতে শুরু করে। আমি পালিয়ে বেড়াতে থাকি। তিনি আরো বলেন, সারদায় বিনিয়োগকারীরা আমার বাড়ি ভাঙচুর করার চেষ্টা করে। তাঁরা টাকা ফেরত পেতে চান। আমার পরিবারকে গালমন্দ শুনতে হয়। আমি নিজের পকেট থাকা কিছু টাকা ফিরিয়ে দেই। চোরের মতো বাঁচতে থাকি। রাজীবের ছেলের এরপর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, অনেক চেষ্টা করেও মরতে পারিনি, কারণ আমার একটি ছেলে আছে।

দক্ষিণ ২৪ পরগণা, পূর্ব বর্ধমান, হুগলিতে ছেয়ে আছে সারদায় কলেঙ্কারির শিকার অগণিত পরবার। কারণ এই ৩ জেলাতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ সারদার এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছিলেন। এখান থেকেই সবচেয়ে বেশি পরিবার সারদায় টাকা রেখেছিল।

দক্ষিণ ২৪ পরগণার নবপল্লি গ্রাম। এখানকার বাসিন্দা কুরবান আলির ছেলে ইসমাইল মোল্লা। তিনি বলেন, সারদা কেলেঙ্কারির পর বিনিয়োগকারীরা জোর করে তাঁর ১.৫ বিঘা জমি দখল করে নিয়েছেন। ইসমাইলের ছোট বোনের বিয়ে হয়নি। টাকার অভাবে তাঁর বিয়ে ভেঙে যায়। সারদা কেড়ে নিয়েছে তাঁর জীবনের সব স্বপ্ন। ইসমাইল বলেন, আমার বাবা ৭ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। কোম্পানি বন্ধ হতে বিনিয়োগকারীরা দিন রাত তাঁর পেছনে ধাওয়া করেন। তিনি চোরের মতো পালিয়ে বেড়ান।  এই জ্বালা সহ্য কতে না পেরে কুরবান মুম্বই পালিয়ে যান। পরে তিনি আত্মহত্যা করেন। তাঁর মৃত্যু কার্যত এই পরিবারকে রক্ষা করল। কারণ এরপর বিনিয়োগকারীরা তাঁদে পিছনে ধাওয়া করা বন্ধ করেন।

দক্ষিণ ২৪ পরগণার শকুন্তলা গ্রামের রাইমা বিবি জানালেন, তিনি মেয়ের বিয়ের জন্য সব টাকা সারদায় রেখেছিলেন। পরে কোম্পানি বন্ধ হয়ে যেতে সেই টাকা চোট হয়। তারপর আর মেয়ের বিয়ে হয়নি।

নামমাত্র কয়েকটা বিপর্যস্ত পরিবারের ছবি তুলে ধরা হল। সারদা এরকম অনেক পরিবারকে অসহায় করেছে। সিবিআই-সারদা-কলকাতা পুলিশ এসব নিয়ে ভোটের আবহে তরজা চলতেই থাকবে। গরমা গরম ইস্যু। কিন্তু বিপন্ন পরিবারগুলো আজও বাঁচার মানে খুঁজে পায় না। দেশের কাছে তাঁরা বিচারপ্রার্থী।