টিডিএন বাংলা: ধর্ষণের দিক থেকে ভারত ছুটে চলেছে ম্যারথনের গতিতে। ধর্ষিতার তালিকায় পূর্ণ যৌবনার থেকে অধিক পরিমাণ সামিল হচ্ছে অপূর্ণ বয়সের কন্যা অথবা যৌবন ঝরে পড়া বৃদ্ধরা। যাদের মধ্যে কারোর বয়স বছরের গণ্ডিও পার হয়নি নেহাত মাসের গণ্ডি পার হয়েছে। ধর্ষকদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে নব্বই উর্ধ্ব বৃদ্ধারও রেহাই নেই।

ধর্ষিতার আর্তনাদ আর ধর্ষকের নিষ্ঠুর হাসি ভারতকে বিশ্বের দরবারে লজ্জিত করে চলেছে প্রতিনিয়ত। ভারত যেন মানুষের নয়, ধর্ষকদের বসবসের যোগ্য স্থান। শাস্তি তো দূর অন্ত ধর্ষকদের এদেশে মেলে নিরাপত্তা, যা বিস্ময়কর হলেও সত্যি বটে। আজকের টুইঙ্কেলের দেহ দেখে যতটা পরিমাণ শিহরণ জেগেছিল আপনার হৃদয়ে, ভবিষ্যতের আসিফার রক্তাক্ত দেহ দেখে সেই শিহরণ ও জাগবে না দু দিন পরে। কারণ ধর্ষণ নগণ্য থেকে অতি নগণ্য বিষয়ে পরিণত হবে। প্রতিনিয়ত সংবাদপত্র অথবা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এ ধর্ষিত হওয়া ছিন্নভিন্ন দেহের দেখা পাওয়ার ঘটনা আজ কোন নতুন বা অথবা অবাক হওয়ার ঘটনা নয়, ডাল-আলু-ভাতের মত অতি সাধারণ একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকের ভারতে।

একসময় ধর্ষণের কারণ খুঁজতে গিয়ে সর্বপ্রথম উঠে আসতো ‘পোষাক’ এর কথা। পোষাক উপস্থাপিত হত মুখ্য কারণ রুপে। কিন্তু বর্তমানে পোষাক এর ব্যাপারটা একপ্রকার গৌণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে বটে। কারণ নেহাত একটা শিশুর পোশাকের মধ্যে কোন দোষ বা গুণ কিছুই থাকেনা। আজ পোশাক না পর্ণগ্রাফী, আইনের শিথিলতা, মদ্যপান ধর্ষকের পথকে উন্মুক্ত করে চলেছে প্রতিনিয়ত।

বর্তমান সমাজে স্মার্ট ফোন এর দৌলতে পর্ণগ্রাফী হয়ে উঠেছে সহজলভ্য। সমস্ত বয়সসীমা অতিক্রম করে পর্ণগ্রাফী সহজলভ্য হওয়ার ফলে সমাজের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নেহাত কিশোরের বেশ বড়ো অংশ হয়ে পড়ছে পর্ণগ্রাফীর নেশায় আসক্ত। পর্ণগ্রাফী আসক্তির ফলে নারীদের প্রতি পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ঘটছে। তাদের কাছে নারী মানে- কোন সম্মানিতা না বরং যৌন ক্ষুধা মেটানোর বস্তু। পর্ণগ্রাফী তে আসক্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ক এতটাই বিকৃত হয়ে ওঠে যে তারা বছরের গণ্ডি না পেরোনো শিশু অথবা নব্বই পেরোনো বৃদ্ধার মধ্যেও যৌন চাহিদার পন্থা খুঁজতে থাকে। তাদের লোলুপ দৃষ্টি তাদের কন্যা,বোন সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপরেও পড়ে। সম্পর্ক ভুলে তাদের আপজনের দেহেও হয়ে ওঠে তাদের বিকৃত মানসিকতার শিকার। পর্ণগ্রাফীর এই ভয়ঙ্কর নেশার প্রভাব কেবল যুবকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেয়, তা কয়েকটা ধর্ষকের বয়স সীমা ১০ বা ১২ বছর দেখলে তা ভালো মত উপলব্ধি হয়।

