টিডিএন বাংলা ডেস্ক : হিন্দুত্ববাদের স্লোগান দিয়ে সরকারে আসা বিজেপির মোকাবেলায় নিজেদের ‘সেকুলার’ বলে উল্লেখ করা জাতীয় কংগ্রেসও একই পথ অবলম্বন করছে। দলের সভাপতি রাহুল গান্ধি থেকে শুরু করে অপরাপর শীর্ষস্থানীয় কংগ্রেস নেতারা হিন্দুত্ববাদের সমর্থক ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও ধর্মাশ্রিত ভাষাভঙ্গি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। তাদের কেউ কৈলাসে তীর্থযাত্রা করছেন, কেউ মন্দিরে মন্দিরে ঘুরছেন, কেউ প্রতিটি পঞ্চায়েতে গোশালা বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, কেউ বা রামায়ণে বর্ণিত রাম-সীতার বনবাসে যাওয়ার পথ চিহ্নিত করে নতুনভাবে গড়ে দেওয়ার ওয়াদা করছেন। কংগ্রেসের কারও কারও দাবি, তারা বিজেপির চেয়েও ‘বেশি হিন্দু।’ এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি রাহুল গান্ধিকে নিয়ে করা পোস্টারে কংগ্রেস তার ব্রাহ্মণ পরিচয়কে সামনে এনেছে। ‘নেহুরুর সেকুলারিজম’ ছেড়ে কংগ্রেস রাজনীতিবিদরা যে ধরণের প্রচারণা চালাচ্ছেন তাকে ‘নরম হিন্দুত্ববাদে ঝুঁকে পড়া’ হিসেবে দেখা শুরু হয়েছে।

গত ২৬ এপ্রিল কর্নাটক থেকে দিল্লিতে ফেরার সময় রাহুল গান্ধি ও তার সহকর্মীদের বহনকারী বিমানটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এক পাশে আশঙ্কাজনকভাবে হেলে পড়ে এবং দ্রুত নিচের দিকে নামতে থাকে। এক পর্যায়ে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় এবং নিরাপদে অবতারণ করে। এর তিনদিন পরে ২৯ এপ্রিল রাহুল কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরে তীর্থ যাত্রার ঘোষণা দেন। ২১ আগস্ট তিনি কৈলাসে তীর্থ যাত্রা শুরু করেন, যা চীনের তিব্বতে অবস্থিত। নিউজ এইট্টিন জানিয়েছে, কৈলাশ পর্বতের মানস সরোবরে তীর্থ যাত্রার পর সেপ্টেম্বরের ২৪ তারিখ রাহুল তার নির্বাচনি আসন আমেথিতে গিয়েছিলেন। সেখানে কংগ্রেস সমর্থকরা তাকে ‘হর হর মহাদেব’ শ্লোগানের সঙ্গে বরণ করে নেন। আমেথিতে তাকে ‘শিবভক্ত’ হিসেবে আখ্যায়িত করে পোস্টারও লাগানো হয়। সেখানে তিনি শিবের প্রতি পুষ্পাঞ্জলিও অর্পন করেন। এসময় গেরুয়া বসনে থাকা কংগ্রেস কর্মীরা ‘বোম বোম ভোলে’ স্লোগানে মুখরিত করে রেখেছিলেন সভাস্থল।

রাহুলের এই ধর্মীয় কর্মসূচির প্রেক্ষিতে সমালোচনায় মুখর হয় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সবচেয়ে বড় দল বিজেপি। তারা মন্তব্য করে, ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টার অংশ হিসেবেই রাহুল ধর্মীয় বিষয়কে সামনে নিয়ে আসছেন। রাহুলের তীর্থযাত্রা তাদের ভাষায়, ‘হানিমুন ট্যুরিজম।’ এর প্রতিবাদে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিবাদের ভাষা লক্ষণীয়। কংগ্রেসের নেতা রণজিৎ সুরজেওয়ালা বলেছেন, বিজেপি এমন ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে ‘মাহাদেব ও মা পার্বতীর গৃহের অবমাননা’ করেছে। তার ভাষ্য, ‘আমরা মহাদেবের কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি বিজেপি নেতাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেন।’

