TOPSHOT - Security personnel inspect the interior of St Sebastian's Church in Negombo on April 22, 2019, a day after the church was hit in series of bomb blasts targeting churches and luxury hotels in Sri Lanka. - At least 290 are now known to have died in a series of bomb blasts that tore through churches and luxury hotels in Sri Lanka, in the worst violence to hit the island since its devastating civil war ended a decade ago. (Photo by Jewel SAMAD / AFP) (Photo credit should read JEWEL SAMAD/AFP/Getty Images)

মুহাম্মদ নূরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা: আবারও তীব্র সন্ত্রাসী হামলা। এবার দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার চার্চে, হোটেলে। ২১ শে এপ্রিলের ইস্টার সানডে। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পবিত্র দিন। প্রার্থনার উদ্যেশে যখন সমবেত হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ ঠিক তখনই একের পর এক কেঁপে ওঠে গীর্জাগুলি। দুটি গীর্জায় ও একাধিক হোটেলে আত্মঘাতি সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন ২১৫ জন নিরাপরাধ মানুষ। আহত কমপক্ষে ৫০০।

আক্রান্ত হয়েছে রাজধানী কলম্বোর সেন্ট এন্টিনিস চার্চ এবং নেগম্বর সেন্ট সেবাসটিএন চার্চ। সেবাসটিএন চার্চের ফাদার এডমন্ড তিলক রত্নে জানান, বিস্ফোরণ এর তীব্রতায় উড়ে গিয়েছে গির্জার ছাদ। এখানে কমপক্ষে ৭৪ জন মানুষের প্রাণ হানি ঘটেছে।

মাত্র এক মাস আগে ১৫ই মার্চ ২০১৯ একই ধরনের সন্ত্রাসী হামলা সংঘটিত হয় নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের একাধিক মসজিদে। সেখানে সন্ত্রাসী বন্দুকবাজের গুলিতে নিহত হয় ৫০এর অধিক প্রার্থনা রত মুসলিম।নামায রত মুসলিম দের উপর এই হামলা যতটা না বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল নিউজিল্যান্ডের প্রধান মন্ত্রী জেসিন্ডা অর্ডানের ভূমিকা আক্রান্তদের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা ও সন্ত্রাসীদের প্রতি তাঁর যথার্থ কঠোরতা আলোড়িত করেছিল বিশ্বকে।

এই ধরণের সন্ত্রাসী হামলাকে কেউ মেনে নিতে পারেনা। স্বাভাবিক ভাবে এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে ও আক্রান্ত শ্রীলঙ্কার পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে বার্তা দিয়েছে সব রাষ্ট্র। শ্রীলঙ্কা সরকারও অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বিষয়টা নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বার বার ধর্মস্থানকে কেন বেছে নিচ্ছে সন্ত্রাসীরা? আমি এটা বলতে চাইনা যে ধর্মস্থান ছাড়া আর কোন জায়গায় এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হলে তার গুরুত্ব কোনো অংশে কম বা বেশি হয়। সন্ত্রাস সন্ত্রাসই। স্থান কাল পাত্র ভেদে তার কোন তারতম্য হয়না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বেশি বেশি ধর্মস্থান বেছে নেওয়ার পিছনে অন্য কোন ভাবনা কাজ করছে কী?

ইতিপূর্বে আমাদের দেশে বারবার ধর্মস্থানে সন্ত্রাসি হামলা ঘটেছে।২০০৭ সালে ভারতের অন্যতম তীর্থস্থান আজমীর শরীফ আক্রান্ত হয়, ওই বছরেই সন্ত্রাসী হামলা ঘটে মালেগাঁও এর নুরানী মসজিদে। আক্রান্ত হয়েছে গুজরাটের অক্ষর ধাম মন্দির, দিল্লির জামা মসজিদ। সন্ত্রাসীরা বার বার হামলার জন্য কেন ধর্মস্থানকেই বেছে নিচ্ছে?

মানুষ তো মন্দির-মসজিদ-গীর্জায় যায় মানসিক শান্তির আশায়। জীবনের পাপ পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হয়ে মহান প্রভুর মঙ্গল আলোকে নিজেকে নির্মল করতে মানুষ ছুটে আসে উপাসনালয়ে। ঠিক এই জায়গাটায় আঘাত দেওয়ার অর্থটা কী?

আসলে সন্ত্রাসীদের মূল উদ্দেশ্য ভীতি সঞ্চার করে উদ্যেশ্য হাসিল করা। ধর্ম মানুষের কাছে খুবই সেন্টিমেন্টের বিষয়। যে জায়গাটায় আঘাত করলে সবচেয়ে কম সময়ে সবচেয়ে বেশি মানুষকে প্রভাবিত করা যায় সেটি ধর্ম।তাই বিশেষ ধর্মের মানুষকে উত্তেজিত করতে চলে অব্যাহত ভাবে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেওয়ার পালা। মুসলিম সম্প্রদায়কে আঘাত করতে বারে বারে আঘাত হানা হয় পবিত্র কোরআন, হাদীস, এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রের উপর।

আবার কখনো কখনো বিশেষ কোন সম্প্রদায়ের ঘাড়ে সন্ত্রাসের তকমা এঁটে দেওয়ার জন্যও চলে নানান কূটকৌশল। যেমন মালেগাঁও বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল মুসলিমদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দাঙ্গা বাধানোর জন্য। বিস্ফোরণ ঘটানোর সাথে সাথে পরিকল্পিতভাবে তার দায় চাপানো হয় ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন, সিমি ইত্যাদি সংগঠনের নামে। অথচ পরবর্তী কালে জানা যায় মুসলিম নয় বরং উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতা স্বাধী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর এই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন। সেই প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরকে ২০১৯ এর লোকসভায় বিজেপি তাদের দলীয় প্রার্থী করায় একথা দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে গেল যে সন্ত্রাসের পিছনে কারা কীভাবে সক্রিয় থাকে।

রাজনীতির দাবা খেলায় কে যে কোথায় কী চাল চালতে কাকে কীভাবে ব্যাবহার করছে তা বোঝা মুশকিল। রাজনৈতিক দাবারুদের অন্যতম একটি অস্ত্র হচ্ছে সন্ত্রাস। তারা সাপ হয়ে কামড়ায় আর ওঝা হয়ে ঝাড়ে।

এই সঙ্কটের মুকাবিলার অন্যতম পথ গণচেতনা। কুচক্রীরা মানুষকে উত্তেজিত করে ঘোলা জলে মাছ ধরতে চায়। ধর্মীয় স্থানে হামলা করা হয় এই উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য। মানুষ যদি মাথা ঠান্ডা রাখে, গুজবে কান না দেয় এবং নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা অর্ডানের মতো অপরাধীদের খুঁজে বের করতে চায় তাহলে কুচক্রীদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়া সম্ভব। নিউজিল্যান্ড যে পথ দেখিয়েছে শ্রীলঙ্কা কী পারবে সেই পথে চলার সাহস দেখাতে? এখন সেটাই দেখার।