সামাউল্লাহ মল্লিক

আজ ২৪ অক্টোবর, রাষ্ট্রসংঘ দিবস (UN Day)। ১৯৪৫ সালের এই দিনে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্ব সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। ৭৩ বছর পেরিয়েও রাষ্ট্রসংঘ কি আমাদের শান্তি দিতে পেরেছে? এইদিন পালনের পর কি শান্তি ফিরবে? নাকি আতশ কাঁচ দিয়ে খুঁজতে হবে? আলোকপাত করছেন – সামাউল্লাহ মল্লিক।

আজ ২৪ অক্টোবর, রাষ্ট্রসংঘ দিবস। ৭৩ বছর পূর্ণ করে ৭৪ বছরে পা রাখছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সংগঠন রাষ্ট্রসংঘ। ভারত সহ পুরো বিশ্বে যথাযোগ্য মর্যাদা ও বিভিন্ন আয়োজনে দিবসটি পালিত হয়। লিগ অব নেশনস বিলুপ্ত হয়ে গেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্ষমতার এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি গঠন করা হয়। ১৯৪৫ সালের এই দিনে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্ব সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৫৬ সালের ১০ জানুয়ারি বিশ্বের ৫১টি দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারের সেন্টার হলে রাষ্ট্রসংঘের প্রথম সাধারণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মিত্র পক্ষের দেশগুলো অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করেন। এরপর বিশ্বের ৫০টি দেশের প্রতিনিধিদের অংশ গ্রহণে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে রাষ্ট্রসংঘ প্রতিষ্ঠা ও এর নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর দেশগুলোর প্রায় চার বছরের চেষ্টা ও ধারাবাহিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে আজকের এই দিনে এসে প্রাথমিকভাবে ৪৬টি সদস্য-দেশ রাষ্ট্রসংঘ সনদকে অনুসমর্থন দেয়। পরবর্তীকালে ১৯৪৭ সালের রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ পরিষদে ২৪ অক্টোবরকে রাষ্ট্রসংঘ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।

বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, জাতিগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিস্তারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা এবং সেইসাথে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মানাবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে সবাইকে উৎসাহিত করাই ছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য। কিন্তু চির প্রত্যাশিত সেই শান্তি কিন্তু অধরাই। কেননা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতশীন রাষ্ট্রের কাছে রাষ্ট্রসংঘকে নতিস্বীকার করতে হচ্ছে। দুর্বল রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রসংঘের সকল বিধিবিধান মেনে চললেও শক্তিশালী পরাশক্তির কাছে নতিস্বিকার রাষ্ট্রসংঘের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। এভাবে চলতে থাকলে এ পৃথিবীজুড়ে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হতে বাধ্য। দেশে দেশে জাতি-দাঙ্গা হয়ে উঠবে রোজকার ঘটনা। পৃথিবীজুড়ে যা চলছে তাতে মনে হয় আজ আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবী আজ সত্যিই বড় বিপন্ন। সারা বিশ্ব আজ মারণাস্ত্র প্রয়োগের পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে। এ অবস্থা থেকে বিশ্বকে ফিরিয়ে আনতে হলে রাষ্ট্রসংঘকে শক্ত হতে হাল ধরতে হবে। বিশ্বের নানা অমিমাংসিত সমস্যা সমাধানে এ সংস্থাটিকে নিরপেক্ষ ভূমিকা রেখে কাজ করতে হবে।

বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের যে কোনো মানুষের দুঃখ-কষ্টই অপর মানুষের জন্য কষ্টকর। এ ধরনের ঘটনা তা ফ্রান্সেই ঘটুক আর ফিলিস্তিন, ইরাক, লেবানন বা সিরিয়াতেই ঘটুক, মানুষ ব্যথিত ও দুঃখিত হবেই। বর্তমানে সন্ত্রাসবাদ বিশ্বের মুসলমানদের অভিন্ন সমস্যা। তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দেদার অভিযোগ করা হচ্ছে। কিন্তু সবার জানা প্রয়োজন, সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানরা যে অনিরাপত্তা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়েছে, তার সঙ্গে ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া ও আফগানিস্তানের মানুষের কষ্টের দুটি বড় পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত. মুসলিম বিশ্ব দীর্ঘ মেয়াদে আরও ব্যাপক মাত্রায় বড় ধরনের হিংস্রতা ও সহিংসতার শিকার। দ্বিতীয়ত. দুঃখজনকভাবে নানা কৌশলে ও কার্যকর পন্থায় এসব সহিংসতার পেছনে সমর্থন দিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন বৃহৎ শক্তি। মুসলিম বিশ্বে ইসলামি জাগরণের বিষয়ে পাশ্চাত্যের দ্বিমুখী আচরণ পাশ্চাত্যের নীতিতে স্ববিরোধিতার প্রমাণ বহন করছে। তাদের স্ববিরোধী আচরণের আরেকটি প্রমাণ হল, ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের প্রতি সমর্থন। ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনগণ ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে সবচেয়ে ঘৃণ্য সন্ত্রাসবাদের মোকাবেলা করছে। আমরা রাষ্ট্রসংঘের কাছে এই বিশেষ দিনে প্রত্যাশা করব, তারা গভীর দৃষ্টি দিয়ে ইসলাম সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা লাভ করার পাশাপাশি অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মুসলিম বিশ্বের ব্যাপারে একটি সঠিক ও সম্মানজনক পন্থা অবলম্বন করবে। তখন দেখ যাবে, অচিরেই এই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ভবনটি তার নির্মাতাদের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা সৃষ্টিকারী ছায়া বিস্তার করবে, তাদেরকে শান্তি ও নিরাপত্তা উপহার দেবে এবং বিশ্বাঙ্গনে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতি আশার আলোর সঞ্চার করবে। অথর্বতা পরিহার করে রাষ্ট্রসংঘ আরও সচল এবং শক্তিশালী হবে শান্তি ফিরে আসবে সারা বিশ্বে, রাষ্ট্রসংঘ দিবসে এটাই প্রত্যাশা।