সুশীল মান্ডি,টিডিএন বাংলা: এই কিছুদিন আগের কথা। আমার ভাইঝি গল ব্লাডার স্টোনের সমস্যায় ভুগছিল। মাঝে মাঝেই অসহ্য পেটের ব্যাথায় কান্নাকাটি করত। বাইরে অপারেশন করতে গেলে তিরিশ হাজারের কাছাকাছি খরচা হবে। ভরসা সরকারি হাসপাতাল। তাকে নিয়ে গেলাম সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজে। সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আউটডোরে ছুটে বেরাচ্ছে। সবাই প্রায় সহায়সম্বলহীন গরীব মানুষ। রক্ত পরীক্ষা, এক্স রে, ইসিজি, সিটি স্ক্যান এসবের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ মাথা ঘুরে পরে যাচ্ছে, কেউ বা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। অবশেষে তিনমাস বা ছ’মাস পরে তারা পরীক্ষা করানোর ডেট পাচ্ছে।

কি আর করা যাবে। কম পয়সায় চিকিৎসা পেতে গেলে এভাবেই তো এগোতে হবে। না পোষালে বেসরকারি নার্সিংহোমে যাও, টাকা দাও পরিষেবা নাও। সেখানে গেলে প্রথমেই প্রস্তাব আসবে ভর্তি হতে হবে। পাঁচদিন সাতদিন ভর্তি থাকার পর পঞ্চাশ হাজার বা একলাখ টাকা দাও তারপর বাকিটা ব্রহ্মা জানে। অনেক খরচ করে কেউ কেউ সুস্থ হয়, কিন্তু অন্যদিকে প্রবেশ করে আর এক ভয়ানক রোগ। তুমি বন্ধক দেওয়া জমি আর ছাড়াতে পারবে না, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ আর জোগাড় করতে পারবে না, মাথার মধ্যে শুধু একটাই শব্দ বারবার ঘুরতে থাকবে ‘ধার শোধ করতে হবে’। এই রোগ থেকে কেউই বোধহয় মুক্তি পায় না।
যাই হোক, ফিরে আসি ভাইঝির অবস্থায়। তিন চার বার যাওয়ার পরে অবশেষে অপারেশনের ডেট পাওয়া গেল। সেটা ২০২১ সালে। আমি অবাক হয়ে ডাক্তারের মুখের দিকে চেয়েছিলাম। এখন ২০১৯ সাল, মানে দুবছর অপেক্ষা করতে হবে! মৃদুস্বরে বললাম “পেশেন্ট মারা যাবে তো!” ডাক্তার বলল “কিছু করার নেই।” অপেক্ষা করুন মাঝে যদি কোন পেশেন্ট অপারেশনের জন্যে না আসে আপনাদের খবর দেব বা আপনারাও খবর নেবেন। আমি আর কথা বলতে পারিনি।

এবার আসি সাম্প্রতিক সময়ে ডাক্তারদের ওপর ক্ষোভে আক্রমণ করার প্রসঙ্গেঃ
ডাক্তারদের লক্ষ্য বা আদর্শই হলো রোগীদের সেবা করা। তাই তো ভগবানের আগে তাদের স্থান। কিন্তু মারাত্মক ব্যবসায়ী স্বার্থ ডাক্তারদের সেই আদর্শে কতটা অবিচল রাখতে পেরেছে সে অনেক আলোচনার বিষয়। তার সাথে রোগীর সংখ্যা অনুপাতে ডাক্তারদের সংখ্যা, পরিষেবার পরিকাঠামো, চিকিৎসার যন্ত্রপাতি, গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ সব মিলিয়ে নামেই তালপুকুর, কিন্তু ঘটি ডোবে না। এইরকম একটা পরিস্থিতিতে সঠিক পরিষেবা না পেয়ে মানুষের মধ্যে একটা ক্ষোভ স্বাভাবিক ভাবেই জমতে থাকে। আর সেটা যে ব্যবস্থাকে আক্রমণ করার দরকার সেখানে না করে হাতের কাছে যাকে পাই তাকেই করে বসে। কারণ এরা খুব সমাজ সচেতন মানুষ তো। আর কিছু নেতা-মন্ত্রীদের প্রভাব তো থাকেই। অমুক নেতার সাথে আমাদের যোগ আছে সুতরাং আমরা গায়ের জোরে সব করতে পারি।

এইভাবে ব্যবস্থার উপর আঘাত না করে যারা ডাক্তারদের উপর চড়াও হচ্ছে আমরা অবশ্যই তার বিরোধিতা করি। আক্রান্ত হলে সুরক্ষার দাবি আর প্রতিবাদ করার অধিকার সবার আছে। তাই এই ব্যবস্থাকে উন্মোচন করার কাজটা ডাক্তাররা যেমন করবেন তেমনি মুমূর্ষু রোগীদের সেবার আদর্শ থেকেও তারা সরে যাবেন না এই প্রত্যাশা রেখেই আসুন আমরা একসাথে রোগমুক্ত সমাজ গড়ার লড়াই গড়ে তুলি। আমাদের দরকার চ্যে- এর মত ডাক্তার, দরকার বিনায়ক সেন, শৈবাল জানা, কাফিল খানের মত ডাক্তার। মৃত রোগীকে ভেন্টিলেশনে রেখে মানুষের টাকা লুঠ করা স্বাস্থ্যব্যবস্থা আমরা চাই না।
(লেখক আদিবাসী সমাজের গবেষক ছাত্র)