মোকতার হোসেন মন্ডল, টিডিএন বাংলা: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘আমিতো মুসলিম তোষণ করি’। তো ম্যাডাম, কী তোষণ করেছেন? এত হারের পরেও ফের বিজেপির মতো কথা বলছেন? মুসলিম তোষণ? এটা মুখ্যমন্ত্রীর ভাষা?

আপনার ভাষায় বলে রাখি শুনুন, স্বাধীন ভারতে হিন্দুত্বের জন্য আপনি যা করেছেন তা বিজেপির কোনও মুখ্যমন্ত্রীও করেনি। সে কথা আপনি, আপনার অভিষেক ও সচেতন হিন্দু সমাজ জানেন। আপনার মুসলিম বিদ্বেষী ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতার কয়েক হাজার নমুনা আছে। বিজেপি অযোধ্যায় বাবরির জায়গায় রাম মন্দির করেনি বলে আপনার দলের নেতাদের কী দুঃখ! রাম নবমীর প্রতিযোগিতা, দুর্গাপুজো নিয়ে মাতামাতি, এই মন্দির সেই মন্দির সংস্কার, শত কোটি খরচ করে গঙ্গা সাগর মেলা, বিবেকানন্দকে তুলে ধরতে বিবেক মেলা, প্রতি প্রকল্পের সাথে ‘শ্রী’ যোগ, বিভিন্ন পুজোয় ছুটি বাড়ানো। এই রকম হাজার প্রমাণ আছে। আরএসএস স্কুল বাড়ানো সব আপনার দৌলতে হয়েছে। আপনিতো একটিবার বললেন না যে ‘হিন্দু তোষণ’ করেন! কী এবার হিন্দু ভোট পাননি বলে মুসলিমদের আবার মুখের কোথায় ধোকা দিচ্ছেন? এতদিনতো হিন্দু ভোট পেয়েছেন সেদিনতো বলেননি। এখনও বহু হিন্দু ভোট পেয়েছেন, এত করেছেন, তবুওতো ‘তোষণ’ বলছেন না। এ রাজ্যে যতদিন মুসলিমরা আপনার সাথে থাকেনি ততদিন আপনি হেরেছেন। মুসলিম নেতাদের পায়ে পড়ে কেঁদেছেন। বাম আমলে সংখ্যালঘু বঞ্চনা নিয়ে সরব হয়েছেন। ক্ষমতায় এসে সব ভুলে গেলেন? কার চাপের কাছে মাথা নত করে সাংবিধানিক অধিকার থেকে মুসলিমদের বঞ্চিত করছেন? কেন এই ৮ বছরে বারবার চিঠি দিয়েও সামাজিক মুসলিম সংগঠনের একজন নেতার সাথে বৈঠক করার সময় পাননি ? কেন মুর্শিদাবাদে আজও ইউনিভার্সিটি হয়নি? কেন সেই ব্রিটিশ পিরিয়ডের পুরাতনগুলি ছাড়া কলকাতায় নতুন পর্যাপ্ত হোস্টেল হয়নি? কেন হুগলি মাদ্রাসাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করার বদলে ধ্বংস করছেন?

আপনিতো বাঁকুড়া জেলা পরিষদের ৪৬ টি আসনে একজন মুসলিম প্রার্থী দেননি। তার পরেও সেখানে হারলেন কেন? শুনে রাখুন, আপনাকে জেতানোর কোনও দায় মুসলিমদের নেই। সাংবিধানিক অধিকার দেবেন না, মুর্শিদাবাদ ও মালদায় জেলা তৃণমূলের দায়িত্ব দিয়ে বাকি জায়গায় হিন্দু দিয়ে দলে বিভেদের রাজনীতি করবেন, একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী করবেন না, রাজ্য সভায় হাতে গোনা সাংসদ রাখবেন, মুসলিম কোনও নেতৃত্বকে উঠতে দেবেন না, একুশে জুলাই ফিরহাদ ছাড়া আর কোনও সংখ্যালঘুকে দু’কথা বলতে দেবেন না, এমএসকে,আনএডেড অনশনকে লাঠি মেরে তুলে দেবেন, সংখ্যানুপাতে বিধানসভা ও লোকসভার প্রার্থী দেবেন না, একাধিক পুরসভায় প্রতিনিধিত্ব রাখবেন না, মাদ্রাসা নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন, চাকরি দেবেন না, ওবিসি সংরক্ষণ নীতি মানবেন না, আর আপনাকে ভোট দিতে হবে? আপনার সংখ্যালঘু উন্নয়নের নাটক নিয়ে কথা বললেই তৃণমূলের কিছু লোককে দিয়ে ভয় দেখানেন, প্রাক্তন সৎ পুলিশ অফিসার ড: নজরুল ইসলামের ‘মুসলিমদের করণীয়’ বই লেখার পর তাঁকে হেনস্থা করা হবে, তাঁর পেনশন