সুরাইয়া খাতুন, টিডিএন বাংলা : “ভেড়া বা শিয়ালের মতো দু’শ বছর বাঁচার চেয়ে বাঘের মতো দু’দিন বেঁচে থাকাও ভালো।” -এমন সাহসিকতাপূর্ণ উক্তির বক্তা ছিলেন টিপু সুলতান। যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে এক বিভীষিকা, এক জলন্ত আতঙ্ক। কারন তাঁর সাহসিকতা, বীরত্ব, দেশপ্রেম আর বিচক্ষণতা। তাঁর এই অসীম সাহসিকতা ও তেজস্বীতার জন্য তাঁকে ‘শের-ই-মহীশূর’ (মহীশূরের বাঘ) উপাধি দেওয়া হয়। টিপু সুলতানের রাজ্যের প্রতীক ছিলো বাঘ। বাঘ ছিলো তাঁর অনুপ্রেরণার মতো। তিনি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কারিগর দিয়ে কাঠের ফ্রেমের উপর সোনার পাত বসিয়ে তার উপর মণিমুক্তা ও রত্নখচিত একটি সিংহাসন বানিয়ে নিলেন, যাকে বরং ‘ব্যাঘ্রাসন’ই (Tiger throne) বলা যায়। ভারতীয়দের মধ্যে টিপুকে নিয়ে কিছু ইতিহাস বিকৃতি ছড়ানো হচ্ছে। আসুন আমরা জেনে নিই প্রকৃত সত্যটা।

টিপু সুলতান ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে যেসব হাতিয়ার ব্যবহার করেছেন তা ছিলো অত্যন্ত আধুনিক মানের এবং ব্যতিক্রমী। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথম রকেট প্রযুক্তি ব্যবহার করেন টিপু। সেই যুদ্ধের একটি চিত্র নাসার মেরিল্যান্ড অফিসে সংরক্ষিত আছে। ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি ছিলেন টিপু সুলতান। তাই ১৭৯৯ সালের ৪ মে ‘মহীশূরের বাঘ’ টিপু সুলতানের মৃত্যু সংবাদ শুনতে পেয়ে ওয়েলেসলি বলেন “গোটা ভারতবর্ষই এখন আমাদের”।

টিপু সুলতানের মৃত্যুর পরপরই অনেকগুলো লোকসংগীত ও শোকগাঁথা রচিত হয়। কর্ণাটকের লোকসাহিত্যের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রিটিশবিরোধী হাতেগোনা কিছু গোত্রপতি ছাড়া আর কোনো সম্রাটকে নিয়ে কর্ণাটকে শোকগাথা রচিত হয়নি। আর এই শোকগাথা বা ‘লাভানা’গুলোর জনপ্রিয়তাই এই নেতার গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়। কর্ণাটকের জনপ্রিয় উৎসব ‘টিপু জয়ন্তী’।

ভারতের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক বিভেদ যতই জোরালো হচ্ছে, ততই জোরালো হচ্ছে টিপু বিদ্বেষ। গতকাল টিপু সুলতানের জন্মজয়ন্তী পালনে বাধা দেয় গেরুয়া শিবির। তাহলে তো বলা যায়, বিজেপি হল ব্রিটিশদের উত্তরসূরি?

অনেকে টিপু সুলতানকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে চায়। তিনি নাকি তরবারির ভয় দেখিয়ে অনেক হিন্দু নারীকে মুসলিম বানিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে অন্য কথা। আজ থেকে কয়েকশ’ বছর আগে  কেরালায় হিন্দুদের মধ্যে এক প্রকার ট্যাক্স বা কর প্রচলিত ছিল। করটির নাম ‘স্তনকর’ (breast tax)। এর আরেকটি নাম  ‘মুলাককারাম’ (mulakkaram)। নিয়ম ছিলো শুধূ ব্রাহ্মণ ব্যতিত অন্য কোন হিন্দু নারী তার স্তনকে ঢেকে রাখতে পারবে না। বাকি হিন্দু শ্রেণীর নারীদেরকে প্রকাশ্যে স্তন উন্মুক্ত করে রাখতে হতো। তবে যদি কোন নারী তার স্তনকে কাপড় দ্বারা আবৃত করতে চাইতো, তবে তাকে স্তনের সাইজের উপর নির্ভর করে ট্যাক্স বা কর দিতে হতো। এই নির্মম করকেই বলা হয় ‘স্তনকর’। বিষয়টি নিয়ে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা পর্যন্ত করতে হয়েছে তাদের।

১৮০৩ সালে নাঙ্গেলী (Nangeli) নামক এক নারী তার স্তনকে আবৃত করে রাখে। যখন গ্রামের ট্যাক্স কালেকটর তার থেকে স্তনকর চাইতে আসে, তখন সে তা দিতে অস্বীকার করে এবং নিজের দুটি স্তনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে পাতা দিয়ে মুড়ে ট্যাক্স কালেকটরকে দেয়। স্তন কেটে ফেলার কিছুক্ষন পরেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য নাঙ্গেলীর মৃত্যু হয়। স্ত্রীর মৃত্যু শোকে নালেঙ্গীর স্বামীও সাথে সাথে আত্মহত্যা করে।

উনিশ শতাব্দীর মাঝে এসে যখন কিছু হিন্দু নারী তাদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করার অধিকার দাবি করে, তখন হিন্দু পুরোহিতরা স্পষ্ট করে বলে দেয়, নিচু বর্ণের নারীদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করা ধর্ম বিরোধী। বিষয়টি নিয়ে ১৮৫৯ সালে দক্ষিণ ভারতে একটি দাঙ্গা সংগঠিত হয়। এই দাঙ্গার উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু নারীদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করার অধিকার আদায় করা। এই দাঙ্গায় ‘কাপড়ের দাঙ্গা’ হিসেবেও পরিচিত।

টিপু সুলতান হিন্দুদের বর্ণপ্রথার এই অন্যায় রীতিকে  মোটেও পছন্দ করেননি। তিনি চেয়েছেন এই নগ্নতা বন্ধ হোক। তিনি হিন্দু নারীদের আহবান করেছিলেন- “যদি তোমরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করো, তবে কাপড় পরার অধিকার পাবে।” –টিপু সুলতানের এ কথা শুনে হাজার হাজার হিন্দু নারী তাদের ইজ্জত বাঁচাতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল।

আর এ সম্পর্কে হিন্দু ইতিহাসবিদ সুরজিত দাসগুপ্ত বলে- “ঐ সময় হিন্দু নিম্নবর্ণের লোকদের উর্ধাঙ্গ অনাবৃত রাখতে হত। সে সময় ভারতবর্ষের কেরালাতে অমুক হিন্দু নারী ইসলাম গ্রহণ করেছে এটা বলার প্রয়োজন ছিল না, বলতে হতো শুধু ‘কুপপায়ামিডুক’ শব্দখানা। এ শব্দখানার অর্থ ‘গায়ে জামা চড়িয়েছে’। (সূত্র: বই-সুরজিত দাসগুপ্তের ‘ভারতবর্ষ ও ইসলাম’, পাতা-১৩০-১৩১)

Not available