ডা. মসিহুর রহমান :  অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রস্তাবে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে কট্টর মুসলিম বিরোধী দল শিবসেনা, সংঘ পরিবার ৷ বিজেপি ও শিবসেনা যাদের রাজনীতিই হল মুসলিম বিদ্বেষ নির্ভর, তারাই ‘প্রগতি’ র জন্যই অভিন্ন দেওয়ানী বিধি চালু করার পক্ষে ৷ হাস্যকর ঠেকছে !
আর এস এস কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার অবসান চায় ৷ বাবরি মসজিদতো এরাই ভেঙেছে ৷ তার জায়গায় রাম মন্দির তৈরীতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ৷আর অভিন্ন দেওয়ানী বিধি চালু করার লক্ষে সংঘ পরিবার আদাজল খেয়ে লেগেই আছে ৷ উপরোক্ত তিন এজেন্ডাকে আবহমান কাল থেকে সংঘ-বিজেপি ধরে রেখেছে ৷ যারা হর হামেশাই মুসলিমদের পাকিস্তান যেতে বলে, দাঙ্গা -হাঙ্গামা বাধিয়ে মুসলিম নারী-শিশুদের সর্বনাশ করে, মুসলিম পরিবারগুলোকে বিধ্বস্ত করে থাকে, গুজরাটে ২০০০ এর বেশী মুসলিম হত্যার নায়ক যারা তারাই মুসলিম নারীদের জন্য কুম্ভীরাশ্রু ফেলছে ৷ যারা মুসলিমদের চাকরি থেকে বঞ্চিত করতে চায়, যারা মুসলিমদের ব্যাংক লোন দিতে চায় না, যারা মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশিপের টাকা কমিয়ে দেয় ( উল্লেখ্য, মোদী সরকার এবারে কমিয়ে দিয়েছে ), তারাও মুসলিম নারীদের স্বার্থে সমানাধিকারের নামে অভিন্ন দেওয়ানী বিধি চাইছে ৷ এসব চালাকি ছাড়া কিছুই নয় ৷ হিন্দু স্বামীরা হিন্দু কোড বিলে যে যাতনায় পড়েছে, তার থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে ইসলামী আইনের ওপর কোপ ফেলতে চাইছে ৷ হিন্দু স্বামীরা একজন পথভ্রষ্ট, অত্যাচারী, পরিবারে ধ্বংস ও ব্যাপক অশান্তি সৃষ্টিকারী স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে না ৷ দিতে হলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় ৷ তালাক দিলেও তার খোরপোশ বহন করতে হয় ৷ স্বামীর ঘর করবে না, পর পুরুষের সঙ্গে চাইলে জলকেলি করবে, আর প্রাক্তন স্বামীর কাছে মাস মাইনের মত খোরপোষের টাকা নেবে, সেই আইন মুসলমানদের উপর চাপাতে চায় ৷ হিন্দুদের উচিত ইসলামের শরীয়তি আইনকে সম্মান দেখানো ৷ এই আইন মানুষের শ্রষ্ঠার দেওয়া আইন ৷ এই আইনে ভারসাম্য আছে ৷ এখানে হিকমত ( বিজ্ঞতা ) আছে ৷ ইসলামে নারী ও পুরুষের অধিকারে সমতা আছে ৷ পাটি গনিতের ন্যায় ১-১,২-২ এই অর্থে সমান সমান অধিকার কার্যত কোনো প্রতিষ্ঠানে থাকেনা ৷ যার  যেমন দায়িত্ব কর্তব্য সেই নিরিখে তার অধিকার এখানে স্বীকৃত ৷