আটকিয়ে দেওয়া হবে, তাহলে বামেদের চেয়ে আপনি আলাদা কিসের? আমরা মনে করি,কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক নীতি ও মেকি ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য বিজেপির উত্থান হয়েছে। তেমনি আপনার মিথ্যা উন্নয়নের ভাষণ আর হুঙ্কারের জন্য বিজেপি এসেছে। যুগটা যে একবিংশ শতক, মানুষ যে এখন অনেক বেশি সচেতন সেটা ভুলে গেছেন। এবারের লোকসভায় বিজেপিকে ঠেকাতে বাম-কংগ্রেস জোটের ব্যর্থতা ও বিকল্প না থাকার জন্য ভোটটা পেয়েছেন। কিন্তু এখন থেকে আপনার চোখে চোখ রেখে সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে কথা বলবে সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজ। বিজেপির ভয় দেখিয়ে সমাজটাকে বঞ্চিত করে, আরএসএসের সুরে সুর মিলিয়ে ‘মুসলিম তোষণের’ কথা বলবেন, এটা সমাজ মানবে না। আপনার দল আপনি কিভাবে বাঁচাবেন সেটা আপনার ব্যাপার, সংখ্যালঘুরা কিভাবে বাঁচবে, এদেশের সম্প্রীতি কিভাবে রক্ষিত হবে তা মানুষ চিন্তা করছে। মুখে সম্প্রীতির কথা বলে মিসরির ছুরি হলে বাংলার জন্য ভয়ঙ্কর। মালদা ও মুর্শিদাবাদ ছাড়া কোনও জেলায় তৃণমূলের জেলা সভাপতি মুসলিম করেননি কেন? তার মানে মুসলিম অধ্যুষিত জেলায় মুসলিম বাকিগুলো ফাঁকি তাইতো? এই বিভেদ সাম্প্রদায়িকতা নয়? এতদিন বাম ও কংগ্রেস এটা করেছে, তাহলে আপনি তাদের থেকে আলাদা হলেন কী করে? এই প্রশ্নে,আপনারা সব দলতো এক নীতি নিয়ে চলেন। বাম যেমন পতনের সময় বুঝতে পারেনি,তেমনি আপনি নিজেও জানেন না, খয়রাতি আর আপনার মিথ্যা সম্প্রীতির ভাষণকে বাংলার মানুষ পরিত্যাগ করেছে। বাংলার সম্প্রীতি আপনারা রক্ষা করতে পারবেন না, বাংলার চিরাচরিত শান্তি ও সম্প্রীতি এখানকার মানুষ টিকিয়ে রেখেছে। তাই বলে গণতান্ত্রিক দেশে, ধর্মনিরপেক্ষ দেশে ধর্মীয় রাজনীতি করে বিজেপির জুজু দেখিয়ে মানুষকে সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন এটা সংখ্যালঘুরা মানবে না। আগামী দিনে, বাংলায় বঞ্চিত সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই হবে, মাকড়শার জালের মতো ঠুনকো বিজেপিও শেষ হবে এবং বাংলার ১০ কোটি হিন্দু-মুসলিম-শিখ-খ্রিস্টান-আদিবাসী-দলিত-মতুয়া এক হয়ে কাজ করবে। ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক বিজেপি,তৃণমূল, কংগ্রেস ও সিপিআইএমকে পরাস্ত করে কৃষকের সরকার, শ্রমিকের সরকার, মেথর, চন্ডালের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। এই সাময়িক বিজেপির উত্থান বাংলার জনতা রুখে দেবে। বিজেপিতো কোন ছাই, অতীতে এর চেয়ে কত ভয়ঙ্কর শক্তিকে শান্তিকামী জনতা পরাস্ত করে মানবতার জয়গান গেয়েছে। আমরা শুধু বিজেপি মুক্ত দেশ চাইনা, আমরা চাই সব রকমের সাম্প্রদায়িক,কুসংস্কার মুক্ত ভারত। আমরা চাই,ক্ষুধা, ভয় ও শোষণমুক্ত সমাজ। আর এটার জন্য সর্বপ্রথম দরকার মানুষের বেঁচে থাকার সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, কোনও অজুহাতে কাউকে বঞ্চিত করে ‘জুজু’ দেখানোর খেলা বরদাস্ত করবে না বাংলা।
(লেখক একজন সাংবাদিক ও কবি। তাঁর ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া)