টাইমস অফ ইন্ডিয়া জানিয়েছে, কৈলাশের তীর্থযাত্রা থেকে ফেরত আসার পর রাহুলকে শিবভক্ত হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে প্রচারণা অব্যাহত রাখে কংগ্রেস। ১৭ সেপ্টেম্বর কর্মী সমাবেশে যোগ দিতে এলে ভোপাল ছেয়ে যায় তার পোস্টারে, যেখানে তাকে ‘শিবভক্ত’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখ থেকে মধ্যপ্রদেশের বিন্ধ্যাচল অঞ্চলে কংগ্রেসের নির্বাচনি প্রচারণার শুরু করেন রাহুল। এই কাজ শুরুর আগে তিনি চিত্রকূট শহরের কামতা নাথ মন্দিরের বিখ্যাত রাম দরবার দর্শন করে আসেন। হিন্দু ধর্মের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৪ বছরের জন্য বনবাসে যাওয়া রাম সেখানেই ১২ বছর কাটিয়েছেন। চিত্রকূটে ‘শিবভক্ত’ রাহুলকে নতুন আরেকটি পরিচয়ে পরিচিত করিয়ে দেওয়া হয়। এবার তার পরিচয় হয় ‘রামভক্ত পণ্ডিত রাহুল গান্ধি।’ সেই অনুযায়ী পোস্টারও ছাপানো হয়। পোস্টারে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধির সঙ্গে স্থান পান দেবতা রাম।

২০১৮ সালেই মধ্যপ্রদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ধর্মাশ্রয়ী প্রচারণা জোরদার করেছে কংগ্রেস। মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা দ্বিগবিজয় সিং আশ্বাস দিয়েছেন, ক্ষমতায় গেলে রাম–সীতা যে পথে বনবাসে গিয়েছিলেন বলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন সেই পথ চিহ্নিত করে নতুন করে গড়ে দেওয়া হবে। ‘রাম বন গমন পথ যাত্রা’ চিত্রকূট শহর হয়ে যাবে। এটি কার্যত বিজেপির প্রস্তাবিত ‘রামায়ণ সার্কিটের’ অংশ। মধ্যপ্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কমল নাথ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, গরুদের নিরাপদ রাখার জন্য তারা প্রতিটি পঞ্চায়েতে একটি করে গোশালা তৈরি করবেন।

মধ্যপ্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার পর থেকে কমল নাথও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করে যাচ্ছেন একের পর এক। গত মে মাসে তিনি দর্শন করেছেন লালঘাটি হনুমান মন্দির। আর তারপর উজ্জয়নীর মাহাকাল মন্দির। সেখান থেকে তিনি যান দাতিয়ার পিতম্বরা পীঠে। স্থানটি বাগলামুখী দেবীর অনুসারীদের তান্ত্রিক চর্চার সূত্রে বিখ্যাত। কমল নাথ এরপরে যান নরসিংহপুরে যেখানে রয়েছে দ্বোয়ারকা আশ্রম। কমল নাথের মন্দির থেমে মন্দিরে ছোঁটার পর্ব শেষ হতে না হতেই প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া তার মন্দির দর্শনের পালা শুরু করেন। মন্দির দর্শনের পাশাপাশি তিনি সাক্ষাৎ করেন বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী হিন্দু ধর্মীয় নেতার সঙ্গে। সম্প্রতি তিনি শঙ্করাচার্যের আশ্রমেও গেছেন।

এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি রাহুল গান্ধিসহ অপরাপর নেতাদের জাত উল্লেখ করে পোস্টার লাগানো হয়েছে। সেখানে রাহুলকে ব্রাহ্মণ হিসেবে উল্লেখ করে বাকি নেতাদের ছবির ওপর ব্যক্তি অনুযায়ী দলিত, ভূমিহার, রাজপুত ইত্যাদি লিখে দেওয়া হয়েছে। পোস্টারে মুসলমান ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা নেতাদের উল্লেখ থাকলেও, সমালোচনা শুরু হয়েছে নেতাদের জাতভিত্তিক পোস্টারটি নিয়ে। জাতীয় পর্যায়ের সংবাদমাধ্যম ফার্স্ট পোস্ট লিখেছে, ‘নিকট অতীতে আর কখনও এমন হয়নি যে কংগ্রেসের কোন সভাপতি প্রকাশ্যে তার ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরেছেন অন্য ধর্মের সাথে পার্থক্য সূচিত করতে। এটা স্পষ্ট, ভোটের রাজনীতির কাছে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে আদর্শ।’

