মুহাম্মদ নুরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা : ভোটের ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে। হৈ হৈ করে নেমে পড়েছে সব রাজনৈতিক দল। প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হবে ঘোষিত হবে নির্বাচনী ইশতেহার। সব দলই চেষ্টা করে ইশতেহারে ভালো ভালো কথা রাখতে, নতুন নতুন পরিকল্পনা পেশ করতে। কিন্তু জিতে যাওয়ার পর নিজেদের ঘোষিত ইশতেহারের কথা মনে রাখতে চায়না কেউ। যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাজা।রাজা হয়ে জনগণকে কলা দেখানো টা একটা দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও আমরা ভোট দিই। ভরসা রাখি আমাদের গণতন্ত্রে।

আশা রাখি প্রত্যাশা করি নতুন সরকারের কাছে নতুন জনপ্রতিনিধির কাছে। এই আশাটা আছে বলেই হয়তো আমরা বেঁচে আছি, বেঁচে আছে গণতন্ত্র। প্রার্থী তালিকার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার।সবাই দাবী করে তিনিই সেরা প্রার্থী।ভাবখানা দেখে মনে হয় তিনি যেন একেবারে সাক্ষাৎ ঈশ্বরের অবতার।কিন্তু ঠিক যেই ভোট বৈতরণী পার হয়ে যায়। অমনি যে কে সেই। কে কার কথা মনে রাখে? যে নেতারা বাড়ির দ্বারে দ্বারে হা পিত্যেস হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল সেই নেতাদের টিকি খুঁজে পাওয়া ভার। তবুও আমরা আশা রাখি। চাষার পুতের আসা ছাড়া তো আর কোন গতি নেই।

আমরা আম জনতা। আমাদের আশাটাই বা কী আর প্রত্যাশাই বা কী তাও কী আমরা ভালো বুঝি? আমরা দুশো টাকায় ভোট বিক্রি করে আত্মপ্রসাদ লাভ করি। রাজনৈতিক অধিকারের কোনও মূল্য আমার কাছে নেই। আমার ভোটের মূল্য দুশ টাকা হলেও আমি খুশি, না হলেও আমার কোনো ক্ষতি নেই। আমি এমনই এক জনতা।

কিন্তু দিন বদলাচ্ছে। কাল বদলাচ্ছে।আর এই রকম হাবাগোবা হয়ে থাকলে চলবেনা। পিছাতে পিছাতে এখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আর পিছানোর কোনো জায়গা নেই। এখনও সচেতন না হলে, রুখে না দাঁড়ালে আমরাতো দেওয়ালে সেঁটে যাব। আমাদের সব হাতিয়ার ছিনিয়ে নেওয়া হবে। আমাদের আর ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ থাকবেনা।
২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচন এই রকম এক মরণ বাঁচন লড়াইয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে আম আদমিকে। তাই আসুন আমরা সচেতন হই, বোঝার চেষ্টা করি দেশের কথা মানুষের কথা।

এই দেশে আমাদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান এদেশের সংবিধান।সংবিধানই দেশের প্রাণ, সংবিধানই দেশের ভীত, সংবিধান আমাকে নাগরিকের মর্যাদা দিয়েছে, সংবিধানই দিয়েছে আমাকে ভোট দেওয়ার অধিকার। যারা ভোটে দাঁড়ায় তারাও সংবিধানের দোহাই দিয়ে ভোট চায়।আর যারা ভোটে জিতে শপথ গ্রহণ করে তারাও সংবিধানের নামে শপথ গ্রহণ করে।

কিন্তু একটি ফ্যাসিস্ট দল এই সংবিধানকে সহ্য করতে পারছেনা। তারা কথায় কথায় সংবিধান জ্বালায়। তারা ইতিমধ্যে হুমকী দিয়েছে এবার ক্ষমতায় এলে তারা সংবিধানকে উপড়ে ফেলবে। যদি জনগন তাদের কথার অর্থ না বোঝে, যদি ভুল করে আবার তাদেরকেই ক্ষমতায় নিয়ে আসে তাহলে মনে রাখতে হবে এটাই ভারতবর্ষের শেষ নির্বাচন। এরপর আর নির্বাচন করে প্রায়শ্চিত্ত করার কোনো সুযোগ থাকবেনা। তাই আমাদের দল নির্বাচন আর প্রার্থী নির্বাচনের প্রথম মাপকাঠি হতে হবে সংবিধান।

