আবু যুবাইর, টিডিএন বাংলা : অতিক্রান্ত হলো ২৬ জানুয়ারী। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস। ঐতিহাসিক এই দিনের অনুষ্ঠান ও কুঁচকাওয়াজ দেখতে গ্রাম গঞ্জ থেকে ভোর হতেই কলকাতায় ছুটে আসছে আবাল বৃদ্ধ বনিতা। চল চল আগে চল নইলে সামনে জায়গা পাওয়া যাবেনা। পিছন থেকে কিছুই দেখা যাবেনা। যদিও বাড়িতে বাড়িতে টেলিভিশন আছে হাতে হাতে মোবাইলেও কলকাতার অনুষ্ঠান দেখা যায়। তথাপি স্বচক্ষে দেখার মজাটাই আলাদা এই মজা নেওয়ার জন্যই কাকভরে ছোটে আম জনতা।

একটু থমকে একজনকে প্রশ্ন করলাম কোথায় যাও? প্যারেড দেখতে, প্যারেড দেখতে। আরে কিসের প্যারেড? উত্তর এলো অতো বুঝিনি বাপু। এরপর কম বয়সী ছাত্র গোছের একজনকে ধরলাম। বজবজ লাইনের সন্তোষপুর থেকে আসছে। সে অবশ্য সপ্রতিভ। আজকের যে প্রজাতন্ত্র দিবস এবং এটা যে একটা জাতীয় দিবস সেটা অবশ্য তার জানা আছে।কিন্তু প্রজাতন্ত্র জিনিসটা কী, কেনো তা পালন করা হয়– সেটা তার জ্ঞানের বাইরে। তার চেয়ে বড় ইন্টারেস্টিং বিষয় এ সকল বিষয় প্রশ্ন করতেই তাকে এমনভাবে তাকাতে দেখলাম যেন মহা ভুল করেছি আমি। এসব আবার কী? এগুলি জানার দরকারই বা কী ছুটির দিন ঘুরতে এলাম বাস এটাই যথেষ্ট। অনেকে অবশ্য গড় গড় করে বলে গেলেন। এটা আমাদের স্বাধীনতা দিবস। আরে আমাদের দেশ কে স্বাধীন করার জন্য অনেক বিপ্লবী প্রাণ দিয়ে ছিলেন তাঁদের স্মরণ করার জন্য এই দিন পালন করা হয়।

প্রজাতন্ত্র দিবসের আলোচনায়ও চলমান রাজনীতি এতটা থাবা বসিয়েছে যে আসল ঐতিহাসিক বিষয়টা হারিয়ে যেতে বসেছে। এদিনেই ভারত রত্ন দেওয়া হয়। সুতরাং কার ভারতরত্ন পাওয়া উচিত আর কার পাওয়া উচিত নয় এ বিতর্ক তো থাকেই। এখন আবার ভারত রত্ন সম্মান পাওয়ার জন্য নিখাদ দেশপ্রেম বিচার্য বিষয় থাকছেনা। কোন ব্যক্তি শাষক দলের কতটা অনুগ্রহ ভাজন সেটাও অন্যতম বিচার্য বিষয়। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, বঙ্গসন্তান প্রণব মুখার্জির ভারত রত্ন পাওয়ার বিষয় নিয়ে টিপ্পনি কম হচ্ছেনা। তিনি আরএসএসের দফতরে গিয়েছিলেন, দরাজ দিলে আরএসএসের প্রসংসা করেছেন এজন্যই তাঁর ভারতরত্ন পুরস্কার।

এসব আলোচনার মাঝে প্রজাতন্ত্র দিবসের তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া সত্যিই খুব মুশকিল। এটা যে ভারতবর্ষের সংবিধান প্রণয়নের দিন, ১৯৫০সালের এই দিনে ভারত যে তার সংবিধান চালু করার ঘোষণা দিয়েছিল কুচকাওয়াজ এর আওয়াজে আর জিলাপি খাওয়ার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ তা কী করে বুঝবে। ২৬ এ জানুয়ারী যে প্রকৃত সংবিধান দিবস এই কথাটা মনে হয় আলোচনা থেকে খুবই উপেক্ষিত থেকে গেছে। আর এটাই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।

আমাদের দেশ এক বিশাল দেশ।বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই যে এ দেশের মূল সূর তা বেঁধে দিয়েছে আমাদের সংবিধান। নানান ঘাত প্রতিঘাত এর মধ্যে দিয়েও এদেশ যে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তার মূল কারণ এদেশের সংবিধান। ১৯৪৯ সালের ২৬ এ নভেম্বর বাবা সাহেব আম্বেদকর এর নেতৃত্বে সংবিধান সভা এক ভারসাম্যপূর্ণ সুবিশাল সংবিধান উপহার দেন দেশ বাসীকে।১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারী তা কার্যকর করা হয়। সংবিধান প্রণয়নের জন্য এ দিনটিকে যে কারণে বেছে নেওয়া হয়েছিল তারও একটা ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে । ১৯৩০ সালের এই দিনে জাতীয় কংগ্রেস ব্রিটিশ রাজের ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস প্রত্যাখ্যান করে পূর্ণ স্বরাজ এর দাবী পেশ করেন।সেদিন থেকেই এ দিন টাকে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে বিশ্লেষণ করলে প্রজাতন্ত্র দিবসের সঙ্গে সংবিধানের নিবিড় সম্পর্ক বুঝা যায়। আসলে এদিন সংবিধান রক্ষার শপথের দিন।সংবিধান এর গুরুত্ব বোঝানোর দিন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যারা আজ প্রজাতন্ত্র দিবসে লালকেল্লায় দাঁড়িয়ে যাঁরা ভাষণ দেন তাঁরাই সংবিধানকে অবমাননা করেন সবচেয়ে বেশি।সংবিধানের নামে শপথ গ্রহণ করে গদিতে বসার পর সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা তারা সম্পুর্ন ভুলে যায়। বর্তমান কেন্দ্রের ক্ষমতাশীন সরকার তো এই সংবিধান মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর। এই ক্রান্তি লগ্নে দাঁড়িয়ে প্রকৃত দেশ প্রেমিকদের দ্বিগুণ দ্বায়িত্ব পালন করতে হবে। সংবিধানের গুরুত্ব ও সংবিধান প্রণেতাদের সুদূর প্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। বইচিত্রে ভরা এই দেশকে ফুলের মালার মত ধরে রেখেছে যে সংবিধান সেই সংবিধান সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে।সংবিধান কে জানা ও সংবিধান রক্ষা করার শপথের মধ্য দিয়েই পালিত হতে পারে প্রকৃত প্রজাতন্ত্র দিবস।