মুহাম্মদ নূরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা: দেশ জুড়ে চলছে কাগজ নিয়ে খেলা। সরকার নাগরিক সমাজকে কাগজের পিছনে ছুটতে বাধ্য করেছে । পঞ্চায়েত, বিডিও, রেজিস্ট্রি অফিসগুলো দিনরাত মানুষের ভীড়। সবাই পেরেশান কাগজ ঠিক করতে । কাগজের খোঁজে হন্যে মানুষ । এদিকে দিল্লীর শাহীনবাগ থেকে কোলকাতার পারকসার্কস সর্বত্রই বিক্ষোভ ” কাগজ নেহি দেখায়েঙ্গে।” সত্যিই কি কাগজ রক্ষা করতে পারবে নাগরিকত্ব কে? আসামের মানুষরাও কাগজ দেখিয়েছিল। আমলারা তাদের প্রতি সুবিচার করেননি। আসুন দেখে নিন কয়েকটি উদাহরণ।

১) নীলমণি চক্রবর্তী, মাতা চারুপ্রভা চক্রবর্তী, পেশা নার্স। পিতা মৃত। দুই সন্তান দুজনেই সরকারি চাকরি করেন।১৯৬০ সাল থেকে ইলেকট্রিক বিল, খাজনার রশিদ, ক্লাস সেভেন থেকে নিয়ে সমস্ত সার্টিফিকেট,১৯৬০ সালের ১২ মে করিমগঞ্জ মহকুমা প্রদত্ত এপয়েন্টমেন্ট লেটারটাও আছে।তাঁর নাম এনারসি তালিকায় নেই।
২) অজিত রায়, বাড়ি কাছাড় জেলার রংপুর। ঠাকুরদা বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার আগে পূর্ব পাকিস্তান থেকে এখানে আসেন। কোন প্রয়োজন না থাকলেও শিক্ষিত সচেতন মানুষ তাই সংগ্রহ করে ছিলেন রিফিউজি কার্ড। সেই সূত্রে ১৯৭০ সালে সরকার একখন্ড জমিও দান করেন। সমস্ত নথি পত্র দিয়ে অজিত বাবুরা আবেদন করেন। একই কাগজে অগ্রজ দুই ভাই ও তাঁর সন্তানরা নাগরিকত্ব পান কিন্তু আটকে যান অজিত বাবু ও তার ছোট ভাই ও তাঁদের সন্তানরা।

৩) মাধুরা দত্ত, ইতিহাসের নাতি নামে পরিচিত। কেননা , কাছাড় জেলার বিখ্যাত ইতিহাসবিদ দেবব্রত দত্তের তিনি নাতনি। তাঁর লেখা ইতিহাসকে কাছাড় ডিস্ট্রিক্ট রেকর্ডসে যুক্ত করেছে এশিয়াটিক সোসাইটি। বাবা মনোজ দেব আকাশবাণী শিলচর কেন্দ্রের অবসরপ্রাপ্ত ঘোষক। মা দেবশ্রী দত্ত শিলচর গার্লস কলেজের প্রফেসর। বার বার নথি জমা দেওয়া সত্বেও চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম নেই।

৪) বাঙালি উদ্বাস্তু নেতাদের মতে, তালিকা থেকে বাদ পড়া ১৯ লক্ষের বেশি মানুষের মধ্যে  অনেকাংশই বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তু।  তিনসুকিয়ার খেরবারি গ্রামে নিহত পাঁচ বাঙালি শ্রমিকের নামগুলো মনে করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়ে যে এন আর সির ছায়া কাদের জীবনে অন্ধকার ডেকে এনেছে।

শ্যামল বিশ্বাস, অনন্ত বিশ্বাস, অবিনাশ বিশ্বাস, সুবল দাস আর ধনঞ্জয় নমঃশূদ্ররা কীভাবে পৌঁছেছিলেন আসামে? পার্টিশন থেকে ভাষা আন্দোলন, যুদ্ধ আর দারিদ্রের বোঝা কাঁধে এই মানুষগুলো ভারতে এসেছিলেন নতুন ভবিষ্যৎ আর সাংবিধানিক অধিকারের আশায়। এই নামগুলোর প্রতি যদি কোনও মমতা বা আত্মীয়তাবোধ যদি থেকে থাকত, তাহলে আইন করে এঁদের এবং এঁদের সন্তানদের বেআইনি অভিবাসী বলে দাগিয়ে দেওয়া কোন মানবতাবাদির পক্ষে সম্ভব ছিলনা।এরা নিজেদেরকে হিন্দু প্রেমী বলে জানান।এই তাদের হিন্দু প্রেমেন নমুনা