একজন প্রধান শিক্ষকের অধিকার ও একজন সহশিক্ষকদায়িত্ব কর্তব্যের অধিকার এক নয় স্কুলের কর্মক্ষেত্রে ৷ একজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব ও কর্তব্যের নিরিখে যে অধিকার ভোগ করেন, তাঁর সহকারী মন্ত্রী একই অধিকার পান না ৷ অথচ উভয়েই মানুষ ৷ এই সত্যটা স্বামী ও স্ত্রীর ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য ৷ হিন্দুদের সমস্যা হল তাদের স্মৃতিকাররা যে আইন পারিবারিক জীবনে দিয়ে গেছেন তা সত্যিই অচল ৷মনুর আইন, বৃহস্পতিবার আইন বা জাজ্ঞবল্কের আইন এ যুগে চলতে পারেনা ৷ এসব বৈদিক মস্তিষ্ক প্রসূত আইন ৷ অচল বলে তাই এই যুগে হিন্দুরা পাশ্চাত্য আইনকে মেনে সংশোধিত রূপ দিয়েছে ৷ তাঁরা পাশ্চাত্যের আইনকে ‘প্রগতিশীল’ আইন বলে মেনে থাকে, অথচ পাশ্চাত্য আইন ভূলের উর্ধে নয়, একথা অভিজ্ঞতালব্ধ ৷ পাশ্চাত্য  না খ্রীষ্টধর্মকে পুরোপুরি মেনে পারিবারিক আইন তৈরী করেছে, আর না মানব রচিত আইনকে অস্বীকার করেছে ৷ আধুনিক পাশ্চাত্য আইন মানব রচিত আইন ৷ এর পরিণামে পাশ্চাত্য দেশের পরিবারগুলো নরক গুলজারে পরিণত হয়েছে ৷ আমেরিকায় এখন ৫০ শতাংশ মানুষ পারিবারিক জীবন যাপন করেনা, ইউরোপের সুইডেনের অবস্থা এইদৃষ্টে খুবই খারাপ ৷ পারিবারিক মূল্যবোধ ভেঙে গেছে খ্রীষ্টীয় ইউরোপের দেশগুলিতে ৷ ভারতে হিন্দুদের মধ্যে একাধিক বিবাহ বেশী ৷ ডিভোর্স নিতে গিয়ে আদালতে পারিবারিক কেচ্ছা কাহিনী বেরিয়ে পড়ে ৷ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ডিভোর্স হয় ৷ তারপরেও খোরপোশ চাপায় স্বামীর উপর ৷ স্বামী তখন বাধ্য হয় আদালতে না গিয়ে স্ত্রীকে খুন করতে ৷ যে পারেনা তার জীবন একেবারে কষ্টকর হয়ে ওঠে ৷ এ হল হিন্দু সমাজের করুন পরিণতি ৷ ইসলাম তালাক কে শেষ উপায় হিসাবে দেখে ৷ তালাক আল্লাহ্‌র কাছে বৈধ কাজের মধ্যে ঘৃণিত কাজ ৷ তবুও নেসেসারি ইভিলসের ন্যায় ঘরকে ঘতুগৃহের হাত থেকে বাঁচাতে তালাকের ব্যবস্থা রেখেছে ৷
স্বামী তালাক দেওয়ার প্রকৃত অধিকারি, কেননা সে পরিবারের কর্তা ৷ স্ত্রীর তামাম অর্থনৈতিক, সামাজিক,পারিবারিক নিরাপত্তা তার জিম্মায় ৷ মোহরানা দিয়ে সে বিয়ে করেছে তাই তালাক দেওয়ার অধিকার তার ৷ তবে স্ত্রীও আল্লাহ্‌র দেওয়া অধিকার হিসেবে বিবাহ বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে ৷ এর জন্য খোলা নিতে পারে ৷ তালাক ও খোলা বৈধ সম্মত হওয়া উচিত ৷ ইসলামের আইন পাশ্চাত্যের মতো ভারসাম্যহীন নয় ৷ কঠোর নয়, আর একেবারে সহজ নয় ৷
যারা অভিন্ন দেওয়ানী বিধি চাচ্ছে কোন্ আইনের ভিত্তিতে তারা অভিন্ন দেওয়ানী বিধি প্রনয়ন করবে তা বিচার্য বিষয় ৷ হিন্দুর আইনে, পাশ্চাত্যের আইনে, না অন্য ধর্মের আইনের ভিত্তিতে হবে ? তাহলে কেন সবাই তা মেনে নেবে ? মুসলিম শাসনামলে তো ব্যাক্তিগত আইনে হস্তক্ষেপ করা হয়নি তাহলে ইসলাম উদার, না আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা উদার ৷ হিন্দুত্ববাদীদের কথাতো ছেড়েই দিলাম ৷ এরাতো স্বৈরচারী, সাম্প্রদায়িক, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকারী ৷ দেশের সংবিধান প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাধীনতার যে গ্যারান্টি দিয়েছে, সেই মোতাবেক যে যার ধর্মীয় ব্যাক্তিগত আঈন অনুসরণ করে চলুক, এটাই ন্যায় পন্থা ৷ জোর করে অভিন্ন দেওয়ানী বিধি চাপানো আসলে সংবিধানকে অমান্য করা হচ্ছে এ বোধদয় সবার থাকা উচিত।