যারা সংবিধান জ্বালায় তাদের ভোট নেই। যারা ভারতের সংবিধানের মূল সূর ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যে’ বিশ্বাস করেনা তাদেরকে পরাস্ত করতেই হবে।সংবিধানের নামে শপথ নেব আর ক্ষমতায় এসেই সংবিধানকে শিকড় সহ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করব এই প্রতারকদের চিনতে ভুল করলে চলবেনা। যারা সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে এই ফ্যাসিস্টদের সাথে ঘোঁট বাঁধছে তাদেরকেও উপড়ে ফেলতে হবে। ২০১৯ এর এই নির্বাচন হবে সংবিধান রক্ষার নির্বাচন। বহুত্ব বাদ রক্ষার নির্বাচন। গণতন্ত্র রক্ষার নির্বাচন। ধর্ম নিরপেক্ষতা রক্ষার নির্বাচন। যাদের হাতে সংবিধান নিরাপদ নয়, তাদের হাতে দেশও নিরাপদ থাকতে পারেনা।

দুর্নীতি এই সরকারের আমলে আকাশ ছুঁয়েছে। ব্যাংকে গচ্ছিত সম্পদ লুঠ করে আশ মেটেনি। ব্যাংকে টাকার টান তাই নোট বাতিল করে ব্যাংকে টাকা সাপ্লাই দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।এতো ভয়ঙ্কর ডাকাতি বিশ্বে আর কোনো নজীর আছে কিনা সন্দেহ। তার থেকে বড় কথা যে সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মোদি ব্রিগেডের এই গোয়ার্তুমির সামান্য সমালোচনা করেছে তাদের উপর সাথে সাথে নেমে এসেছে নিষ্ঠুর কোপ।

রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর রঘুনাথ রাজন কে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হল। নিজের লোক উর্জিত পাটেলকে দিয়েও সন্তুষ্ট থাকতে পারলেননা। গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যে সকল প্রতিষ্ঠান অতন্দ্র প্রহরীর মত কাজ করে তাদের উপরও নামিয়ে আনা হল খাঁড়ার কোপ। রিজার্ভ ব্যাংক, ভিজিলেন্স কমিশন, সিবিআই এর মত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলিকেও গিলে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হল। এটা আমাদের দেশের গণতন্ত্রের জন্য সাংঘাতিক হুমকী। শুধু মন্দির আর মসজিদের গুজবে বেঘোর থাকলে হবেনা। দল বা প্রার্থী নির্বাচনের আগে এ কথাও মাথায় রাখতে হবে।

মৌলিক চাহিদা :

নাগরিককে মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সরকারের একান্ত প্রাথমিক কর্তব্য।মৌলিক চাহিদা বা মৌলিক অধিকার শুধু কাগজে লিখে রাখলে দায়িত্ব সারা হয়ে যায় না। রবি ঠাকুর সেই কবে শিখিয়ে গেছেন-
অন্য চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু
চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু।

এটা হচ্ছে মানুষের মৌলিক চাহিদা। যে কোনো সরকারের দায়িত্ব এই চাহিদাগুলো পূরণ করা। কিন্তু আমাদের দেশ ৭০ বছর ধরে এই অধিকার ও চাহিদা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে এসেছে। শুধু তাই নয় রাষ্ট্র লুট করে নিয়েছে মানুষের অধিকার। দেশের অর্ধেক জনগন অপুষ্টির শিকার অথচ দেশের উৎপাদিত খাদ্য দ্রব্যের শতকরা চল্লিশ শতাংশ অপচয় হয় সরকারি উদাসীনতায়।

নির্মল বায়ু তো দূরের কথা জল ও বায়ু দূষণে সরকারের সমান অবদান। খাদ্যে ভেজাল, ঔষধে ভেজাল, পানিতে ভেজাল, বায়ুতে ভেজাল।বাসস্থান নেই, শিক্ষার সুযোগ নেই, সুস্বাস্থ্যের ব্যাবস্থা নেই, কোথায় বাস করছি আমরা! রাজনৈতিক দল আর ভোট প্রার্থীদের কানে এ কথা গুলো ঢোকাতে হবে। শুধু ভোট আসে ভোট যায়, আর ‘তায়-রে-নারে-না’ করলে চলবেনা।