৫) নিতা দাস রিফিউজি রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, বার্থ সার্টিফিকেট,ভোটার লিস্টে নাম থাকা সত্ত্বেও এনারসি তে নাম নেই। অরুণ সাহা ও বেনি মাধব দেবনাথ নগরেস্বর এলাকায় নিজস্ব মালিকানাধীন জমি। ১৯৭৭ সালের নাগরিক তালিকায় বাবার নাম ছিল।তা সত্ত্বেও তাদের নাম আসেনি।

৬) ধীরাজ চন্দ্র, পিতা দিলীপ চন্দ্র সেনা বাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর পশ্চিম বঙ্গে দমকল বিভাগে কর্মরত। ১৯৫৪ সালের পারিবারিক সরকারী নথি জমা করেন ।অসমের মারীগাঁও জেলার বাসিন্দা।১৯৬৫ সালের জমির দলীল জমা করেন । মা সীমা চন্দের নাম এসেছে বাবা ও ছেলেদের নাম নেই।
৭) দুর্গাপুরের তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক অপূর্ব মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে অপরূপা মুখোপাধ্যায় বর্মনের বিয়ে হয়েছিল গুয়াহাটির হিমাংশু বর্মনের সঙ্গে। সমস্ত কাগজ জমা করা সত্ত্বেও চূড়ান্ত তালিকায় জামাই ও নাতনির নাম আছে মেয়ে ও নাতির নাম নেই।
৮) তেজ পুরের অবিনাশ চন্দ্র দেব। ১৯৭০ সালে বায়ুসেনায় যোগ দেন। তিনটি পদক পেয়েছেন। মরাবালির বাসিন্দা , প্রয়োজনীয় কাগজ দেওয়া সত্বেও গোটা পরিবার তালিকা থেকে বাদ।
৯) জোড় হাটের চিত্তরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় স্বাধীনতার পরের বছর সেনা বাহিনীতে যোগ দেন।পরিবারের সদস্যদের কারো নাম আসেনি এনারসিতে।
১০) জাতীয় শহীদ পদকপ্রাপ্ত মদন মল্লিক ও মৃনাল ভৌমিক এর পরিবারের কারো নাম নেই। জাতীয় স্মারক ও পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার পাওয়া ব্যাক্তিরা যাবে কোথায়?
১১) ধেমাজির শীলা পথারের বাসিন্দা অবসর প্রাপ্ত দলবাহাদুরের পরিবারের১৩ জন সদস্য সামরিক বাহিনীতে আছেন। তাঁর পিতা শ্বেত বাহাদুর কামী ছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে। ১৯৪০ সালে চাকরি ছাড়েন।আবার স্বাধীন ভারতের সেনা বাহিনীতে যোগ দেন। মা ভবেশ্বরি কামী ছিলেন সেনাবাহিনীর নার্স। কারো নাম নেই।
১১) নাম নেই শীলা পথার শহরের প্রতিষ্ঠাতা জ্যোতিষ দাসের পরিবারের।

১২) সানাউল্লাহ খান গারগিল যুদ্ধে পাকিস্থানের বিরূদ্ধে জানবাজি রেখে লড়াই করেন। তাঁর ও তাঁর পারিবারের সব কাগজ জমা দেওয়া সত্বেও চূড়ান্ত তালিকা তাঁদের প্রতি সুবিচার করেনি।
১৩) আর ফখরুদ্দীন আলী আহমেদ। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি অর্থাৎ এক নম্বর নাগরিক ছিলেন। তাঁর পরিবারের সদস্যদের অনেকের নাম চূড়ান্ত এনারসি তালিকায় নেই।
উদাহরণের শেষ নেই।উনিশ লাখের কতজনের নামবা উল্লেখ করা যাবে। এদের বেশির ভাগই ভারতের আদি বাসিন্দা। তাদের যদি এই হল হয় তাহলে শরণার্থী দের অবস্থা কী?