মধ্য প্রদেশের নির্বাচনকে লক্ষ্য করেই যে খুব সম্প্রতি কংগ্রেস ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বা ভাষায় ধর্মীয় অনুভূতির মিশেল দেওয়ার চেষ্টা করছে তা নয়। জি নিউজ জানিয়েছে, গত বছর গুজরাট নির্বাচনের প্রচারণা চালানোর সময়েও রাহুল হিন্দু ধর্মের প্রতি অনুগত থাকার কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। দ্বোয়ারকাদিশ মন্দির দর্শনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া কংগ্রেসের নির্বাচনি প্রচারণা চলাকালে তিনি আরও দর্শন করেছেন বীর মেঘমায়া, আম্বাজি ও আকশারধাম মন্দির। গুজরাটেই ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর রাহুল গান্ধি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি শিবের ভক্ত এবং সততায় বিশ্বাসী।’

হিন্দু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার আশ্রয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো কংগ্রেসের সমালোচনা করেছে বিজেপি। তার জবাব দিতে ছাড়েনি কংগ্রেস। কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় কংগ্রেসের জবাব দেওয়ার ভাষাভঙ্গি। ইকনোমিক টাইমস গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত তাদের এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও মধ্যপ্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি কমলনাথের উদ্ধৃতি, ‘বিজেপি মনে করে তারা হিন্দুত্ববাদের সোল সেলিং এজেন্ট। আমি যদি মন্দির দর্শন করি তাহলে বিজেপি কেন তার সমালোচনা করবে? আমরা ধর্মবিরুদ্ধ নই, আমরা বিজেপির চেয়েও বেশি ধার্মিক।’

ফার্স্ট পোস্টকে মনিপাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-রাজনীতির অধ্যাপক এমডি নালাপাত বলেছেন, ‘রাহুল নতুন কৌশলের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে যেতে চাইছেন। রাহুল বোঝাতে চান, তিনি সেকুলার কংগ্রেসের নেতা হলেও হিন্দুবিরোধী নন। ইউপিএ জোটের সরকার থাকাকালীন সময়ে কংগ্রেস ‘নেহুরুর সেকুলারিজমে’ আস্থা রেখে চলছিল। এতে তারা আদতে ওয়াহাবিদের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। আর তাতে অসন্তুষ্ট হয়েছিল হিন্দু-মডারেট মুসলমান উভয় পক্ষই। আর এখন কংগ্রেসকে তার মূল্য চুকাতে হচ্ছে। অথচ ওয়াহাবিরা দেশের মুসলমান জনসংখ্যার মাত্র দুই শতাংশ।’

নালাপাত মনে করেন, ‘ইউপিএর রাহুল এক নতুন কংগ্রেসের নেতা হতে চান। যে কংগ্রেসের নেতা-কর্মীদের ধর্মীয় বিশ্বাস থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি সেই ইউপিএ আমলের নেতাদের নিয়েই আছেন, যারা আগে থেকেই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। সেকুলারিজমের বিষয়েও রাহুলকে তার অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। এটা কংগ্রেসের জন্য অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ।’

ভোপালভিত্তিক সাংবাদিক প্রভু পাতেরিয়া ফার্স্ট পোস্টকে বলেছেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের সমর্থন পেতে কংগ্রেস বিজেপির লাইন ধরেছে। দলটি নিজের সেই সেকুলার পরিচিতি ঝেড়ে ফেলতে চায়, যে পরিচিতি তার রাজনৈতিক লোকসানের কারণ হয়েছে। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা দল হয়ে উঠতে চায়। একারণেই রাহুল মন্দির থেকে মন্দিরে ছুটছেন, কৈলাশে তীর্থযাত্রায় যাচ্ছেন, শিবভক্ত হচ্ছেন, রামভক্ত হচ্ছেন, কন্যা-পুজা দিচ্ছেন, যেগুলোর সবই হিন্দু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। কংগ্রেস সেকুলারজিম ও নরম হিন্দুত্ববাদের মিশেলে তার নিজের যে নতুন পরিচয় বিনির্মাণ করতে চাইছে তা শেষতক কতটা সফল হয় তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’