তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা:  “সেদিন ২১ ফেব্রুয়ারি নবজাগ্রত বাংলার গৌরব ঘোষণা করল। বাঙালির জীবনে যদি সত্যিই কোনো রেনেসাঁ ঘটে থাকে, স্বদেশ চেতনার সর্বব্যাপী বিপল স্পন্দনে ঝংকৃত হচ্ছে আজও আমাদের প্রতিটি শিরাস্নায়ু। আমাদের হৃদয় মন্থন করে জব্বর, বরকত, সালাম, রফিকুলের পবিত্র রক্ত আমাদের আত্মশ্লাঘা ও আত্ম- উদ্বোধনের পরম লগ্নটি চিনিয়ে দিল।”

—– বাংলার জন্য আমাদের শ্লাঘা, বাঙালি হিসেবে শ্লাঘা। ২১ ফেব্রুয়ারিই তো সেই পরম লগ্নটি চিনিয়ে দিয়েছে। তাই আজ বিশ্বের দরবারে বাংলার দৃপ্ত পদধ্বনি শোনা যায়। বাঙালির কাছে তা অবশ্যই শ্লাঘার। ভাষা শহিদদের রক্তদানের স্বীকৃতি এই গৌরব।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই দিনে বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষা লাভ করে বিশেষ মর্যাদা। এরপর  ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়। সেই রেওয়াজ আজও সমানভাবে চলে আসছে।

মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় জব্বর-বরকতদের মতো বাঙালিদের আত্মত্যাগের দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের দাবি উঠছিল অনেক দিন ধরেই। বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে দেশ-বিদেশে এই দাবি তোলা হয়। দেশের বাইরে প্রথম কানাডার বহুভাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষা-প্রেমিক গোষ্ঠী ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ রাষ্ট্রসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কোফি আন্নানের কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করে।

তাদের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে সই করেন সাতটি পৃথক ভাষার ১০ জন সদস্য। তারপর বিভিন্ন সরকারি প্রক্রিয়া সম্পাদনের পর ৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৯ সালে প্রস্তাবটি প্যারিসে পৌঁছায়। ইউনেস্কোর সেই অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক।

অবশেষে তাঁর নেতৃত্বে অনেক বাধা বিপত্তি পেরানোর পর ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ২১ ফেব্রুয়ারি লাভ করল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা। এদিন বাংলাদেশের সঙ্গে মূল প্রস্তাবক হিসেবে ছিল সৌদি আরব। সমর্থন দিয়েছিল প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান-সহ বিশ্বের আরো ২৩টি দেশ।

বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রসংঘের অন্যতম কাজের ভাষা করার জন্যও প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের জন্য কূটনীতিকরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে বহির্বিশ্বে ৩০টি দেশের ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় বাংলা। যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার অবাঙালি পড়ুয়া বাংলা ভাষা শিক্ষা ও গবেষণার কাজ করেন। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সংসদে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলা ভাষা।

বিশ্বের ৬টি দেশের রাষ্ট্রীয় বেতারে বাংলা ভাষার আলাদা চ্যানেল রয়েছে। কমপক্ষে ১০টি দেশের রেডিওতে বাংলা ভাষার আলাদা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে।

ব্রিটেনে ৬টি ও আমেরিকায় ১০টি বাংলাদেশি মালিকানাধীন বাংলা ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। ব্রিটেনে ১২টি বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হয়। ‘বেতার বাংলা’ নামে সেখানে একটি বাংলা রেডিও স্টেশন রয়েছে। এ মুহূর্তে বিশ্বে প্রায় ৩২ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। সাম্প্রতিক এক গবেষণার ফল বাঙালির গৌরবের পরিসর আরো বিস্তৃত করতে পারে। ২০৫০ সাল নাগাদ কেবল ১৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী বাংলা ভাষীর সংখ্যা ৩৩ কোটি ৬০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বর্তমানে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরালিওনের অন্যতম সরকারি ভাষা বাংলা। ২০০২ সালের ১২ ডিসেম্বর দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আহমাদ তেজান কাব্বাহ বাংলাকে সিয়েরালিওনের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন।

জব্বর, বরকতরা তাঁদের রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার জন্য ইতিহাস লিখে দিয়েছিলেন, আজ তারই গৌরব ছুঁয়ে যাচ্ছে সমগ্র বাঙালি জীবনকে।