তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা : “ফুলগুলো সরিয়ে নাও/ আমার লাগছে।/মালা/জমে জমে পাহাড় হয়/ফুল/জমতে জমতে পাথর।‘’- `পাথরের ফুল’ নামে সেই কবিতা নাড়িয়ে দিয়েছল বাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতির আবহমানতাকে। ১৯৫৬ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তাঁর কলম থেকে বেরিয়েছিল এই লেখা।

আজ বাংলা জুড়ে এখানে ওখানে তাঁর কবিতা নিয়ে বড় বড় সভা হচ্ছে, আবৃত্তি হচ্ছে, কবি পাঠের আসর বসছে। ফুলে মুখ ঢেকে যাচ্ছে কবি সুভাষের। মালার ভারে ক্লান্ত হচ্ছেন কবি। কারণ আজ সারা রাজ্যে তাঁর জন্ম শতবার্ষিকী পালনের দায়বদ্ধতা। কিন্তু তিনি যে নব সূর্যোদয়, বিপ্লব, নতুন দিন আনার কথা বলেছিলেন, তা মেনে একটু পা চালিয়ে চলার কথা কি ভাববে বাংলার সুভাষপ্রেমীরা?

অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু পার্টি ভাগের সময় সদস্য পদ ত্যাগ করেছিলেন। এক সময়ে বামপন্থী কর্মীদের মুখে মুখে ফিরত সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার লাইন-`প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’ কিংবা `সাতটি রঙের ঘোড়ায় চাপায় জিন/তুমি আলো আমি আঁধারের আল বেয়ে/আনতে চলেছি লাল টুকটুকে দিন।‘ পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট পার্টির কাজকর্ম নিয়ে হতাশা জমেছিল তাঁর মনে।

সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে একে একে লিখে গেছেন অগ্নিকোণ, চিরকুট, কাল মধুমাস, ফুল ফুটুক, যত দূরেই যাই, একটু পা চালিয়ে ভাই-এরকম আরো অনেক।

বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে শেষ জীবনে। কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে হন বিতর্কিত। সেই বিতর্ক নিয়ে আলোচনায় না গিয়েও বলা যায়, ১৯৪০ এ প্রথম কাব্যগ্রন্থ `পদাতিক’ প্রকাশের মধ্যে আধুনিক বাংলা কবিতার জগতে নতুন সুরধ্বনি উচ্চারিত হল। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে মানুষের বৈষম্যলাঞ্ছিত দুর্দশার বিরুদ্ধে দ্রোহ তাঁর কবিতার মূল সুর। পদাতিক কাব্যগ্রন্থের প্রারম্ভে ঘোষিত হচ্ছে-

“প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য,

ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা

চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য।

কাঠফাঁটা রোদে সেঁকে চামড়া।

মানবিক বোধ ও রাজনৈতিক বাণী তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান অভিমুখ। পদাতিক কাব্যগ্রন্থের `মে-দিনের কবিতা’ কেবল শ্রমিক শ্রেণির এক বিজয় কাব্য নয়। এতে ব্যক্ত হয়েছে ঔপনিবেশবাদের উচ্ছেদসাধনের ঋজু প্রত্যয়।

“শতাব্দী লাঞ্ছিত আর্তের কান্না

প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা,

মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা আর না।

পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা।

প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য

এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,

দুর্যোগে পথ হয়, হোক দুর্বোধ্য

চিনে নেবে যৌবন আত্মা।‘’

জগৎজুড়ে যে পথে শান্তি আনা সম্ভব, সেই পথের রেখা তাঁরা কাছে ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁর কবিতায় সেই পথনির্দেশিকাও আছে। কবিতাটির নাম `বাঁয়ে চলো, বাঁয়ে’।

“বাঁয়ে চলো ভাই,

বাঁয়ে।–

কালো রাত্রির বুক চিড়ে,

চলো

দু’হাতে উপড়ে আনি

আমাদেরই লাল রক্তের রঙিন সকাল।‘’

রঙিন সকাল আনার সরব অভিলাস। তিনি এভাবেই এক স্বতন্ত্র কাব্য ভাষায় জন্ম দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীকালের কবিদের অনুসরণ করতে বাধ্য করেছে।

পদাতিক কাব্যগ্রন্থের বধূ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের স্নিগ্ধ রোম্যান্টিকতার বিপরীত ধ্বনি শোনা যায়। কতকটা কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো গানের অনুষঙ্গে। –

“ইহার মাঝে কখন ওরে প্রিয়তম

উধাও, লোকলোচন উঁকি মারে-

সবার মাঝে একলা ফিরি আমি

লেকের জলে মরণ যেন ভালো।

স্ফুলিঙ্গ, জবাব চাই, প্রতিরোধ, প্রতিজ্ঞা, ফের আসবো, এই আশ্বিনে, চিরকুট প্রভৃতি কবিতায় আছে বিশ্বাস, বলিষ্ঠতা, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ আবার আবেগের বিধুরতা। `ঘোষণা’ কবিতায় দেখা যায়-

“গঙ্গায় জোয়ার এসে লাগে

ভল্গার তীরের স্পর্শ,

চোখে নব সূর্যোদয় জাগে

মুক্তি আজ বীরবাহু

শৃঙ্খল মেনেছে পরাভব;

দিগন্তে দিগন্তে দেখি,

বিস্ফোরিত আসন্ন বিপ্লব।‘’

বিপ্লবের দৃপ্ত ঘোষণা বারেবারে তাঁর কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে। তাই শতবর্ষ পেরিয়েও পদাতিক পা চালিয়েই চলবে।