আইনের শিথিলতা হয়ে উঠেছে ধর্ষকদের ঢাল। যে সমস্ত নর পিশাচ দের এই পৃথিবীতে বাঁচার অধিকার নেই, তারা আইনের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে গর্বে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদের দেশের আইন এতটাই উদারমনা যে ধর্ষকের মত নরপিশাচদের বাঁচার অধিকার দিয়ে বয়স ভেদে সকল নারীর মান সম্ভ্রম কে ঠেলে দিচ্ছে চরম হুমকির মুখে। যে দেশের আইন সেই দেশের নারীদের রক্ষা করতে পারেনা সে দেশের এহেন পঙ্গু আইন থাকা না থাকার সমান বৈ কী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি ১০ মিনিটে ভারতের কোন না কোন প্রান্তে একজন করে নারী ধর্ষণের শিকার হয় অথচ আইন ধর্ষকদের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ রুপে বেখেয়াল। ধর্ষকদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া চরম অমানবিক ঘটনা হিসেবে গণ্য হলেও, রক্তাক্ত যোনি, ক্ষতবিক্ষত দেহ নিয়ে ধর্ষিতার ধুঁকতে ধুঁকতে মৃত্যু পথে এগিয়ে যাওয়াটা কিন্তু তেমন অমানবিক বিষয় হিসাবে গণ্য হয় না এই ভূখণ্ডে।

যে সমস্ত সিনেমা তারকাগণ ধর্ষণ নিয়ে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে স্বেচ্ছার হন,তাদের উদ্দেশ্য বলি একটু চিন্তার অতলে গিয়ে ভাবুন, এটা বলতে বাধ্য হচ্ছি যে ধর্ষণের পিছনে তারোকারা বেশ ভালো মতোই দায়ী। ধর্ষণের হার দিনের পর দিন বাড়া সত্ত্বেও, ‘সাহসী’ দৃশ্যের অজুহাত দেখিয়ে নগ্নতাকে সমাজে সকল শ্রেণীর মধ্যে উন্মুক্ত করা হচ্ছে, যা চরম ঘৃণ্যকর। বিনোদনের একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠি থাকা প্রয়োজন।

যে সরকার পর্ণগ্রাফী নিষিদ্ধের ব্যাপারে সম্পূর্ণ রুপে উদাসীন, ধর্ষণের সহায়ক মাদক সেবনে সমাজ একপ্রকার উৎসাহ দেয়, ধর্ষকদের কঠোর শাস্তি প্রদানের ব্যাপারে সম্পূর্ণ রূপে বিরোধিতা করে, সেই সরকার কিন্তু প্রত্যক্ষ ভাবে না হলেও পরোক্ষ ভাবে ধর্ষণের পক্ষে নিজের সমর্থনের ই জানান দেয়। এটা তিক্ত হলেও সত্য বটে। পর্ণগ্রাফী কে যদি নিষিদ্ধ না করা হয়, আইন এর যদি বদল না ঘটানো হয়, বিনোদনের নামে নগ্নতাকে যদি নিষিদ্ধ না করা হয়, যদি মদ্যপান কে নিষিদ্ধ না করা হয় তাহলে ধর্ষকদের বিচার চেয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কোন লাভ নেই, উন্নাও থেকে উত্তরপ্রদেশ, বাংলা থেকে রানাঘাট, পার্কস্ট্রিট থেকে দিল্লি সবখানে তে কোন প্রকার পরিবর্তন হবেনা, দিনের পর দিন টুইঙ্কেল, নির্ভয়ার, আসিফার সংখ্যা রীতিমতো বেড়েই চলবে। ঐ মিছিলে হয়তো ভাবি ধর্ষক ও পা মেলাচ্ছে কারণ এ ভারত ধর্ষক তৈরির কারখানা তে পরিণতে হতে চলেছে। কুলদীপ সিং সেংগার এর মতো ধর্ষকরা শত নারীর দেহ ছিঁড়ে খেলেও অন্তিমের হাসি টা তারাই হাসবে। যে সরকার নারীকে নিরাপত্তা দিতে অক্ষম সেই সরকারের নারী স্বাধীনতা, নারী শক্তির কথা মুখে আনায় বোধ করি উচিত না। এরকম যদি চলতে থাকে আর কয়েক বছর পরে ভারত নামক ভূখণ্ডে ‘ধর্ষণ’ এক মহামারি রুপে দেখা যাবে, তখন কিন্তু পিতৃক্রোড়েও কন্যা নিরাপত্তা হীনতায় ভূগবে ভয়ঙ্কর রুপে, শুধু মাত্র কন্যা নয় পুত্র সন্তানের জন্যও এ ভারত হবে বসবাসের অযোগ্য স্থান।

আফরিদা খাতুন আঁখি
বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটি